স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
ঘোড়ার আস্তাবল থেকে আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে যশোর ক্লাব। ব্রিটিশদের তৈরি করা সে ধারা শতাব্দীকালজুড়ে টিকে আছে এখনো; যা এই জনপদের ‘অভিজাতদের’ ক্রীড়া, বিনোদনসহ নানা কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়।
ঔপনিবেশিক শাসকদের তৈরি যশোর ক্লাবের আরেক নাম অফিসার্স ক্লাব। ইংরেজ কর্মকর্তাদের জন্য নির্মিত হলেও কালের বিবর্তনে যা স্থানীয়দের (নেটিভ) জন্যও উন্মুক্ত হয়। এখন স্বাধীন বাংলাদেশে নির্ধারিত যোগ্যতাধারী ব্যক্তিরা এই ক্লাবের সদস্য হতে পারেন।
ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবটিতে আজ পা পড়বে বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি সফরসূচিতে যশোর ক্লাবের কথা না থাকলেও পরে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে তড়িঘড়ি কিছু সংস্কার কাজ করে নতুন ‘লুক’ দেওয়া হয়েছে স্থাপনাটির। অবশ্য এজন্য কর্তৃপক্ষকে বেশি বেগ পেতে হয়নি। কারণ কিছুদিন আগে এই ভবনটি ব্যাপক সংস্কার করে দৃষ্টিনন্দন করা হয়।
ঐতিহাসিক নানা সূত্র মতে, ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠাকালে এই সংগঠনটির নাম ছিল ‘স্টেশন ক্লাব’। সে সময় লোকমুখে এটি ‘ঘোড়ার আস্তাবল’ হিসেবেও পরিচিত ছিল। তৎকালীন জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং নীলকর ও জমিদারদের বিনোদনের জন্য এটি গড়ে তোলা হয়। শুরু থেকেই এই ক্লাবটি শহর যশোরের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও অভিজাত শ্রেণির মিলনস্থল হিসেবে পরিগণিত হয়। পদাধিকার বলে এই ক্লাবের সভাপতি হন জেলা প্রশাসক। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশেও এটি তার আভিজাত্য ধরে রেখেছে। তবে পুরনো এই জনপদের প্রধান ক্লাবটির যে জৌলুস থাকার কথা, দুর্ভাগ্যক্রমে তা হয়নি।
যশোর ক্লাবের দীর্ঘদিনের সদস্য এজেডএম সালেক তার স্মৃতিচারণ ও ক্লাবের অবস্থা তুলে ধরে বলেন, ‘‘১৯৮৭-৮৮ সাল থেকে যশোর ক্লাবে আমার বিচরণ। আমি তখন লন টেনিস খেলতাম নিয়মিত। তখন জেনেছি, এক সময় এর নাম ছিল ‘স্টেশন ক্লাব’। ব্রিটিশ আমলের যারা অফিসার ছিলেন তারাই ওখানে কার্ড, বিলিয়ার্ড, টেনিস খেলতেন। আমার জানা মতে, স্বাধীনতার পর থেকে যশোরের সরকারি কর্মকর্তা ও সমাজের কিছু এলিটকে নিয়ে এই ক্লাব পরিচালিত হতো।’’
তিনি আরও বলেন, ‘যশোর ক্লাব কিন্তু সারা বাংলাদেশের অন্য ক্লাবগুলোর সাথে অ্যাফিলিয়েটেড না। অ্যাফিলিয়েটেড হলে সুবিধা হতো, একজন মেম্বার ইচ্ছা করলেই ঢাকায় গেলে বনানী ক্লাব, গুলশান ক্লাব বা ঢাকা ক্লাব বা বরিশাল ক্লাব, খুলনা ক্লাবে যেকোনো কিছু এভেইল করতে পারতো। বর্তমান যে নতুন কমিটি হয়েছে তারা পহেলা বৈশাখের প্রোগ্রাম করেছে। মেম্বারদের যদি ফ্যাসিলিটিজ দেওয়া যায়। তাদের জন্য ভালো ক্যান্টিন, ভালো কার্ডরুম, বিলিয়ার্ড রুম আবার সচল করা দরকার। তাহলে মানুষজন এখানে মেম্বার হতে আগ্রহী হবে।’
যশোর ক্লাবের সদস্য ও প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি জাহিদ হাসান টুকুন ক্লাবের ঐতিহাসিক রূপান্তর নিয়ে বলেন, ‘১৯৮৪ সালের দিকে আমি যশোর ক্লাবে প্রবেশ করি। আমি তখন শুনেছি যে ষাটের দশকে এটা ছিল ‘স্টেশন ক্লাব’। স্টেশন ক্লাবকে পরে যশোর ক্লাবে রূপান্তরিত করা হয়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মি অফিসাররা আসতেন, পুলিশ কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসনের অফিসাররা খেলতেন। এখানে বিলিয়ার্ড, তাস, ব্যাডমিন্টন, টেনিস খেলা হতো। টেনিসটা সবচেয়ে বেশি খেলা হতো, এখনও হয়।’
ক্লাবের গঠনতন্ত্র ও সদস্যপদ নিয়ে তিনি বলেন, স্টেশন ক্লাবের যুগ পেরিয়ে যখন যশোর ক্লাব হলো, তখন এটার গঠনতন্ত্র পরিবর্তন হলো। পরিবর্তিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্থানীয় একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদক হবেন এবং জেলা প্রশাসক সভাপতি হবেন। এই গঠনতন্ত্র বহু পরে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন জেলা প্রশাসক আবদুল ওয়াজেদ। বর্তমান সম্পাদক শান্তনু ইসলাম সুমিতের নেতৃত্বে আমরা যশোর ক্লাব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি আস্তে আস্তে সারা বাংলাদেশে যেসব নামকরা ক্লাব আছে, সেসব ক্লাবের সমকক্ষ হতে।’
ক্লাবের ভেতরে বর্তমানে একটি রেস্টুরেন্ট চালু হয়েছে। ক্লাবের অবকাঠামোও আমূল সংস্কার করা হয়েছে। তবে প্রবীণ সদস্যরা নতুন আঙ্গিকে হাইরাইজ বিল্ডিং এবং উন্নত সুযোগ-সুবিধার দাবি জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন যশোর ক্লাবের হারানো জৌলুস ফিরিয়ে আনবে পাশাপাশি এটিকে জাতীয় পর্যায়ের ক্লাবগুলোর সাথে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন ক্লাবের সদস্য ও যশোরের বিশিষ্টজনেরা।