শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের একটি দিন- ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর। সেই দিনটিতে তখনকার রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে একটি খাল খনন কাজের সূচনা করেছিলেন। সেই খালটি ছিল যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশী-যদুনাথপুর খাল। পরে যা ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
জিয়াউর রহমানের অবিস্মরণীয় কাজের একটি ছিল ভূউপরিস্থ পানি ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন বাড়ানো। পরবর্তী সরকারগুলো জিয়াউর রহমানের এই কর্মসূচি থেকে সরে আসে এবং ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নীচে নেমে যাচ্ছে। শুষ্ক মওসুমে বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিমাঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র অভাব দেখা দিচ্ছে।
এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি-ঘোষিত ইশতেহারে জিয়াউর রহমানের সেই যুগান্তকারী ‘খাল খনন কর্মসূচি’ গুরুত্ব পায় এবং জনগণের রায় নিয়ে সরকার গঠনের পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন শুরু করে দেন।
সরকার গঠনের প্রায় আড়াই মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী আজ যশোর আসছেন। এই জেলায় তার দিনভর কর্মসূচির প্রথমটি সেই উলাশী-যদুনাথপুর খাল পুনঃখনন। শহীদ রাষ্ট্রপতির হাতে একদিন যে যুগান্তকারী কাজ শুরু হয়েছিল, প্রায় অর্ধশতক পর তারই সন্তান দেশের নির্বাহী প্রধান হয়ে সেই কাজে হাত দিচ্ছেন। বাবার স্মৃতিবিজড়িত উলাশীতে এবার সন্তানের হাতে উঠবে কোদাল। এমন বিরল ঘটনা চাক্ষুষ করতে যাচ্ছে শার্শা তথা যশোরবাসী। এ এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
উলাশীতে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে গোটা শার্শা এলাকায় এখন বইছে উৎসবের আমেজ। বিশেষ করে প্রবীণদের উচ্ছ্বাস আলাদা মাত্রা পেয়েছে।
শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘আপনি চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবেন না, মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা কেমন। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিরা, যারা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল কাটার কাজে অংশ নিয়েছিলেন, তারা যেন নতুন করে যৌবন ফিরে পেয়েছেন। তারা উলাশীতে খাল পুনঃখনন কাজে এবারও অংশ নিতে উদগ্রীব। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক আগ্রহী মানুষের স্থান সংকুলান হবে না উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সেখানে একটি সুধী সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।’
সুধী সমাবেশে বিপুল মানুষের উপস্থিতির সুযোগ নেই। সে কারণে বঞ্চিত হবেন অনেক আগ্রহী মানুষ। এই জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন নুরুজ্জামান লিটন।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ও খাল পুনঃখনন উদ্বোধন উপলক্ষে গত ১৭ এপ্রিল উলাশী এলাকা পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। ওই সময় তিনি খালের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেন। প্রতিমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব এ কে এম শাহাবুদ্দিন।
এছাড়াও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতও প্রধানমন্ত্রীর সফরস্থল পরিদর্শন করে প্রস্তুতি কাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি নির্বিঘ্ন করতে ইতিমধ্যে উলাশী এলাকা পরিদর্শন করেছেন যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু, সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান, শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে ওয়াহিদ, উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির ও সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ প্রশাসন ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও নেতারা।
এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঐতিহাসিক ‘জিয়া খাল’ ঘিরে এখন উৎসবমুখর পরিবেশ। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর বঞ্চনার পর আবারও প্রাণ ফেরানোর প্রত্যাশায় দিন গুনছেন স্থানীয়রা। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় সাজসাজ রব বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের সময় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি মৃতপ্রায় হয়ে যায়। এর ফলে কৃষি, মৎস্য ও সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
স্থানীয় কৃষক মতিউর রহমান জানান, জিয়াউর রহমানের খনন করা খালটি কালক্রমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মওসুমে সীমান্তের ওপার থেকে আসা পানি বাধাগ্রস্ত হয়ে ঘরবাড়ি প্লাবিত করে। এতে কৃষিজমি অনাবাদি থেকে যায়।
ওই এলাকার সন্তান ও যশোর সরকারি সিটি কলেজের শিক্ষার্থী সিহাব উদ্দিন বলেন, খালটি মজে যাওয়ায় কৃষকরা সেচ সুবিধা পান না। ফলে এলাকায় ফসল উৎপাদন কমে গেছে।
স্থানীয় শিক্ষক আক্কাস আলী বলেন, খালটি পুনঃখনন হলে কৃষির পাশাপাশি মৎস্য খাতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে একদিকে সেচ সুবিধা বাড়বে, অন্যদিকে মাছ চাষ ও আহরণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আরেক শিক্ষক আব্দুস সাত্তার জানান, এই খালের সঙ্গে প্রায় ২২টি বিলের সংযোগ রয়েছে। উজানের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ ছিল এই খাল। কিন্তু সংস্কারের অভাবে খালটির পানি নিষ্কাশনের ক্ষমতা অনেক কমে গেছে।
খাল খননের সেই ঐতিহাসিক দিনের স্মৃতি এখনও হৃদয়ে ধারণ করে রেখেছেন শতবর্ষী আব্দুল বারিক মণ্ডল। তিনি ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে উলাশী খাল খননকাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল নিয়ে খাল কাটতে নেমেছিলেন। আমরা সবাই তখন তার সঙ্গে কাজ করেছি। মানুষ খুব খুশি হয়েছিল। সেই খাল আবার খনন হবে- এটা জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারবো ভাবিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে এই খালে সারা বছর পানি থাকতো। কৃষকরা উপকার পেত। মাছও পাওয়া যেত অনেক। এখন খাল ভরাট হয়ে গেছে। আবার যদি আগের মতো হয়, তাহলে এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে।’
উলাশীর কর্মসূচি সফল করতে গোটা শার্শা উপজেলাজুড়ে চলছে জোর প্রস্তুতি। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা দিন-রাত কাজ করছেন। কোথাও কর্মিসভা, কোথাও উঠান বৈঠক, কোথাও শোভাযাত্রা। ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা চলছে প্রতিদিন। অনেক এলাকায় স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা পরিষ্কার ও খালের পাড় সংস্কারের কাজও করছেন নেতাকর্মীরা।
উলাশী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘জিয়াউর রহমান এই খাল খনন করেছিলেন। এখন তার ছেলে আবার সেই খাল খননের কাজ শুরু করতে আসবেন এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। পুরো এলাকা এখন ঈদের মতো লাগছে।’
নাভারন বাজারের ব্যবসায়ী রায়হান হোসেন বলেন, অনেকদিন পর যশোরে এমন বড় আয়োজন হচ্ছে। মানুষ খুব খুশি। রাস্তা পরিষ্কার করা হচ্ছে, দোকানপাট সাজানো হচ্ছে। সবাই প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষা করছে।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু সুবর্ণভূমিকে বলেন, উলাশী খালের সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এই খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুধু একটি খাল নয়, একটি ইতিহাসও পুনর্জীবিত হচ্ছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন আশা করছেন, জনসভা এবং খাল পুনঃখনন কর্মসূচিতে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটবে।
শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাসান জহির জানান, উলাশীর কর্মসূচি সফল করতে দলীয় নেতাকর্মীরা দিন-রাত মাঠে কাজ করছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, উলাশী খাল পুনঃখননে প্রায় এক কোটি ৩৭ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। খাল পুনঃখনন শেষ হলে সেচ সুবিধা বাড়বে, বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে এবং জলাবদ্ধতা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।