যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ৩ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

দশ টাকায় সেবা, ডিএনএ’র মহাপ্রতারণা

সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ৩ মে,২০২৬, ১১:০০ এ এম
দশ টাকায় সেবা, ডিএনএ’র মহাপ্রতারণা

যশোর জেনারেল হাসপাতালের ‘শাখা প্রতিষ্ঠান’ দাবি করে রোগীদের সাথে ভয়াবহ প্রতারণায় নেমেছে ‘ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এ কাজে জেনারেল হাসপাতালে আসা রোগীদের ভাগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক ‘দালাল’কে কমিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। এরা গ্রামাঞ্চল থেকে সরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের ভুলভাল বুঝিয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে রোগী বা তাদের স্বজনদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা। এজন্য দালালদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন প্রদান করা হয়।

শনিবার একজন রোগীর স্বজনদের সাথে প্রতারণা করার পর ওই ব্যক্তি পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ সেখানে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে টাকা উদ্ধার করে ভুক্তভোগীকে ফিরিয়ে দেয়। সেসময় প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজেদের রক্ষা করে।

বিষয়টি জানাজানির পর কথিত ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পর্কে সবিস্তার জানতে অনুসন্ধান চালানো হয়। তখন বেরিয়ে আসে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার কাহিনি।

ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে স্থাপন করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগীদের ভাগিয়ে তাদের ওখানে নিয়ে যাওয়া। এরপর প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার নামে ওই রোগী বা তার স্বজনদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা।

শনিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার পাঠানপাইকপাড়া গ্রামের ফারুক হোসেনের স্ত্রী হৃদরোগী আলোমতি (৪৫) যশোর জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার দেখানোর জন্য যান। ওইসময় ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল হাসু ও সোহান হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের সামনেই রোগীর স্বামী ফারুক হোসেনকে বলেন, ‘এখান থেকে টিকিট কাটেন। ডাক্তার ডিএনএ-তে বসেন।’

সরল বিশ্বাসে তারা ডিএনএ-তে যাওয়ার পর আলোমতিকে ডাক্তার মামুনুর রশিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি প্রথমে রোগীর ‘সিআরপি, সিভিসি ও সিরাম ক্রিটিনিন’ পরীক্ষা করাতে বলেন। এবাবদ তাদের কাছ থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষাগুলো করালে সাকুল্যে খরচ হতো পাঁচশ’ টাকা।

পরীক্ষার পর ফের ডাক্তার মামুনুর রশিদের কাছে গেলে তিনি জানান, রোগীর হার্ট ও কিডনির সমস্যা আছে। বিস্তারিত জানতে আরও পরীক্ষা করাতে হবে। কিন্তু, কাছে টাকা না থাকায় স্ত্রীকে নিয়ে ডিএনএ থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন ফারুক হোসেন। জেনারেল হাসপাতালে ফিরে তিনি জানতে পারেন, ডিএনএ কোনো সরকারি হাসপাতালের কোনো শাখা না।

ফারুক হোসেন প্রতারিত হয়েছেন বুঝতে পেরে যশোর কোতোয়ালি থানায় গিয়ে ডিএনএ’র বিরুদ্ধে মৌখিক অভিযোগ দেন। তখন এসআই আলমগীর বিষয়টি তদন্ত করতে সেখানে যান। তিনি সবিস্তার জানার পর ক্লিনিক মালিক রাশেদকে দিয়ে দুই দালাল হাসু ও সোহানকে ডাকিয়ে আনান। তারা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান এবং রোগীকে টাকা ফেরত দেন। একইসাথে ‘আগামীতে এ ধরনের কোনো কাজ করবেন না এবং কোনো দালাল পুষবেন না’ মর্মে পুলিশের কাছে মৌখিকভাবে অঙ্গীকার করার পর পুলিশ তাদের এ যাত্রায় ক্ষমা করে। তখন অন্য রোগীরাও পুলিশের কাছে অভিযোগ জানান যে, তাদেরও ভুল বুঝিয়ে জেনারেল হাসপাতাল টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে নিয়ে এসেছে ডিএনএ’র দালালেরা।

এদিকে, ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে আরও কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন সুবর্ণভূমির কাছে। এদের মধ্যে মণিরামপুর উপজেলার মাছনা গ্রামের নওশের আলী গাজীর ছেলে আব্দুল বারিক এবং হাসান ইমাম জানান, তাদের ভুল বুঝিয়ে সরকারি খরচে দশ টাকার বিনিময়ে সেবা দেওয়ার কথা বলে ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়।

হাসপাতালের একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক রাশেদসহ তার নিয়োগপ্রাপ্ত ১৫/১৬ দালাল নিজেদের ‘সরকারি হাসপাতালের লোক’ পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নিয়ে যান। এই প্রতারকচক্রের মধ্যে রয়েছে হাতকাটা আসাদ, জেসমিন, হাসু, আলম, সোহান, সুমন প্রমুখ।

অভিযোগ উঠেছে, এই চক্রটি স্থানীয় প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ এই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। তারা ডাক্তার মামুনুর রশিদ নামে এক চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামুনুর রশিদ ২০২২ সালে ঢাকা ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করলেও তার নামের পাশে ব্যবহৃত অন্যান্য ডিগ্রিগুলো ভুয়া। তার বাড়ি যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায়।

ভুক্তভোগী আব্দুল বারিক জানান, সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসার আশায় এসে দালালের খপ্পরে পড়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তারা তাদের টাকা ফেরত পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু আমি না, যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীরা পদে পদে এদের দ্বারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।’

যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম দাবি করেছেন, হাসপাতালের টিকিট কাউন্টার থেকেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ‘ডিএনএ ডায়গনস্টিক সেন্টার’সহ হাসপাতালের সামনে বেশ কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে। তারা সরকারি হাসপাতালের ভেতরে এমন শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

এ ব্যাপারে ক্লিনিক মালিক রাশেদ বলেন, তার ক্লিনিকের সকল কাগজপত্র আছে। যদিও তিনি তা দেখাতে পারেননি। তবে পৌরসভা, ভ্যাট ও টিআইএন দেখান তিনি। এরমধ্যে পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ, ২০২৪ সালের পর আর কোনো ভ্যাট দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই তিনি ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তাছাড়া সরকারি হাসপাতালের গেটের সামনে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের কোনো সুযোগ নেই।

বিষয়টি নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েতের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘হাসপাতালে দালালের উপদ্রব দীর্ঘদিনের। ডিএনএ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বহির্বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে নিচ্ছে এমন অভিযোগ আমরা পাচ্ছিলাম। শনিবার (২ মে) ঘটনায় সেটি প্রমাণিত হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্যবিভাগ ও আমরা চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে জেলা উন্নয়ন ও আইন-শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করবো। দালালদের এই চক্র ভাঙতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)