জিয়াউল হক
শিরোনামটি আপনাকে ভড়কে দিতে পারে! আতংকিত করতে পারে! জাগাতে পারে আগ্রহ। আবার বিষয়টি কিছুই না। এগুলো সবগুলোই মানবিক গুণ।
মজার ব্যাপার হলো, এসব মানবিক গুণসম্পন্ন রোবট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের নাগালে।
সে আপনার অনুভূতি, আবেগ, রাগ, অসুস্থতা- এসব কিছুই বুঝবে। শুধুই যে বুঝবে তা নয়, মানবিক এসকল আবেগ নকল করে সে আপনাকে, আপনার অবস্থাভেদে সহযোগিতাও করতে পারবে। দেবে সহচার্যও। বিজ্ঞান আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, আপনি আর নিঃসঙ্গ নন। সামান্য কিছু টাকা খরচ করলেই, আপনি পেয়ে যাবেন নির্ভরযোগ্য (!) এক ছায়াসঙ্গী। আর সে সঙ্গীটিকে যদি আপনি মানুষের মতো নিয়ে রিকশায় কিম্বা গাড়িতে ঘুরতে চান, সেক্ষেত্রে অবশ্য আপনাকে একটু মোটা অঙ্ক খরচ করতে হবে। এককথায় সামর্থ্য থাকলে আপনি আরো বেশি বুদ্ধিমান, নিরলস, নিদ্রাহীন এক বন্ধু পেতে পারেন; যে আপনাকে হুবহু মানুষের মতো সাপোর্ট দিয়ে যাবে!
এটা কোনো কল্পকাহিনি নয়
যুক্তরাজ্যর রোবটিক ফার্ম ইঞ্জিনিয়ার্ড আর্টসের তথ্যানুযায়ী, ‘অ্যামেকা’ নামে রোবটটিকে বিশ্বজুড়ে আধুনিক এবং মানবিক গুণসম্পন্ন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কারণ এটি মানুষের মতো অবিকল শারীরিক অঙ্গভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তি দিতে সক্ষম। এটি শুধু হাসি-কান্না, অবাক হওয়া, চোখ পিটপিট করা নয়, নাক চুলকানোর মতো সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গিও করতে পারে। এতে জিপিটির মতো শক্তিশালী এআই সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে। যার ফলে এটি মানুষের সাথে যেকোনো বিষয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে এবং প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। আপনাকে চা বানিয়ে দেওয়া, রান্না, কাপড় ধোয়া ছাড়াও দিতে পারবে নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গও।
অবশ্য একে আপনার সঙ্গী বানাতে হলে গুণতে হবে এক লাখ ৩৩ হাজার ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দেড় কোটি টাকা।
এছাড়াও সোফিয়া, অপটিমাস জেন ১, ২, ফিগার ১, ২’র মতো বিশেষ বিশেষ কাজে পারদর্শী রোবটগুলো উন্নত বিশ্বের বাজারগুলোতে সহজলভ্য, দামও কম। যা আপনার অফিস, বাসা, কারখানা, দোকান সামলানোর জন্য সহজেই ব্যবহার করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ফ্রান্স বা ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোই শুধু নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট ব্যবহার করছে হরহামেশা। গত শতকে যা সায়েন্স ফিকশন ছিল, তা আজ বাস্তব। আর সে বাস্তবতা বাসাবাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে অফিস, কল-কারখানা ছাপিয়ে জায়গা করে নিয়েছে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও। অনেক দেশ সেনা, নৌ, বিমান কিম্বা সীমান্তরক্ষী বাহিনী ওইসব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবটগুলোকে কমিশন্ড পর্যন্ত করছে।
আমি-আপনি অবাক হতে পারি, তবে উন্নত দেশগুলো ইতিমধ্যেই এসব সুযোগসুবিধা হরহামেশাই ভোগ করে চলেছে।
বিষয়টি যদি এভাবে বলি, মিস্টার শরিফ একজন ধনাঢ্য বণিক। বিভিন্ন কাজে তার ২৪ ঘণ্টার জন্য একজন সহযোগী প্রয়োজন; যিনি হবেন স্মার্ট, অধিক বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন। যিনি তার অফিসের কাজের পাশাপাশি ঘরের কাজও সম্পন্ন করে দেবেন। আবার ক্লান্তি-অবসাদে মাথা টিপে দেওয়ার পাশাপাশি গুনগুন করে গানও শোনাবেন। এজন্য মিস্টার শরিফকে প্রতিমাসে বেতনের টাকা না গুণে এককালীন অর্থ ব্যয় করে ‘সোফিয়া’ কিম্বা ‘অ্যামেকা’র মতো আধুনিক রোবট কিনতে হবে। আর যদি দুটি, তিনটি কাজের গুণসম্পন্ন রোবট কিনতে চান তবে তার জন্য খুব বেশি অর্থ গুণতে হবে না। কয়েক লাখ টাকা খরচ করলেই মিলবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন সহজ সঙ্গী
অফিসে কাজের অনেক চাপ। হাতে সময় কম। হিমশিম খাচ্ছেন মিস্টার অরিন। বেঁধে দেওয়া সময়সীমার মধ্যে কাজগুলো তুলে দিতে না পারলে বসের সামনে মুখ রক্ষা হবে না। আবার ইনক্রিমেন্ট থেকেও বঞ্চিত হওয়ার শংকা রয়েছে। কিন্তু হাতে তার যেসময় রয়েছে রুটিন ওয়ার্ক করে সেই সময়ের মধ্যে কাজ তোলাও সম্ভব নয়। বিকল্প কি রয়েছে মিস্টার অরিনের সামনে? হ্যাঁ, আছে।
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা- যে নামেই ডাকুন না কেনো আপনার সব ক্লান্তির কাজ অনায়াসেই সেরে দেবে। এজন্য আপনার প্রয়োজন একটি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, নেটওয়ার্ক সংযোগ। আর আপনাকে জানতে হবে, আপনি কী চান? কোন কাজটি, কীভাবে করতে চান? সে অনুযায়ী শুধু কমান্ড দিতে হবে। ব্যস, সে আপনাকে বিষয়টির ওপর বিশদ বর্ণনা দিয়ে দেবে। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ থেকে শুরু করে গবেষণা, প্ল্যানিং, এমনকি আপনার বাসা, অফিসের নকশা- কী চান আপনি? সবই করে দেবে নিমেষে! বসের সন্তুষ্টি আর ইনক্রিমেন্ট খুব বেশি কি দুরুহ মিস্টার অরিনের কাছে?
আইটি বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
আইটি বিশেষজ্ঞ খালেদ ইমরান রিপন বলেন, বাংলাদেশে ‘এআই’তে দক্ষ জনবলের সংখ্যা খুবই সীমিত। এখানকার মানুষ ফ্রি ভার্সনগুলো ব্যবহারে অভ্যস্ত বেশি। এতে কিছুটা উপকার মিললেও, ক্ষতির ভাগ অনেক বেশি। কারণ, ফ্রি ভার্সনগুলো সাধারণত ছবি, ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করে দেয়। কিম্বা চাহিদা অনুযায়ী আপনার প্রশ্নের উত্তর বা তথ্য দেয়। যেখানে ‘এআই’র প্রকৃত চিত্র বা কাজ সম্পর্কে জানাবোঝার তেমন কিছু নেই। অথচ নীরবে ‘এআই’ বিপুল এ জনগোষ্ঠীর মতাদর্শ বা চিন্তাকে হাতিয়ে নিয়ে নিজে সমৃদ্ধ হচ্ছে। যার ফাঁদে পড়ে নিজেকে কিম্বা অন্যকে বিকিয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
আইটি বিশেষজ্ঞ মাহমুদ হাসান রিয়েল বলেন, ‘‘এআই’ এমন এক প্রযুক্তি যা আপনাকে আপনার জিনিসই ফেরত দেবে। তবে সেটা গুছিয়ে, আপনি যেমনটি চান! যা দেখে নিজের অজান্তেই মানুষ আপ্লুত হয়।”
এখানে মানুষ একটি মাত্র জায়গায় পিছিয়ে। ‘এআই’ লাখো-কোটি মানুষের চিন্তা-ভাবনা কিম্বা কর্মকে এক জায়গায় করে, তার মতামত দেয়। আর মানুষ তার গণ্ডি ও চিন্তার পরিসরে সেটি করে থাকে।
সেখানেই মানুষ আর এআই’র মধ্যে পার্থক্য।
আপনি এআই’র কাছে যা চাইবেন, সে আপনাকে সেটাই দেবে, তার মতো করে। আর মানুষ বিচার, বিবেচনা, বিশ্লেষণ করা বা ছাড়াই উপাদান দিয়ে পুনরায় ‘এআই’কেই
সমৃদ্ধ করছে। কর্পোরেট দুনিয়ায় যা ‘মনস্তাত্ত্বিক খেলা’। চমক দিয়ে নেশাদ্রব্যের মতো যা মানুষকে প্রতিনিয়ত ভিন্ন রঙে-রূপে আকৃষ্ট করছে।
সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ‘এআই’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা আব্দুল মতিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ‘এআই’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপশক্তিগুলো ধর্মীয়, রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে। যা দেশ ও দেশের বাইরে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙা, ধর্মগ্রন্থের অবমাননা কিম্বা রাজনৈতিক নেতা, দল, প্রতিষ্ঠানের অপ্রীতিকর ছবি, ভিডিও, কথা প্রচার-প্রকাশ করে দাঙ্গা বাঁধানোর অপচেষ্টা চালিয়েছে।
এতে এখনো পর্যন্ত বড় ধরনের ঘটনা না ঘটলেও পারস্পরিক বিশ্বাস, অবস্থান, আস্থা নষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি ভারত ও বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন একাধিক ঘটনা দু-দেশের মানুষের মাঝে টানাপড়েন সৃষ্টি করেছে।
সরকার যদি ‘এআই’ প্রযুক্তির অপতৎপরতা বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে গোটা জাতিই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মন্তব্য এ নিরাপত্তা বিশ্লেষকের।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জ্বল বলেন, ‘এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ এক ধরণের ভয়ানক ফাঁদ। মূলত মস্তিষ্কের ডোপামিন হরমোন নিঃসরণের কারণে মানুষের মধ্যে আনন্দ ও পুরস্কারের অনুভূতি আসে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোনসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ডিভাইসগুলো ব্যবহারের ফলে এটি আসক্তিতে রূপ নেয়। এর পাশাপাশি, সেরোটোনিন (মেজাজ নিয়ন্ত্রণ) এবং অক্সিটোসিন (সামাজিক বন্ধন) এর মতো হরমোনগুলোও সামাজিক মিডিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত হতে পারে। ‘এআই’ প্রযুক্তি সে মাত্রাকে হাজারো গুণ ছাড়িয়ে গেছে। আর এতে শুধু তরুণ-যুবকরাই নয়, সব বয়স, শ্রেণি, পেশার মানুষই আক্রান্ত হচ্ছেন।
ফলে মানুষের সামাজিক, শারীরিক, মানসিক বিকারগ্রস্ততা দেখা দিচ্ছে। যার বিরূপ প্রভাব ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্রের ওপরও পড়ছে।
হৃদরোগ কিম্বা ক্যানসার ব্যক্তি ও তার স্বজনদের ক্ষতির মুখে ফেলে। প্লেগ বা করোনার মতো ভাইরাস মহামারি রূপ নেয়। কিন্তু এগুলোরও প্রতিষেধক আছে। তবে মোবাইল, ইন্টারনেট আর হালের এআই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে মানবসভ্যতাই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আমরা কোন পথে
এবার আসুন মূল কথায়, আমি নাকি সে আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছে?
সংবাদকর্মী আহসান কবীরের মতে, এআই কিম্বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজনীয়। মানুষ তার প্রয়োজনের তাগিদে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু যদি শুধুই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে সমস্যার কেবল সাময়িক সমাধান হবে। আর ক্ষতি হবে দীর্ঘস্থায়ী, দীর্ঘমেয়াদী। এতে সৃজনশীলতার ক্ষতি হবে। মেধাশূন্যতা তৈরি হবে; যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
লেখক ও গবেষক বেনজীন খান বলেন, ‘মেধাশূন্য জাতি কখনোই ভালো সমাজ বা বিশ্ব উপহার দিতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানুষকে অলস, অদক্ষ, কর্মহীন করে দেবে। মানুষ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা, কর্মদক্ষতা হারিয়ে ফেলবে। তার চিন্তাশক্তি, মানবিকতা ক্রমে মনুষত্ববোধ লোপ পেতে থাকবে। একসময় সে নিজেই নিয়ন্ত্রিত হতে থাকবে, নিয়ন্ত্রক নয়।’
নোবেলজয়ী জেফ্রি হিন্টন, পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন হকিং, বিল গেটস, ইলন মাস্ক, স্যাম অল্টম্যানের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিবর্গ এআই কিম্বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভয়াবহতা নিয়ে খোলাখুলি মন্তব্য করেছেন। তাদের কথার সারমর্ম হলো, ক্রমেই সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে অত্যাধুনিক এ প্রযুক্তিটি। ইতিমধ্যেই অনেকক্ষেত্রে যা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকে অতিক্রম করে গেছে। পূর্ণাঙ্গ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ মানবজাতির সমাপ্তি পর্যন্ত টানতে পারে।
লেখক: সংবাদকর্মী