যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

উদ্ভিদবিদ্যা

উদ্ভিদের জন্য কাঁটা কেন জরুরি

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : বুধবার, ২০ মে,২০২৬, ১২:০০ পিএম
উদ্ভিদের জন্য কাঁটা কেন জরুরি

ভারতের নাগপুরের কবি এম অসীম নেহাল তাঁর Life’s Bud নামক এক হাইকুতে লিখেছেন: ‘beneath fresh flowers engulfed in thorns, spines, prickles the buds of future.’ উদ্ভিদবিজ্ঞানে thorns, spines ও prickles এর আলাদা তাৎপর্য থাকলেও বাংলায় এই তিনটি শব্দ সাধারণত ‘কাঁটা’ অর্থে ব্যবহƒত হয়। সংস্কৃত ‘কণ্টক’ থেকে আসা বাংলা ‘কাঁটা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ একাধিক। উদ্ভিদবিজ্ঞানেও ‘কাঁটা’ শব্দের ভিন্ন ভিন্ন তাৎপর্য রয়েছে। কাঁটার ভিতর ব্যাক্টেরিয়া ও ফাঙ্গাস লালন করে উদ্ভিদ, যা খোঁচার সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণকারীর দেহে ঢুকে মিশে যায় রক্তের সাথে। খোঁচা খাওয়া জায়গাটা গোলাপি বা বেগুনি হয়ে যায় প্রথমে, বিশেষ ব্যথাও থাকে না। কিন্তু এক সময় ফুলে গিয়ে ক্রনিক ক্ষতে পরিণত হয়। এই ক্ষত যদি সময়মতো না সারানো হয় তবে তা দেহের সন্ধিতে ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে যক্ষা, নিউমোনিয়া হতে পারে, এবং শেষ পর্যায়ে সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম ও মস্তিষ্ককে আক্রমণ করতে পারে।

যেসব উদ্ভিদে কাঁটা থাকে, সেসব উদ্ভিদের ‘প্রজাতি’ নামে লাতিন acanth শব্দটি থাকে। গ্রিক ভাষার acut থেকে acanth শব্দটি তৈরি হয়েছে, যার অর্থ ‘কাঁটা’। প্রায় সাড়ে তিন হাজার উদ্ভিদের ‘প্রজাতি’ নামে এই acanth শব্দটি রয়েছে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, আত্মরক্ষার জন্য গাছদের কাঁটা হয়, কাঁটা দিয়ে গাছ বিকর্ষণ করে, আমরা যদিও কখনো কখনো কাঁটার সৌন্দর্যে আকর্ষণ বোধ করি।

কাঁটাগাছ নিয়ে বিজ্ঞানীদের নিরন্তর গবেষণা চলছে। কাঁটা তৈরি করতে জলহীন পুষ্টিহীন পরিবেশেও গাছের অনেক শক্তি খরচ হয়। তাই যেসব গাছে কাঁটা বেশি হয় সেসব গাছে ফল হয় কম। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় গাছের নিচের দিকে বড় কাঁটা কিন্তু উপরের দিকে তা ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে। যেমন লেবু গাছ। এতে প্রথমাবস্থায় বড় কাঁটা জš§ায় কিন্তু পরে উপরের দিকে একেবারেই থাকে না, কারণ অকারণ শক্তি ব্যয় করে ফলহীন হলে বংশবিস্তারে বিঘ্ন ঘটবে। এসব সমস্যার সমঝোতা করেই কাঁটা ও ফল তৈরি করে গাছ।

পরাগায়নকারী পোকাকে প্রলুব্ধ করার জন্য গাছ ফুলকে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করে, একে রূপসী করে তোলে পাপড়ি আর মঞ্জরিপত্র দিয়ে, কখনো এর ভিতর সুঘ্রাণ আর মধু তৈরি করে। ফল পুষ্ট হওয়ার সময়ে এর বর্ণ বদলে যায়, শরীর রসালো ও ঘ্রাণযুক্ত হয়, প্রাণীকে আকর্ষণ করে বংশবিস্তারের সুবিধার জন্য। এসব জরুরি কাজের মতো কাঁটাকেও রং ও ভয়ঙ্করতা দিয়ে সাজায় গাছ, এর কারণ আত্মরক্ষাকে মজবুত ও সংহত করা। আগে মনে করা হতো তীব্র রং দিয়ে কেবল প্রাণীরাই তাদের বিষাক্ততা প্রকাশ করে যা এপোসিমেটিজম নামে পরিচিত। যেমন দেখা যায় লেডিবার্ড বিটল, প্রজাপতি, কিং-স্নেক, ডার্ট ফ্রগ ইত্যাদি প্রাণীর ভিতর। কিন্তু পরবর্তীকালে জানা গেছে, কিছু গাছও এই এপোসিমেটিক আচরণ করতে পারে। যেমনটা দেখা যায় বিষাক্ত হেমলক গাছের কাণ্ডে। এদের গায়ের রক্তাক্ত ছোপ দেখে বিষাক্ততা আঁচ করে কিছু পাখিও দূরে থাকে। আত্মরক্ষার জন্য একটি গাছের কাঁটাও রঙিন হতে পারে, ভয়ঙ্কর আকৃতি ধারণ করতে পারে।

কাঁটা মূলত গাছের বিভিন্ন অঙ্গের পরিবর্তিত রূপ যা বহু রকমের হতে পারে। অর্থাৎ উদ্ভিদবিদ্যার ভাষায় কাঁটার শাব্দিক রূপান্তর আছে। গোলাপের গায়ে যে কাঁটা থাকে তা গাত্রকণ্টক (prickle) যা সৃষ্টি হয় কাণ্ডের বহিঃত্বক (epidermis) থেকে। খেজুর কাঁটা বা আগাভির যে কাঁটা তা পত্রকণ্টক বা স্পাইন (spine) যা পত্রের পরিবর্তিত রূপ। বাগানবিলাস, কাঁটামেন্দি, করমচা, বৈঁচি ইত্যাদির কাঁটা শাখা বা কাণ্ডের পরিবর্তিত রূপ বলে শাখা-কণ্টক বা থর্ন (thorn) যা বেশ শক্ত ও কাষ্ঠল এবং এদের ভিতর সংবাহী নালিকা বা ভাস্কুলার বান্ডল থাকে, যার উপস্থিতি দেখা যায় পত্রকণ্টকের ভিতরেও। বাবলা ও বরই গাছের কাঁটা উপপত্রের রূপান্তরিত রূপ। আরেক প্রকার কাঁটা আছে যা আদতে ত্বকীয় রোম বা ট্রাইকোম; যেমনটা দেখা যায় বেগোনিয়া, চুতরা পাতা, লাউয়ের পাতা ও ফলে। নগন্য মনে হলেও গাছেরা নিছক সৌন্দর্যের কারণে এই ট্রাইকোম তৈরি করে না। রোমের কারণে তাপমাত্রা, জলীয় বাষ্প, বায়ুপ্রবাহ, ধুলোবালি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ হয় এবং পোকামাকড় সরাসরি নরম ত্বক নষ্ট করতে পারে না।

কাঁটা থাকার কারণ হচ্ছে প্রস্বেদনের ফলে গাছ থেকে পানির বাষ্পাকারে নির্গমন কম করা। যেমন ক্যাকটাসের কথাই ধরা যাক। ক্যাকটাস মূলত মরুভূমির উদ্ভিদ, যেখানে পানি অপর্যাপ্ত। পাতার সাহায্যে উদ্ভিদ ৯৫ শতাংশ পানি বের করে দেয়। এখন মূলরোম দিয়ে পানি শোষিত হোক আর নাই হোক, পত্ররন্ধ্রের মধ্যে দিয়ে পানির নিষ্কাশন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। পাতার আকার-আকৃতি যতো বড় হবে পত্ররন্ধ্রের সংখ্যাও ততো বেড়ে যাবে। শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমগুলো অব্যাহত রাখার জন্যে প্রয়োজনীয় পানি ধরে রাখতে পাতার আকার-আকৃতি ক্ষুদ্রাকার কাঁটার মতো হয়ে যায়। আবার, গাছে কাঁটা হওয়ার প্রাথমিক কারণ হচ্ছে ক্ষুধার্ত তৃণভোজী প্রাণীদের থেকে গাছকে রক্ষা করা। তবে আর্থোপ্রোডা পর্বের প্রাণীদের থেকে গাছকে রক্ষার জন্য কাঁটা কার্যকর নয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)