ছাকিন হোসেন
, যশোর
প্রবাসে থাকাকালে খাবারের কষ্টটা হাড়ে হাড়ে টের পান যশোরের খড়কী এলাকার খন্দকার সাইদ হাসান রিপন। কখনো না খেয়ে, কখনো আধা পেটা নিম্নমানের খাবারই ছিল ভরসা। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখন তিনি সাধারণ মানুষের জন্যে অল্পখরচে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন।
রিপন প্রায় ১৪ বছর সিঙ্গাপুর আর তিন বছর আবুধাবীতে ছিলেন। প্রবাস জীবনের সেই কঠিন অভিজ্ঞতা বদলে দেয় তার জীবনের লক্ষ্য।
তিনি জানান, সিঙ্গাপুরে থাকাকালে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিই, দেশে ফিরে সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও ঘরোয়া খাবারের ব্যবস্থা করবো। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে দেশে ফেরার আগেই অনলাইন ও অফলাইনে খাবার প্রস্তুতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর পর দেশে ফিরে যশোর শহরের খড়কির আপন মোড়ে চালু করেছেন হোম কিচেন নামে একটি খাবারের প্রতিষ্ঠান। ছোট পরিসরে শুরু হলেও অল্প সময়েই স্থানীয়দের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে তার এই উদ্যোগ।
খন্দকার সাইদ হাসান রিপন বলেন, প্রবাস জীবনে সবচেয়ে বড় কষ্ট ছিল ভালো খাবারের অভাব। রান্না করতে পারতাম না, তাই কেউ মেসেও নিতে চাইতো না। বাধ্য হয়ে ক্যাটারিংয়ের খাবার খেতাম। কিন্তু সেই খাবারের মান এতোটাই খারাপ ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়েছে। তখন থেকেই মাথায় একটা চিন্তা ঘুরপাক খায়, দেশে ফিরে মানুষকে অন্তত ভালো, স্বাস্থ্যসম্মত ও ঘরোয়া খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করবো।
‘সেই লক্ষ্য থেকেই প্রবাসে থাকাকালে অনলাইন ও অফলাইনে খাবার তৈরি করার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করি। এখনো নতুন নতুন খাবার ও রান্নার কৌশল শেখার চেষ্টা করছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ভালো খাবার তৈরি করতে হলে প্রতিনিয়ত শিখতে হয়। আর সেই ভাবনা থেকেই আমার স্বপ্নের রান্নাঘর,' বলেন তিনি।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে সকালের নাশতা শুরু করেছি। প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১২ কেজি ময়দা লাগে। ক্রেতারা এলে তাদের চাহিদা অনুযায়ী পরোটা গরম গরম ভেজে দেওয়া হয়। পরোটার সাথে ডাল ও আলুর দম। তবে, ডাল ও আলুর দমের দাম দেওয়া লাগে না, একদম ফ্রি! পরোটার দাম রাখা হয় দশ টাকা। এখানে বসে অনেকেই খান, কেউ কেউ পার্শেল নিয়ে যান। খুব শিগগিরই দুপুরের খাবারের আয়োজন করা হবে।
নাশতা করতে আসা সুমন বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে বাইরে খাবার খেতে গেলে একটা ভয় কাজ করে, যা খাচ্ছি তা কতোটা স্বাস্থ্যসম্মত বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কিন্তু রিপন ভাইয়ের খাবারের দোকানে এসে সেই দুশ্চিন্তা থাকে না। এখানে খাবারের দামও তুলনামূলক কম, আবার মানও অনেক ভালো। রান্নাঘর থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত সবকিছুই বেশ গোছানো ও পরিচ্ছন্ন। খাবার খেলে একদম ঘরের মতো অনুভূতি হয়।
ফারজানা খাতুন বলেন, `আমি কয়েকবার এখানে খাবার খেয়েছি। সবচেয়ে ভালো লাগে খাবারের স্বাদটা একদম ঘরোয়া। বাইরের খাবারে এমন স্বাদ খুব কমই পাওয়া যায়। বাসায় মা যেভাবে যত্ন করে রান্না করেন, ঠিক সেই অনুভূতিটাই এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া তার ব্যবহারও খুব আন্তরিক। পরিবার নিয়ে বসে নিশ্চিন্তে খাওয়ার মতো একটা পরিবেশ আছে এখানে।'
শুধু ক্রেতারাই নন, রিপনের রান্নার ভক্ত তারই সন্তান শিশু রাহামনি বলছে, `বাবার হাতের রান্না আমার অনেক ভালো লাগে। নাশতায় আলুর তরকারি মজা করে খাই।'
রিপনের স্ত্রী মাসুমা বেগম বলেন, `এই উদ্যোগের শুরু থেকেই আমি তার পাশে আছি। রান্নার প্রস্তুতি, খাবার তৈরি, পরিবেশন থেকে শুরু করে পুরো কার্যক্রম সামলাতে প্রতিনিয়ত সহযোগিতা করে যাচ্ছি। পরিবারের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি তার স্বপ্ন পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।'