যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ঐতিহ্য

কালের সাক্ষী লোহাগড়ার ‘নহবতখানা’

রূপক মুখার্জি

, লোহাগড়া (নড়াইল)

প্রকাশ : রবিবার, ১৭ মে,২০২৬, ১১:০০ এ এম
কালের সাক্ষী লোহাগড়ার ‘নহবতখানা’

এক সময় এ দেশে জমিদারি শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। জমিদাররা শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ওই শাসন ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন জমিদার। মূলত জমিদারকে ঘিরেই আবর্তিত হতো জমিদারি শাসন ব্যবস্থা। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য এবং শাসন ব্যবস্থা পরিচালনায় জমিদাররা এদেশে নির্মাণ করেছিলেন সুরম্য অসংখ্য অট্টালিকা। সুরম্য এসব কারুকার্যময় অট্টালিকার প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রবেশদ্বারের ‘নহবতখানা’।

সকল বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত সুর-ঝংকারের অন্যরকম আকর্ষণ ছিল নহবতখানা। জমিদারি বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল এই নহবতখানা।

এমনই একটি নহবতখানা কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ইতনা গ্রামে।

এলাকার প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জমিদার বাড়ির বিশাল অট্টালিকার প্রবেশমুখে নহবতখানা নির্মাণ করা হতো। নহবতখানা ছিল সুউচ্চ, যা কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হতো। কাঠের তৈরি নহবতখানার পাশাপাশি ইটের তৈরি সুরক্ষিত নহবতখানা ছিল নজরকাড়ার মতো।

দৃষ্টিনন্দন ও নানা কারুকার্য খচিত নহবতখানা ঘিরে গড়ে ওঠে বাদ্যকর শ্রেণি। নহবতখানা ও বাদ্যকররা ছিল একে অপরের পরিপূরক। বাদ্যকরদের মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি মুসলমানরা সহশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। বাদ্যকরদের কাজ ছিল, সকাল-সন্ধ্যা নানা বাদ্যযন্ত্রের সংমিশ্রণে রাগ-রাগিণীর সুর ঝংকারে জমিদারসহ প্রজাদের মনোরঞ্জন করা।

তারা পূজা-পার্বণসহ বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে প্রতিযোগিতামূলক সুরের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতেন। এ জন্য জমিদাররা তাদের বিশেষভাবে পুরস্কৃত করতেন। অট্টালিকার আশেপাশেই এসব বাদ্যকররা তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন। জমিদার কর্তৃক তাদের বেতন-ভাতাসহ সব ধরনের ব্যয়ভার বহন করা হতো। এখনও এদেশের বিভিন্ন এলাকায় বাদ্যকর সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং উপস্থিতি দেখা যায়। আসলে জমিদারি শাসন ব্যবস্থায় গণবিনোদনের ক্ষেত্রে নহবতখানার গুরুত্ব ও অবদান স্বীকার্য সত্য।

সানাই, বাঁশি, ঢাক, ঢোল, খোল, তবলা, হারমোনিয়াম, করতাল, প্রেমজুড়ি, ম্যান্ডলিন, ক্লাইনেটসহ অন্যান্য দেশি-বিদেশি বাদ্যযন্ত্রের সমাহারে নহবতখানা মুখরিত থাকতো। যে জমিদারের ঐশ্বর্য, প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি ছিল, সেই জমিদারের নহবতখানা ছিল বেশি জৌলুসপূর্ণ।

শুধু যে জমিদাররাই নহবতখানা নির্মাণ করতেন, তা নয়। পাশাপাশি রাজা, মহারাজা, জোতদার, গাতিদার, তালুকদারসহ ধনাঢ্য ব্যক্তিরাও এটি নির্মাণ করতেন। বংশীয় আভিজাত্যের বিকাশ ঘটানোর জন্য অনেকে নহবতখানা নির্মাণ করতেন।

জমিদারি শাসন ব্যবস্থা উচ্ছেদ হওয়ার সাথে সাথে নহবতখানার অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে নহবতখানা জৌলুস হারিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়ে। এখনও এদেশের অনেক এলাকায় নহবতখানার অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়।

লোহাগড়া উপজেলার কুন্দশী চৌরাস্তা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে মধুমতি নদীর পাড়ে ব্যানার্জি বাড়ির প্রবেশমুখে নহবতখানার অবস্থান।

ইটের তৈরি নহবতখানায় রয়েছে শৈল্পিক নানা কারুকার্য। নহবতখানার মালিক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাসুদেব ব্যানার্জির ভাই তরুণ ব্যানার্জি বলেন, আমার দাদা মন্মথনাথ ব্যানার্জি রানী রাশমনির স্টেটের অধীনে ‘গাতিদার’ ও ‘তালুকদার’ ছিল। সে সময়ে তিনি নিজের এবং এলাকাবাসীর মনোরঞ্জনে বাড়ির সম্মুখে একটি কারুকার্যময় নহবতখানা নির্মাণ করেন।

জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর স্থাপিত নহবতখানাটি সংস্কারের অভাবে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। পরবর্তীতে নহবতখানা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করানোর জন্য আমরা এটি সংস্কার করেছি। এখনও দুর্গাপূজাসহ বাড়ির অন্যান্য উৎসব অনুষ্ঠানে এই নহবতখানা থেকে বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়ে থাকে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)