ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ এবছর শেষ হবে
বেনজীন খান
চলতি বছর বাংলাদেশের পরিবেশ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ মে ছিল আফ্রো-এশিয়ার গণমানুষের মজলুম নেতা মওলানা ভাসানীর ডাকে ফারাক্কা লংমার্চের ৫০ বছর পূর্তি। আর চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হবে ৩০ বছরের জন্য গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানিবণ্টন নিয়ে বর্তমানে কার্যকর চুক্তিটি হলো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি (Ganges Water Sharing Treaty)।
চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৬।
মেয়াদ: ৩০ বছর।
এর মেয়াদ শেষ হবে: ২০২৬ সালের ১১ ডিসেম্বর।
অর্থাৎ, এখন চুক্তির শেষ পর্যায় চলছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন সমঝোতা বা নবায়নের প্রশ্ন সামনে আসবে।
চুক্তির মূল বিষয়
এই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে (১ জানুয়ারি-৩১ মে) ফারাক্কা ব্যারেজের কাছে গঙ্গার প্রবাহ নির্দিষ্ট সূত্র অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভাগ করার কথা। তবে বাস্তবে বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, দেশটি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি পায় না, নদীর নাব্য কমে যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ে, কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশের ভাবনা কী হওয়া উচিত?
১. শুধু ‘পানি ভাগ’ নয়, প্রয়োজন ‘নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা’।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হওয়া উচিত কেবল ফারাক্কায় কত কিউসেক পানি পেল তা নয়; বরং পুরো গঙ্গা অববাহিকার যৌথ ব্যবস্থাপনা দাবি করা।
কারণ, নদী একটি আন্তঃসীমান্ত বাস্তুতন্ত্র। উজানে বাঁধ, ডাইভারশন ও সংরক্ষণ ভাটির প্রবাহকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
২. তিস্তা-গঙ্গা-সমস্ত আন্তঃসীমান্ত নদীকে একসাথে দেখা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টির বেশি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে। শুধু গঙ্গা নিয়ে আলাদা আলোচনা না করে একটি সমন্বিত নদী কূটনীতি প্রয়োজন।
বিশেষত, তিস্তা চুক্তির অগ্রগতি, শুকনো মৌসুমে পরিবেশগত প্রবাহ (environmental flow), আকস্মিক বন্যা ও পানি প্রত্যাহার- সবই আলোচনায় আনতে হবে।
৩. তথ্যভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক অবস্থান।
বাংলাদেশকে আবেগনির্ভর নয়, বরং স্যাটেলাইট ডেটা, হাইড্রোলজিক্যাল গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষি ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি- এসব তথ্যের ভিত্তিতে শক্তিশালী কেস তৈরি করতে হবে।
৪. আন্তর্জাতিক নদী আইনের নীতি সামনে আনা।
যদিও ভারত জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশনে অনুসমর্থন দেয়নি, তবুও আন্তর্জাতিকভাবে কিছু স্বীকৃত নীতি আছে, যেমন equitable and reasonable utilization, no significant harm principle। বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে এসব নীতি ব্যবহার করতে পারে।
এই দুটি ধারণা আন্তর্জাতিক নদী আইন ও আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ নীতি। সহজভাবে বললে ১. Equitable and Reasonable Utilization (ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার)। এর অর্থ হলো, একটি আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি কোনো এক দেশ একতরফাভাবে নিজের মতো ব্যবহার করতে পারে না। নদী-সংশ্লিষ্ট সব দেশকে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গতভাবে পানি ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। এখানে ‘সমান’ (equal) আর ‘ন্যায্য’ (equitable) এক জিনিস নয়।
অর্থাৎ, উজানের দেশ সব পানি আটকে রাখতে পারবে না, আবার ভাটির দেশও পুরো নদীর উপর একচ্ছত্র অধিকার দাবি করতে পারবে না।
কী কী বিষয় বিবেচনা করা হয়?
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণত দেখা হয়
> নদীর ভৌগোলিক অবস্থান
> কোন দেশের কত জনগণ নির্ভরশীল
> কৃষি ও পরিবেশগত প্রয়োজন
> ঐতিহাসিক ব্যবহার
> বিকল্প পানির উৎস আছে কি না
> জলবায়ু ও মৌসুমি প্রবাহ।
উদাহরণ:
ভারত যদি গঙ্গার পানি সেচ বা বিদ্যুতের জন্য ব্যবহার করে, সেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু সেই ব্যবহার এমন হওয়া উচিত যাতে বাংলাদেশও ন্যায্য প্রবাহ পায়।
২. No Significant Harm Principle (গুরুতর ক্ষতি না করার নীতি)
এর অর্থ হলো, একটি দেশ নদীর পানি ব্যবহার করতে গিয়ে অন্য দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি সৃষ্টি করতে পারবে না।
‘গুরুতর ক্ষতি’ বলতে কী বোঝায়?
যেমন,
> ভাটিতে পানির তীব্র সংকট
> কৃষি ধ্বংস
> লবণাক্ততা বৃদ্ধি
> নদী শুকিয়ে যাওয়া
> মৎস্যসম্পদ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
> আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি।
উদাহরণ: যদি উজানে বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে নদী প্রায় মৃত হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশ বলতে পারে এটি ‘significant harm’ সৃষ্টি করছে।
দুই নীতির মধ্যে সম্পর্ক
এই দুটি নীতি কখনও কখনও ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করে।
যেমন, ভারত বলতে পারে, ‘আমাদেরও উন্নয়নের জন্য পানি ব্যবহারের অধিকার আছে’ (equitable utilization)। বাংলাদেশ বলতে পারে, ‘কিন্তু সেই ব্যবহারে আমাদের বড় ক্ষতি হচ্ছে’ (no significant harm)।
তাই আন্তর্জাতিক আলোচনায় সাধারণত লক্ষ্য থাকে, ‘ন্যায্য ব্যবহার’ + ‘অন্যকে গুরুতর ক্ষতি না করা’। এই নীতিগুলো জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রায় ও চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত।
৫. আঞ্চলিক সহযোগিতা বনাম সংঘাত
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ সম্ভবত সংঘাতমূলক অবস্থান নয়, বরং * আস্থা বৃদ্ধি, * যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় করা, * নেপাল-ভুটানসহ আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা, * যৌথ জলাধার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ- এসবের দিকে অগ্রসর হওয়া।
৬. দেশের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি
শুধু ভারতের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। বাংলাদেশেরও প্রয়োজন: নদী খনন, পানি সংরক্ষণ, জলাভূমি পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা, দক্ষিণাঞ্চলে অভিযোজন কৃষি।
মনে রাখতে হবে, ফারাক্কা প্রশ্নটি কেবল একটি ব্যারেজ বা চুক্তির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশে নদী, কৃষি, পরিবেশ, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।
১৭/০৫/২০২৬
লেখক: সংগঠক, অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক