যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

শব্দতত্ত্ব

মধুমাসের অর্থ যেভাবে পাল্টে গেল

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : সোমবার, ১৮ মে,২০২৬, ০৯:৩৫ পিএম
মধুমাসের অর্থ যেভাবে পাল্টে গেল

সব বাংলা অভিধানে মধুমাস শব্দের অর্থ ‘চৈত্র মাস’। কিন্তু অনেকে এখন জ্যৈষ্ঠ মাস অর্থে শব্দটির ঢালাও ব্যবহার করছেন। এ কারণে শব্দটি তার মূল অর্থ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। ধারণা করা হয়, জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, জাম, কাঁঠালসহ একাধিক মিষ্টি ফল পাকে বলেই প্রয়োগকারীরা ভুলবশত ধরে নিয়েছেন, মধুমাস মানেই জ্যৈষ্ঠ মাস।

তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা ‘বানভাসি’, ‘জলটাউট’-এর মতো অনেক শব্দ উদ্ভাবন করলেও তারাই মধুমাসের এই আরোপিত অর্থ চালু করেছেন। পরে তারা ভুল বুঝতে পারলেও অহমিকার কারণে সংশোধনে রাজি হননি।

খনার বচনেও মধুমাস বলতে চৈত্র মাসকে বুঝানো হয়েছে: ‘মধুমাসে প্রথম দিনে হয় যেই বার, রবি শোষে মঙ্গল বর্ষে, দুর্ভিক্ষ বুধবার। সোম শুক্র শুরু আর পৃথ্বি সয় না শস্যের ভার। পাঁচ শনি পায় মীনে শকুনি মাংস না খায় ঘুণে।’ অর্থাৎ চৈত্র মাসের প্রথমদিন রবিবার হলে অনাবৃষ্টি, মঙ্গলবার হলে বৃষ্টি, বুধবার হলে দুর্ভিক্ষ হয়। সোম, শুক্র আর বৃহস্পতিবার হলে প্রচুর শস্য এবং যে চৈত্র মাসে পাঁচ শনিবার হয়, সে মাসে মড়ক হয়।

দৌলত উজির বাহরাম খান লিখেছেন ‘মধুমাসে উতলা বাতাস, কুহরে পিক; যদি সে কমল শিশিরে দহল কি করিব মধুমাসে।’ এখানে তিনি চৈত্র মাসের কথা বলেছেন। কারণ জ্যৈষ্ঠ মাসে তো আর কোকিল ডাকে না। অভিধানগুলোতেও কোথাও মধুমাস বলতে চৈত্র মাসকে বোঝানো হয়নি। কিন্তু মিডিয়ার দাপটে অভিধানগুলোও এখন অসহায়।

মুকুন্দরাম চক্রবর্ত্তীও চৈত্র মাস অর্থেই মধুমাস শব্দটি ব্যবহার করেছেন (মধুমাসে মলয় মারুত মন্দ মন্দ। মালতীর মধুকর পিয়ে মকরন্দ)। কবিকঙ্কণ চণ্ডীও চৈত্র মাস বা বসন্তকাল অর্থে মধুমাস শব্দটি ব্যবহার করেছেন (মধুমাস আপায় মাধব পরশে)। আপায় মানে গত হয়।

একাধিক সিনিয়র সাংবাদিক এই আমাকে বলেছেন, সর্বপ্রথম দৈনিক বাংলাই জ্যৈষ্ঠ মাস অর্থে মধুমাস শব্দটি চালু করেছে।

বাংলা অভিধানে মধুমাস শব্দের অর্থ হলো চৈত্র মাস। কিন্তু দেশের পত্রপত্রিকায় জ্যৈষ্ঠ মাস নিয়ে কোনো কিছু লিখতে গিয়ে লেখা হয় ‘মিষ্টি ফলের রসে ভরা মধুমাস’। এভাবেই জ্যৈষ্ঠ মাসের সঙ্গে মধুমাস বিশেষণটি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

মধু শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে বসন্ত বা বসন্তকাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে তার সাক্ষ্য পাওয়া যায় (আজি মধু সমীরণে নিশিথে কুসুম বনে তাহারে পড়িছে মনে বকুল তলে)। মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’ বসন্ত অর্থেই মধু শব্দটি ব্যবহার করেছেন (নাদিল দানব-বালা হুহুঙ্কার রবে, মাতঙ্গিনী-যূথ যথা মত্ত মধুকালে)।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে মধুমাস বলতে চৈত্র মাসই বলা হয়েছে। খ্যাতিমান অন্য কবি-সাহিত্যিকরাও চৈত্র মাস বা বসন্তকাল অর্থে মধুমাস শব্দটি ব্যবহার করে গেছেন (কত মধুমাস আসি গেল হাসি হাসি কলিকার মুখ চাহিয়া- বিজয় মজুমদার; সখা, সেই অতিদূর সদ্যোজাত আদি মধুমাসে তরুণ ধরায় এনেছিলে যে কুসুম ডুবাইয়া তপ্ত কিরণের স্বর্ণমদিরায়- বসন্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; এমত নহে যে, একেবারে বায়ু বহিতেছিল না, মধুমাসের দেহস্নিগ্ধকর বায়ু অতি মন্দ- একান্ত নিঃশব্দ বায়ু মাত্রÑ কপালকুণ্ডলা, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।

কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তীর বঙ্গীয় সমার্থকোষ অভিধানে বলা হয়েছে, ‘চৈত্র মাসকে কেন মধুমাস বলা হয়, তার কারণ জানা যায় ‘বসন্ত’ শব্দ থেকে। দুধের থেকে সর, সর থেকে ঘোল মাখন হয়ে ঘি-এ পৌঁছানো যায়। সেই সুবাদে মধু হলো ঘি। ঠিক সেইরূপ বৈশাখ থেকে বসবাস ও বর্ষের শুরু, এবং তার চূড়ান্ত হয় বসন্তে। সেই বসন্তের শেষ মাস হলো চৈত্র মাস।’

কবি ও প্রাবন্ধিক সাযযাদ কাদির তার ‘ভুলে ভুলে নির্ভুল’ প্রবন্ধে বড়ই আক্ষেপ করে লিখেছেন, ‘ফাল্গুন এসেছে, এরপর আসবে চৈত্র। চৈত্র মাসকে জানি মধুমাস নামেও। বরাবরই জানি। অভিধানেও লেখা আছে তা-ই। সেই পঞ্চাশের দশকে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ও গেয়েছেন ‘ভ্রমরা গুন-গুন গুঞ্জরি আসে... কেঁদো না কেঁদো না এই মধুমাসে...’। তবুও জ্যৈষ্ঠ মাস এলে আমাদের দু-তিনটি পত্রিকা মেতে ওঠে মধুমাসের বন্দনায়। বড়-বড় শিরোনাম করে ‘মধুমাস জ্যৈষ্ঠ মাস এসেছে...’। এ অবস্থায় এখন মোটামুটি সবাই জেনে গেছেন জ্যৈষ্ঠ মাসই মধুমাস। যদি বলি ‘না, চৈত্র মাস মধুমাস’... তাহলে ‘আমার সীমাহীন মূর্খতায়’ অনেকে হাসাহাসি করেন, অনেকে অগ্রাহ্য করেন, অনেককে অভিধান খুলে দেখালেও তা উপেক্ষা করেন বিরক্তির সঙ্গে।’

সাংবাদিক-গবেষক আবদুশ শাকুর তার ‘তোর ওই কুহুতান’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘আমাদের মনের নির্জ্ঞান স্তরেও ফুল আর ফাগুন একাকার হয়ে বিরাজ করে। পঞ্জিকার বারো মাসের রানী ফাগুন মাস যেন ফুল ফোটাতেই আসে। আসেই তো। মধুমাস চৈত্র হয়ে মধুমাধব বৈশাখ মাসের বৃক্ষচূড়ায় আগুন ধরানো কৃষ্ণচূড়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন যে-পুষ্পোৎসব, তার উদ্বোধন তো ফাল্গুনের শিমুল-কিংশুকরাই করে থাকে।’

অন্যদিকে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় জ্যৈষ্ঠ মাস স্মরণে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ লিখেছিলেন, এটা কেউ কি দাবি করতে পারবেন? বরং তিনি বসন্ত বা মধুমাস স্মরণে এটা লিখেছেন।

তারপরও স্রেফ মিডিয়ার কারণে মধুমাস বলতে আগামী প্রজন্ম জ্যৈষ্ঠ মাসকেই চিনবে, চৈত্র মাসকে চিনবে না। অবশ্য শব্দ আর সরকারের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘অবনমন’। সময়ের ব্যবধানে শব্দের অর্থের অবনতি হতেই পারে। বাংলায় ‘মধুমাস’ তারই প্রমাণ।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)