শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার যন্ত্র প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের কামাররা।
শহর থেকে গ্রাম, বিভিন্ন হাট-বাজার ও কামারপল্লীতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুন জ্বেলে লোহা গরম করে তৈরি করা হচ্ছে দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি, কুড়াল ও মাংস কাটার বিভিন্ন সরঞ্জাম।
শহরের পালবাড়ি, পুরাতন খয়েরতলা, আরবপুর, রেলরোড, উপশহর এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা বাজারে এখন ক্রেতাদের ভিড়। কেউ নতুন দা-বঁটি বানাতে আসছেন, কেউ আবার গত বছরের পুরনো ছুরি, চাপাতি ও কুড়ালে শাণ দিয়ে নতুনের মতো ধারালো করে নিচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কামারশালায় একসঙ্গে কয়েক কারিগর কাজ করছেন। কেউ আগুনে লোহা গরম করছেন, কেউ ভারি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে আকার দিচ্ছেন, আবার কেউ মেশিনে ধার দিচ্ছেন।
যশোর শহরের পালবাড়ি এলাকার বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। কিন্তু কোরবানির ঈদের আগের এই সময়টাই আমাদের মৌসুম। এখন ভোর ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কাজ করছি। কখনো কখনো রাত আরও বেশি হয়। ঈদের এই কদিনের আয় দিয়েই সারাবছর সংসার চালাতে হয়।
বেনাপোলের হাড়িহাটা রোডের ডব্লিউ মার্কেটের কামার স্বপন রায় বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার কাজ বেশি। মানুষ নতুন দা-বঁটির পাশাপাশি পুরনো জিনিসও শান দিচ্ছে। এখন দিনে ৩০-৪০টা পর্যন্ত দা ও ছুরিতে ধার দিচ্ছি। ঈদের আগে শেষ কয়েকদিন আরও বেশি চাপ থাকবে।’
শহরতলীর পুরনো খয়েরতলার কামারপট্টি এলাকার বিষু কর্মকার বলেন, আগে হাতে হাপর টানতে হতো। এখন মোটরের সাহায্যে বাতাস দেওয়া হয়, এতে কিছুটা সুবিধা হয়েছে। তবে আগুনের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করা এখনও খুব কষ্টের।
কামাররা জানান, লোহা, কয়লা, বিদ্যুৎ ও শ্রমিক খরচ বাড়ায় আগের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। আগে যে কয়লা প্রতি মণ ১২শ’ থেকে ১৪শ’ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেটি কিনতে হচ্ছে ১৮শ’ থেকে ২২শ’ টাকায়। ভালো মানের স্প্রিং লোহা আগে প্রতি কেজি ৯০ থেকে ১১০ টাকায় মিললেও বর্তমানে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
কারিগররা জানান, টেকসই ও ভালো ধার ধরে রাখতে তারা পুরনো গাড়ির স্প্রিংপাতি ব্যবহার করেন। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মালের দামও বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন।
স্বপন রায় বলেন, লোহা, কয়লা, বিদ্যুৎ, শ্রমিক সবকিছুর দাম বেড়েছে। এখন আগের মতো লাভ থাকে না। পোড়ানোর পর চাপাতি, দা, বঁটি ও ছুরি ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছি। সব মিলিয়ে সামান্য কিছু লাভ থাকে।
বর্তমানে যশোরের বিভিন্ন বাজারে মাঝারি আকারের একটি দা বিক্রি হচ্ছে ৫শ’ থেকে ৮শ’ টাকায়। বড় আকারের চাপাতির দাম ৮শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা। বঁটি আকার ও ওজনভেদে ৪শ’ থেকে ৭শ’ টাকা। কোরবানির ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৩শ’ থেকে ৬শ’ টাকায়। এ ছাড়া বড় মাংস কাটার ছুরি ৭শ’ থেকে এক হাজার টাকা, হাড় কাটার কুড়াল ১২শ’ থেকে দুই হাজার টাকা এবং ছোট চামড়া ছাড়ানোর ছুরি ২শ’ থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে পুরনো দা বা ছুরিতে শান দিতে নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ২শ’ টাকা পর্যন্ত। বড় চাপাতি বা কুড়াল মেরামত ও ধার করতে খরচ পড়ছে ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকা। অনেক দোকানে এখন আলাদা মেশিনে তাৎক্ষণিক ধার দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
যশোর শহরের পুরনো খয়েরতলা কামারপট্টিতে চাপাতি কিনতে আসা ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম বলেন, বিদেশি স্টিলের ছুরি বাজারে অনেক আছে। কিন্তু বানানো চাপাতি আর বঁটির ধার বেশি টেকে। এগুলো সহজে ভাঙেও না।
সদরের নুরপুর গ্রামের গৃহিণী রাহেলা বেগম বলেন, এবার নতুন বঁটি কিনিনি। পুরনোটা শাণ দিয়ে নিয়েছি। সংসারের খরচ অনেক বেড়েছে। তাই অনেকেই নতুন না কিনে পুরোনো জিনিস ঠিক করাচ্ছে।
সদরের মুড়লি এলাকার বাসিন্দা ওমর আলী বলেন, কোরবানির সময় ধারালো দা-ছুরি না থাকলে কাজ করতে সমস্যা হয়। তাই ঈদের আগেই সব শান দিয়ে নিচ্ছি।
কামারশিল্পের কারিগররা জানান, প্রচণ্ড পরিশ্রম, আগুনের তাপ এবং কম লাভের কারণে নতুন প্রজন্মের তরুণরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ফলে শ্রমিক সংকটও বাড়ছে। এখনকার ছেলেরা কেউ কামারের কাজ শিখতে চায় না। আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করা খুব কষ্টের। একজন দক্ষ কারিগর তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। ভবিষ্যতে এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।
কামাররা বলছেন, ঈদের আগের শেষ তিন-চার দিন সবচেয়ে বেশি চাপ থাকে। তখন নতুন অর্ডারের পাশাপাশি পুরোনো সরঞ্জাম শান দিতে ক্রেতাদের ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়।