যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২৩ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

গণমাধ্যম

হাতে লেখা দৈনিক পত্রিকা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : শনিবার, ২৩ মে,২০২৬, ০২:০০ পিএম
হাতে লেখা দৈনিক পত্রিকা

বলা হয়ে থাকে, ‘যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে’। এখানে প্রথম ভারত বলতে ‘মহাভারত’ গ্রন্থকে বোঝানো হয়েছে। তবে আর যাই হোক, মহাভারতে কিন্তু গণমাধ্যম বা পত্রিকা ছাপানোর কথা নেই। অথবা হাতে লিখে দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের কথাও নেই। কিন্তু ভারত থেকেই হাতে লেখা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এই ডিজিটাল যুগেও। পত্রিকাটির পাঠক সংখ্যাও নেহাত কম নয়। প্রায় ২১ হাজার। চেন্নাই থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকাটির নাম ‘দ্য মুসলমান’। ধারণা করা হয়, এটাই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র হাতে লেখা দৈনিক খবরের কাগজ। ১৯২৭ সালে এই সান্ধ্যকালীন উর্দু পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল চেন্নাই থেকে। শতবর্ষ থেকে আর অল্প কিছুদিন দূরে দাঁড়িয়ে আছে এই অসামান্য প্রয়াস।

হাতে লেখা মানে কিন্তু ২১ হাজার কপিই হাতে লেখা নয়। একটি কপি হাতে লিখে সেখান থেকে প্রতিলিপি করা হয় বিক্রয়যোগ্য কপিগুলি। ১৯২৭ সালে সৈয়দ আহাতুল্লার হাতে প্রতিষ্ঠিত এই সংবাদপত্রের বর্তমান সম্পাদক আহাতুল্লাহ সাহেবের নাতি সৈয়দ আরিফুল্লাহ। সঙ্গে রয়েছেন দুজন অনুবাদক তথা রিপোর্টার। তিনজন ক্যালিগ্রাফার, যারা প্রতিদিন সুন্দর হস্তাক্ষরে খবরের কাগজের মূল কপিটি লেখেন। হাতে লেখা কপি দুপুরের মধ্যে প্রেসে ছাপতে চলে যায়। মোট ছজন কর্মী নিয়ে চলে পত্রিকাটি। চেন্নাইয়ের বিখ্যাত ওয়াল্লাজা মসজিদের পাশে দুটি ছোট ঘর পত্রিকাটির অফিস। মোটা টাকার বিজ্ঞাপন আসে না। মূলত স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতাই ভরসা। কাগজের মূল্যও অতি সামান্য। সম্পাদক আরিফুল্লার মতে, এটিই দেশের সবচেয়ে সস্তা দৈনিক।

মাত্র চার পাতার পরিসরে স্থানীয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের খবর রাখার চেষ্টা করে ‘দ্য মুসলমান’। প্রথম পাতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সব খবর, আর দ্বিতীয় পাতায় থাকে সম্পাদকীয়। মুসলমান-সংক্রান্ত খবর কিছুটা হলেও বেশি গুরুত্ব পায়, তবে সম্পাদক আরিফুল্লাহর কথায় ভারতজুড়ে রয়েছে এই কাগজের পাঠক। বর্তমান সম্পাদক সৈয়দ আরিফুল্লাহ জানান, তিন প্রজš§ ধরে চলছে এই উর্দু দৈনিক। শুরু করেন তার দাদা সৈয়দ আজমতউল্লাহ। তার মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে এর দায়িত্ব নেন তার বাবা সৈয়দ ফাজাউল্লাহ। বাবার পরে তার কাঁধেই এখন পত্রিকাটির দায়িত্ব।

তার মতে, সময় বদলালেও ‘দ্য মুসলমান’-এর ঐতিহ্য ও ধরনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মূল আকর্ষণ হলো অসাধারণ ক্যালিগ্রাফি। এতে খবর সাজানোর পাশাপাশি রং, তুলির বৈচিত্র্যে নানা ক্যালিগ্রাফি ফুটিয়ে তোলার কাজ করা হয়। রং আর বিভিন্ন কলম ও তুলি দিয়ে লেখা হয় শিরোনাম ও ছবির ক্যাপশন। তবে এখানে কোনো খবরেরই বাইলাইন নেই।

চেন্নাইয়ের ট্রিপলিকেন হাই রোডে দুটি দেয়াল পাখা, তিনটি বাল্ব এবং একটি টিউব লাইট দিয়ে সাজানো ছোট দুটি ঘরে কয়েকজন মানুষের নিরলস পরিশ্রমে দিন দিন জনপ্রিয়তা বাড়ছে ‘দ্য মুসলমান’-এর। আরিফুল্লাহ বলেন, এই পত্রিকা কখনো থেমে থাকবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এর ঐতিহ্য একই রকম থাকবে। দেশের সর্বস্তরের পাঠকের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়াই এই পত্রিকার একমাত্র লক্ষ্য।

প্রত্যেকটি পৃষ্ঠায় প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। মূল কপি তৈরি হওয়ার পর দুপুর ১টার দিকে প্রিন্টের মাধ্যমে ও ফটো নেগেটিভে প্রসেস হয়ে বাকি কপিগুলো তৈরি হয়। প্রধান কাতিবের নাম রাহমান হোসেইনি। ১৯৮০ সালে তিনি এ পত্রিকায় যোগ দেন। মাস শেষে বেতন পান আড়াই হাজার রুপি। এখানে কাতিব হিসেবে লেখার কাজ করেন শাবানা বেগম ও খুরশিদ বেগম। প্রতি পৃষ্ঠার জন্য প্রতিদিন ৬০ ভারতীয় টাকা করে আয় করেন উভয়ে।

১৯২৭ সালে চেন্নাইয়ে পত্রিকাটির উদ্বোধন করেন সৈয়দ আজমাতুল্লাহ। সৈয়দ আজমাতুল্লাহর মনে হয়েছিল, ভারতের উর্দু ভাষাভাষী মুসলিমদের পক্ষে কথা বলার মতো একটি পত্রিকা থাকা প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই তিনি পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। দ্য মুসলমানের প্রথম সংস্করণ উদ্বোধন করেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেতা ও মাদ্রাজ সেশনের সভাপতি মুখতার আহমেদ আনসারি। মার্কেটিংয়ে এমবিএ করা সৈয়দ আরিফুল্লাহ দাদার স্বপ্নকে ধরে রাখতেই পত্রিকাটির নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন। হিন্দু-মুসলিম সব মানুষের কাছেই জনপ্রিয় পত্রিকাটি।

পত্রিকাটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক চমৎকার ইতিহাস। ৬০-এর দশকের শুরুতে জওহরলাল নেহেরু কেরালা সফরে যান। তিনি তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। দ্য মুসলমান পত্রিকার পক্ষ থেকে নেহেরুর সাক্ষাৎকার নিতে আসেন কৃষ্ণা আইয়ার। কৃষ্ণা যখন নেহেরুর সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন তখন আরেক পত্রিকা দ্য হিন্দুর ফটোগ্রাফার মোহাম্মদ আসাদ কক্ষে প্রবেশ করেন। মুসলিম নামের একটি পত্রিকায় হিন্দু সাংবাদিক এবং হিন্দু নামের পত্রিকায় মুসলমান সাংবাদিককে কর্মরত দেখে চমৎকৃত হন নেহেরু। বহুত্ববাদ ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক অনন্য উদাহরণ এই ঘটনা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)