যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ইতিহাস

মডেল রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন,২০২৬, ০১:০০ পিএম
মডেল রবীন্দ্র্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশি-বিদেশি পণ্যের মডেল হয়েছেন। তখনকার দিনে বর্তমানের মতো দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম তথা স্যাটেলাইট চ্যানেল না থাকায় পণ্যের বিজ্ঞাপনে তাঁকে দুইভাবে দেখা গেছে। পত্রিকার কালো অক্ষরে তিনি নিজের ছবি ও মন্তব্য লিখে মডেল হয়েছেন অথবা কোনো পণ্যের প্রসারের লক্ষ্যে প্রশংসাপত্র লিখে দিয়েছেন।

এছাড়া পণ্যের অনুকূলে লেখা রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা বাণী লিফলেট আকারে ছাপিয়ে বিলি করা হয়েছে। বর্তমানে সাবানের বিজ্ঞাপনে আলখাল্লা পরিচিত দাড়িগোঁফওয়ালা প্রবীণ ব্যক্তিকে মডেল হিসেবে কল্পনা করার চেয়ে একজন ভরপুর যৌবনা নন্দিনীকেই বেছে নেওয়া হবে। কিন্তু রবীন্দ্রযুগে রবীন্দ্রনাথই ছিলেন বিজ্ঞাপনদাতাদের মূল আকর্ষণ।

পণ্যের অনুকূলে ইংরেজি ও বাংলায় লেখা রবীন্দ্রনাথের উক্তির পাশে শোভা পেত কবির শান্ত, সৌম্য ছবি। হাত দুটি কোলের উপরে জড়ো করা। পরনে চিরাচরিত জোব্বা। বিজ্ঞাপনে মুখ দেখানোর জন্য তাঁর সাজসজ্জা কিংবা আচার আচরণে বিন্দুমাত্র বদল ঘটত না। কারণ অধিকাংশ বিজ্ঞাপন তো কোনোরকম আর্থিক লাভ কিংবা খ্যাতির লোভে করেননি তিনি। কিছু বিজ্ঞাপনে তিনি অংশ নিয়েছেন এক বৃহত্তর লক্ষ্যকে সামনে রেখে। পুরনো বইপত্র, স্মৃতিকথা আর প্রচারপত্রে ‘মডেল রবীন্দ্রনাথ’ বিষয়ক ওই সময়ের লেখালিখি আর বক্তব্যের মধ্যে বড় জোর যে কথাটি ফুটে উঠেছিল, তা হলো ‘বিজ্ঞাপনের রাজ্যে পা রেখে নিজেকে প্রকাশ করারই আরেকটা পথ যেন খুঁজে পেয়েছেন রবীন্দ্র্রনাথ। সেই পথ হয়ে উঠেছে এইসব বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন।’

তখন অবিভক্ত বাংলার বাণিজ্যক্ষেত্রে বিদেশি বণিকদের সঙ্গেই পাল্লা দিতে নেমেছিল সামান্য কয়েকটি দেশীয় সংস্থা। গোদরেজ তাদের অন্যতম। স্প্রিং ছাড়া তালা, টাইপরাইটার, রেফ্রিজারেটর, নির্বাচনের ব্যালট বক্স- এমন একাধিক জিনিস ভারতে প্রথম তৈরি হয়েছিল এই সংস্থার হাত ধরেই।

১৯১৮ সালে আর্দেশির এবং পিরোজশা গোদরেজ নাম লেখালেন সাবানের ব্যবসায়। বাজারে টিকে থাকতে অভিনব উপায় খুঁজে নিলেন তাঁরা। সেই সময়ে সাবানের অন্যতম উপকরণ ছিল পশুর চর্বি। এর আগেই বন্দুকের টোটায় পশুর চর্বি আছে এই সন্দেহ থেকে একটা গোটা মহাবিদ্রোহ দেখেছে ভারত। সুতরাং জাত যাওয়ার ভয়ে সাবান ছুঁয়ে দেখত না দেশের অধিকাংশ মানুষই। এই বিশাল বাজার ধরাই ছিল গোদরেজ সংস্থার লক্ষ্য। দেশীয় বাজারে প্রথম চর্বিমুক্ত সাবান নিয়ে আসে এই সংস্থাই। ‘চাভি’ নামে এই ব্র্যান্ডের প্রথম পর্বের সাবানগুলোর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নম্বর টু’, বিজ্ঞাপন করা হয়েছিল অ্যানি বেসান্ত ও রাজাগোপালাচারিকে নিয়ে। এর জনপ্রিয়তার দরুন দ্বিতীয় পর্বে তৈরি হওয়া ‘নম্বর ওয়ান’ সাবানটিকে নিয়ে আরো বড় পরিকল্পনা করে গোদরেজ। সেই সাবানটির বিজ্ঞাপন করা হয় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, গোটা দেশ তথা বিশ্বের কাছেও যিনি তখন অন্যতম চেনা মুখ। ১৯২২ সালে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ওই বিজ্ঞাপন। চর্বিমুক্ত সাবানকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। লাভের মুখ দেখেছিল সংস্থাও।

বহু পণ্য ও পরিষেবার বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃতত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ছবি, মন্তব্য ও উদ্ধৃতি। তাঁর ছোটগল্প ও উপন্যাসেও বার বার উঠে এসেছে বিজ্ঞাপনের প্রসঙ্গ। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ১৮৮৯ থেকে শুরু করে ১৯৪১, পাঁচ দশকের বিস্তৃত সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রায় নব্বইটি বিজ্ঞাপনে নিজের মন্তব্য, উক্তি, উদ্ধৃতি, এমনকি ছবিও ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন। বিদেশি ও দেশীয় এয়ারলাইন্স, ভারতীয় রেল থেকে শুরু করে গোদরেজ সাবান, বোর্নভিটা, কুন্তলীন কেশ তেল, রেডিয়ম ক্রিম, বাটার জুতো, ডোয়ারকিন হারমোনিয়াম, সমবায় বিমা, ছাপাখানা, কটন মিল, ফটো-স্টুডিও, রেকর্ড, বই, মিষ্টির দোকান, ঘি, দই, কাজল-কালি, পেন্টওয়ার্ক, এমনকি মস্তিষ্কবিকৃতি রোগের মহৌষধ পর্যন্ত হরেক পণ্য ও পরিষেবার বিজ্ঞাপনে খুঁজে পাওয়া যায় রবীন্দ্রনাথকে। অধিকাংশই প্রকাশিত হয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা, অমৃতবাজার, দ্য স্টেটসম্যান, প্রবাসী, তত্ত্ববোধিনী, ক্যালকাটা গেজেট-এ, আর বিদেশে দ্য গার্ডিয়ান, দ্য গ্লোব-এর মতো পত্রিকাতেও।

রবি ঠাকুর নেহাত শখে যে এ সব বিজ্ঞাপনে সম্মতি দিতেন, তা নয়। মূলত বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সংগ্রহই ছিল তাঁর বিজ্ঞাপন জগতে আসার কারণ। দেশে বিদেশে বহু বিজ্ঞাপনে তাঁকে ব্যবহার করা শুরু হয়। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করে ব্রিটিশের দেওয়া নাইটহুড ত্যাগ করেছিলেন, সেই ঘটনার সূত্রেও এক পানীয় কোম্পানি নিজেদের বিজ্ঞাপনে লিখেছিল, ‘টেগোর হ্যাজ গিভ্ন আপ হিজ নাইটহুড বাট ক্যান ইউ অ্যাফোর্ড টু গিভ আপ ড্রিংকিং আওয়ার ফ্রুট?’

রবীন্দ্রনাথ নিজে বিজ্ঞাপন বিষয়ে কী বা কতটা ভাবতেন, সে প্রশ্নের উত্তরও ছড়িয়ে আছে তাঁর নানা লেখায়। ‘স্বর্ণমৃগ’ ছোটগল্পে তিনি লিখছেন, ‘‘...একদিন রাত্রে বিছানায় শুইয়া কাতরভাবে প্রার্থনা করিলেন, ‘হে মা জগদম্বে, স্বপ্নে যদি একটা দুঃসাধ্য রোগের পেটেন্ট ঔষধ বলিয়া দাও, কাগজে তাহার বিজ্ঞাপন লিখিবার ভার আমি লইব।’’ ‘একরাত্রি’ গল্পে লিখছেন, ‘...আমরা রাস্তার ধারে দাঁড়াইয়া বিজ্ঞাপন বিলি করিতাম...’

কখনও ব্যক্তিগত অনুরোধ, কখনও বা অর্থের জন্য হরেক রকম পণ্য এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য বিজ্ঞাপন লিখেছেন রবি ঠাকুর। কখনও বা অনুমতি দিয়েছেন বিজ্ঞাপনে তার নাম ব্যবহার করার। এসব বিজ্ঞাপনে কখনও বা রবীন্দ্রনাথের উক্তি ব্যবহৃত হয়েছে বিজ্ঞাপন হিসেবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)