দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
সুবর্ণভূমি ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলে নেতানিয়াহুর এই দাবিটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন কয়েক সপ্তাহ ধরে খবর প্রকাশিত হচ্ছে, ইরান সংঘাত নিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে আর পরামর্শ করা হচ্ছে না। সাধারণ জনগণ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিশ্বাসযোগ্যতা এতোটাই কম যে, তার ভিডিও বার্তার পর জল্পনা তৈরি হয়, বাস্তবতা সম্ভবত কল্পনার চেয়েও খারাপ।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সমন্বয় রয়েছে। ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় বলেও জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিক পরামর্শক ও জনমত জরিপকারী ডালিয়া শাইন্ডলিন বলেন, ‘সম্পর্কটি কতটা চমৎকার তা নিয়ে তিনি (নেতানিয়াহু) এত বেশি কথা বলছেন যে, দু’জনের সম্পর্কে কতটা চির ধরেছে তা নিয়ে আমি বেশ উদ্বিগ্ন। কারণ সকল দৃষ্টিকোণ থেকে যুদ্ধটি যে খুব বাজেভাবে এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে একে অপরের প্রতিচ্ছবি হয়ে আছেন। তারা দুজনেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য জনতুষ্টিবাদী নীতি গ্রহণ করেছেন। অতীতের রীতিনীতি বা সীমাবদ্ধতার প্রতি সামান্যতম তোয়াক্কা না করে, তারা সেইসব ব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তিকে ক্ষুণ্ণ করেছেন যা তাদেরকে ক্ষমতায় এনেছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর থেকে তারা নিজেদের ভাগ্যকে এমন শক্তভাবে বেঁধে ফেলেছেন যে, তাদের কারো পক্ষে এ থেকে বের হওয়া কঠিন।
নেতানিয়াহু কয়েক দশক ধরে একের পর এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দিতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছেন। ২০১৮ সালে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে হওয়া বহুপক্ষীয় পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত করেছিলেন। ফলস্বরূপ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদার হয় এবং এক ডজন পারমাণবিক ওয়ারহেডের জন্য যথেষ্ট সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ গড়ে ওঠে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইরানের পরমাণু হুমকির একমাত্র সমাধান হলো যুদ্ধ এবং সেই যুদ্ধে সহজেই জয়লাভ করা যাবে।
এর আগে মার্কিন বাহিনী আকস্মিক অভিযান চালিয়ে কারাকাস থেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়।
ইসরাইলের সাবেক কূটনীতিক অ্যালন পিঙ্কাস বলেন, ‘নেতানিয়াহু, তার স্বভাবসুলভ ধূর্ততার কারণে, ভেনিজুয়েলাকে একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন।’
পিঙ্কাস বলেন, ‘নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ইরানের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জনগণ বিদ্রোহ করছে। বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। এটাই আমাদের উপযুক্ত সময়। আমরা একসঙ্গে এই সরকারকে উৎখাত করতে এবং তিন-চার দিনের মধ্যে যুদ্ধে জিততে পারব।’
একাধিক প্রতিবেদন অনুসারে, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছিলেন যে ইরান উপসাগরে মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা করতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ মার্কিন প্রশাসনের যুদ্ধবাজরা যুক্তি দেন, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে যা বলা হয় তা ঠিক নয় এবং পাল্টা আঘাত হানার মতো শক্তি তাদের নেই।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা ভুল প্রমাণিত হন। ইরানের জনগণ বিদ্রোহ করেনি, শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেনি, কুর্দিরা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আক্রমণ করেনি। সেইসঙ্গে বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা, হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
পিঙ্কাস বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর প্রায় ৩০ দিন পর মার্চের শেষ দিকে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল যে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর খুব হতাশ ছিলেন।’
যুদ্ধ সম্পর্কে তার অবিরাম আশাবাদী বিবৃতিতে ট্রাম্প ইসরাইল ও নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ করা বন্ধ করে দেন। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে যখন মার্কিন আলোচকরা তাদের ইরানি প্রতিপক্ষ এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন, তখন ইসরাইলকে এ বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।
শান্তি আলোচনায় কী কী বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে, সে সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে, কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার বা আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীর বিষয়ে কোনো উল্লেখ ছিল না, যদিও এই দুটি বিষয়ই ইসরাইলের অগ্রাধিকার।
ট্রাম্প যখন নেতানিয়াহুর কথা উল্লেখ করেছেন, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাকে তিরস্কার করার জন্য করেছেন।
যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ট্রাম্প প্রথমে বলেছিলেন, লেবাননকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু পরে, যুদ্ধবিরতি বিপন্ন হলে, তিনি দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং ইসরাইলকে একই পথ অনুসরণ করতে বাধ্য করেন।
সম্পর্কের এই চরম অবনতির পর থেকে ইসরাইলি সরকারি কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলে আসছেন যে, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হতে পারে না এবং পুনরায় সংঘাত অনিবার্য। তবে সেই সংঘাত এখনো শুরু হয়নি এবং ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালির আশেপাশে সাম্প্রতিক গোলাগুলির গুরুত্বকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
ইসরাইলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শ্যাপিরো বলেছেন, ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ইরানের বাইরে তার পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জের দিকে নজর দিচ্ছেন: ১৪ মে চীন সফর এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক।
নেতানিয়াহু নিজেও জানেন যে, ট্রাম্প তাদের ভূ-রাজনৈতিক জোট থেকে নিজেকে কতটা মুক্ত করতে পারবেন তার একটি সীমা আছে। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন যেমনটা উল্লেখ করেছেন, নেতানিয়াহু মার্কিন রাজনীতিতে সবসময়ই আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেন।
পিঙ্কাস বলেন, ‘ট্রাম্পের সমস্যা হলো, যদি তিনি নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন, তাহলে তিনি মূলত স্বীকার করে নেবেন যে তাকে এই যুদ্ধে প্ররোচিত করা হয়েছিল।’ তার মতে, এই সংঘাত নিশ্চিতভাবেই ব্যালট বাক্সে উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
নেতানিয়াহুকে অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। বর্তমান জনমত জরিপ অনুযায়ী নির্বাচনে তার প্রধানমন্ত্রীত্বের অবসান ঘটতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনগুলো কংগ্রেসীয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি ট্রাম্পকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতাহীন করে তুলতে পারে।
পিঙ্কাস বলেন, ‘এই যুদ্ধ নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প উভয়কেই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। অন্য কথায়, তারা একে অপরকে মারাত্মকভাবে বিপদে ফেলেছেন।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান