যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু গো-খামারিদের হাহাকার, আত্মহত্যার হুমকি

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৯ মে,২০২৬, ০১:০৭ এ এম
আপডেট : মঙ্গলবার, ১৯ মে,২০২৬, ০১:৩০ এ এম
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু গো-খামারিদের হাহাকার, আত্মহত্যার হুমকি

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নতুন গবাদি পশু জবাইসংক্রান্ত কঠোর নির্দেশনা ঘিরে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোরবানির ঈদের আগে এ ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকরের ফলে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। অনেকেই ভয়ে গরুর হাটে যাচ্ছেন না, ফলে পশুর হাটগুলো এখন ক্রেতাশূন্য।

পরিস্থিতির কারণে অনেকে গরুর পরিবর্তে ছাগল বা ভেড়া কোরবানির কথা ভাবছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজ্যের লাখ লাখ হিন্দু গো-খামারির ওপর। সারা বছর ঋণ নিয়ে কোরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে গরু লালন-পালন করা এসব খামারি এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন। লোকসানের মুখে পড়ে এবং ঋণের বোঝা নিয়ে মহাবিপাকে পড়া অনেক হিন্দু খামারি বিষ খেয়ে আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছেন প্রকাশ্যে। এমনকি সব গরু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কিনে নিতে হবে বলেও দাবি তুলছেন গরুর খামারিরা।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পরপরই কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গবাদি পশু জবাই ও হাটের ওপর কড়া প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। রাজ্য সরকার মূলত ১৯৫০ সালের ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি নির্দেশিকাকে কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।

নতুন এ সরকারি আদেশ অনুযায়ী, পুরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসক যৌথভাবে লিখিত সার্টিফিকেট দিলেই কোনো বলদ, গরু বা মহিষ জবাই দেওয়া যাবে। এই সার্টিফিকেট পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যেখানে উভয় প্রতিনিধিকে একমত হতে হবে যে পশুটি কাজ ও প্রজননের ক্ষেত্রে অন্তত ১৪ বছরের বেশি বয়সি অথবা বার্ধক্য, আঘাত, বিকৃতি বা অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে গর্ভবতী কোনো পশু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, উপযুক্ত সার্টিফিকেট থাকলেও প্রকাশ্য স্থানে, রাস্তাঘাটে বা খোলা জায়গায় পশু জবাই দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। নির্ধারিত বা অনুমোদিত কসাইখানাতেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত পরিদর্শন কাজে প্রশাসনকে বাধা দেওয়া যাবে না। বিধানসমূহ লঙ্ঘন করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড, এক হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

গরুর কি বার্থ সার্টিফিকেট আছে? – বয়স নির্ধারণের নিয়মে ক্ষোভ

সরকারের এই নতুন আদেশের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন খামারি ও জনপ্রতিনিধিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বিধায়ক হুমায়ুন কবির প্রশ্ন তোলেন, পশু কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সেটা ১৪ বছরের হতে হবে- এটা কিভাবে নিশ্চিত হবে? গরুর কি বার্থ সার্টিফিকেট আছে? তাহলে প্রশাসন কীভাবে তার বয়স নির্ধারণ করবে? এক বছর সময় দিলেও কি সরকার পশ্চিমবঙ্গের সব গরুর বয়স নির্ধারণ করে বার্থ সার্টিফিকেট ইস্যু করতে পারবে?’

হুমায়ুন কবীর আরো জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন, মুসলিম সমাজ যেন জনসমক্ষে কিছু না করে গোপনে ঘিরে রাখা স্থান বা নিজেদের নির্দিষ্ট জায়গায় যেন কোরবানির কাজ করে। কিন্তু কিছু পুলিশ কর্মকর্তা সরকারের কাছে অতি-উৎসাহী হয়ে ১৪ বছরের বার্থ সার্টিফিকেট দেখানোর মতো অতিরঞ্জিত নির্দেশিকা দিয়ে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন।

বিষ খেয়ে মরতে হবে

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মুর্শিদাবাদের ডোমকল পশুর হাটসহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তিক হাট সম্পূর্ণ বন্ধ ও ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়েছে। বেপারি ও ক্রেতারা আইনি জটিলতার ভয়ে বাজারে আসছেন না।

ডোমকল হাটের এক প্রান্তিক হিন্দু খামারি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের এ দিয়েই সংসার চলে। বিক্রি না হলে গরু মাঠে ছেড়ে দিতে হবে, আর আমাদের বিষ খেয়ে মরতে হবে। কেনাবেচা যদি বন্ধ হয়ে যায়, সরকার তো আমাদের পাশে আসবে না। আমাদের তো চরম ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।

রাজ্যের বেশ কয়েকজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এই পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, শুধু মুসলিমরা খাওয়ার জন্য সবাই গরু পোষে না, এটা অনেকের পেশাও। ক্রেতাশূন্য বাজারে ক্ষুব্ধ খামারিরা ব্যঙ্গ করে বলেন, আমাদের স্বজাতি যারা আছো, গরুগুলো প্রিয় সনাতন ধর্মের ভাই-বোনদের ফ্রিতে দিয়ে আসো, তারা ফ্রিতে গোমাতার পূজা করুক। আমাদের আর এগুলোকে খাওয়ানোর সামর্থ্য নেই।

তারা বলছেন, রাজ্য সরকারের কাছে একান্ত অনুরোধ, অমুসলিম হিন্দু খামারি সারা বছর এই আশায় গরু পালেন যে, ভালো দামে বিক্রি করে মেয়ের বিয়ে দেবেন, ঘর বাঁধবেন বা সন্তানের জন্য গয়না গড়বেন, তাদের এই বিপুল ক্ষতির ক্ষতিপূরণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা অবিলম্বে করা হোক।

আয়ের চাকা থমকে গেছে

পশ্চিমবঙ্গের যে পশুর হাটগুলো একসময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের কোলাহলে জমজমাট থাকত, আজ সেখানে শুধুই নীরবতা। প্রান্তিক চাষি ও গো-খামারিরা বছরের পর বছর ধরে গবাদি পশু পালন করেন, যাতে তা বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানো যায় এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটানো যায়। কিন্তু বর্তমান অচল অবস্থায় তাদের রুজি-রুটির চাকা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। খামারে গরু মজুত রয়েছে, অথচ তা বাজারে নেওয়ার বা বিক্রি করার কোনো উপায় নেই।

সরকারের ১৪ বছরের আইনি নির্দেশিকা ঘিরেই উঠেছে এক বড়সড় প্রশ্ন। খামারিদের দাবি, গরুর স্বাভাবিক গড় আয়ু এমনিতেই ১২ থেকে ১৫ বছর হয়। ১৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর সেই বৃদ্ধ বা অনুৎপাদনশীল পশুর যত্ন নেওয়ার মতো সামর্থ্য আর সাধারণ কৃষকদের থাকে না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে সেই অকেজো ও জরাজীর্ণ গরু বাজারে কিনবে কে?

ডোমকল পশুর হাটসহ বিভিন্ন হাটে এসে খামারি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। নিরুপায় ও ক্ষুব্ধ খামারিরা চরম হতাশায় সরাসরি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নীতিকে আক্রমণ করে বলছেন, মোদিকে সব গরু কিনতে হবে, গরু কিনে চাষিকে টাকা দিতে হবে। আমরা গরু বেচে খাই, গরু বেচে চাষ করি। মোদি যে ব্যবস্থাটা করেছেন, এ অবস্থায় তিনি ঘরে ঘরে একটা-দুটো করে চাকরি দিন, আমরা তাই করে খাব, তাহলে আমাদের গরু দরকার নেই। নয়তো এই গরু মোদি নিজেই কিনে নিক।

বৈশ্বিক গো-মাংস রপ্তানিতে শীর্ষে ভারত

অভ্যন্তরীণ বাজারে যখন সাধারণ প্রান্তিক খামারিদের ওপর কড়া বিধিনিষেধ ও নজরদারি চালানো হচ্ছে, তখন ভারত সরকারের নিজস্ব তথ্য এবং আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এক বিশাল নীতিবৈষম্যকে সামনে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ ও ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গো-মাংস (মূলত মহিষের মাংস) রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে শীর্ষ তিনের মধ্যে অবস্থান করছে। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছর জুড়ে ভারত থেকে প্রতিবছর গড়ে ১২ থেকে ১৫ লাখ টন মাংস আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়েছে।

মার্কিন কৃষি বিভাগের সর্বশেষ ২০২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই বছর ভারতের মাংস রপ্তানি আরো বৃদ্ধি পেয়ে ১৭ লাখ টন ছোঁয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারতের কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য রপ্তানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ভারত সরকার গবাদি পশুর মাংস রপ্তানি করে প্রায় চার বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩৫,০০০ কোটি রুপিরও বেশি) রাজস্ব আয় করে। ভারতের উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও অন্ধ্রপ্রদেশের মতো বড় বড় করপোরেট কসাইখানা থেকে এই প্রক্রিয়াজাত মাংস মূলত ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকারি এক হিসাবে রাজ্যে মোট গবাদি পশু তিন দশমিক ৭৪ কোটির বেশি। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা প্রায় এক দশমিক নয় কোটি। দুধ উৎপাদনে রাজ্যটি ভারতের দ্বাদশতম স্থানে রয়েছে। রাজ্য সরকারের পশুসম্পদ বিকাশ সংস্থার অধীনে রাজ্যে ছয় হাজারের বেশি গো-প্রজনন কেন্দ্র বা কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র চালু রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে খামারি ও সমালোচকদের প্রশ্ন, করপোরেট কোম্পানিগুলো যখন প্যাকেটজাত মাংস বিদেশে রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকা লাভ করছে, তখন দেশের ভেতরের প্রান্তিক হিন্দু-মুসলিম চাষিরা কেন সামান্য পশু বিক্রি করতে গিয়ে আইন ও ঋণের জালে জড়িয়ে দেউলিয়া হবেন?

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)