সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর গদি অনেক দিন ধরেই টালমাটাল। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন। গত মার্চ মাসেও যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু দম্ভভরে বলেছিলেন, ‘আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি।’
কিন্তু ইসরায়েলের সেই লক্ষ্য পূরণ হওয়ার অনেক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। ওই স্মারকে ইরানের শর্ত মেনে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের উল্লেখও রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে, ইরানও পাল্টা জবাব দিতে থাকে। ইরান যুদ্ধের মধ্যেই মার্চের শুরুতে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল ইসরায়েল।
সে সময় মধ্যপ্রাচ্যকে পাল্টে দেওয়ার যে দম্ভোক্তি নেতানিয়াহু করেছিলেন, দিন যত গড়িয়েছে, তা ক্রমে ফাঁপা বুলিতে পরিণত হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে হামলার সময় জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে নেতানিয়াহু আগে থেকেই সমালোচনার মুখে রয়েছেন।
এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর বিষয় নিয়েও তাকে ভোটারদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু এরই মধ্যে অক্টোবরের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত সপ্তাহে তিনি প্রার্থিতা নিশ্চিত করেন।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পরাজয়ের পথে রয়েছে। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় নেতানিয়াহু গভীর প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তাই সেখানে তাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে একটি নতুন সরকার গঠন সম্ভব হবে, এমনটা খুব কম ইসরায়েলি বিশ্বাস করেন।
স্থায়ী বিজয় না পাওয়া
সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন নেতানিয়াহু। এবার নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা তিনি। সমর্থকদের কাছে একসময় তিনি ‘কিং বিবি’ নামে পরিচিত ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি বিরোধীদের সীমাহীন ক্ষোভেরও লক্ষ্যবস্তু।
নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি তাকে এমন একজন কঠোর নিরাপত্তাপন্থী নেতা হিসেবে তুলে ধরে, যিনি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে ঠেকিয়ে রেখেছেন এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলের শত্রু ইরান ও তার আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে হামলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
২০২৫ সালে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, জর্ডান নদীর পশ্চিমে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র থাকবে না।
যদিও হামাসের হামলার আগেই নিরাপত্তা ব্যর্থতার কারণে নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তবে সেসবের দায় তিনি স্বীকার করেননি। গাজা ও লেবাননে অভিযান তাকে সামরিক সাফল্য এনে দিলেও স্থায়ী বিজয়ের দেখা তিনি পাননি।
বরং তার সামরিক অভিযানের কারণে গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
দেশের অভ্যন্তরে সমালোচকেরা বলেছেন, নেতানিয়াহু গাজা সীমান্তের নিরাপত্তা থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং হামাসকে বাস্তব হুমকি হিসেবে গুরুত্ব দেননি।
বেশির ভাগ ইসরায়েলি গাজা যুদ্ধকে সমর্থন করেছিলেন। তবে অনেকেই নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশলের বিরোধিতা করেছেন।
কয়েকজন শীর্ষ জেনারেল এবং জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেছিলেন, এ যুদ্ধ নিয়ে তার স্পষ্ট কোনো কৌশলগত পরিকল্পনা ছিল না।
ইসরায়েলে উগ্রপন্থী ইহুদিরা হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড উদ্যাপন করেছেন। যদিও হামাস এখনো গাজার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে, ইরানের শাসনব্যবস্থাও একই আছে এবং হিজবুল্লাহও লেবাননে সক্রিয়।
ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের কথা বলা আছে। এর ফলে ইসরায়েলকে এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হতে হবে।
এ প্রসঙ্গে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, ‘নেতানিয়াহু যুদ্ধ হেরে গেছেন। নেতানিয়াহু কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেননি, চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় তিনি ভেঙে পড়েছেন।’
নেতানিয়াহু এই ধরনের সমালোচনার নিন্দা করে বলেছেন, এসব ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর প্রচারের অংশ।
ইরান থেকে সম্ভাব্য পারমাণবিক হুমকি নিয়ে সতর্ক করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা যদি সময়মতো এবং বিপুল শক্তি প্রয়োগ করে পদক্ষেপ না নিতাম তাহলে আজ আমরা এখানে থাকতাম না।’
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার
গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের কারণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ উঠেছে। ইসরায়েল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। নেতানিয়াহু আইসিসির এই উদ্যোগকে ‘অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইসরায়েলের পক্ষে পশ্চিমা সমর্থন অর্জনের জন্য নেতানিয়াহু নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন, যদিও একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাকে বিরক্ত করে ছেড়েছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহুকে গালিগালাজ করতেন বলেও দাবি করেছেন একজন লেখক।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং সেখানে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনায় নেতানিয়াহুর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মহল নেতানিয়াহুকে শান্তিপ্রক্রিয়া আবার শুরু করার জোর আহ্বান জানাচ্ছে।
এ নিয়ে দুপক্ষেই ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, হামাসের হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা ‘ন্যায়সংগত’ নয়। অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতিকেরা আবার নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ‘যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার করার’ অভিযোগ করেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং ডেমোক্র্যাটদের ওপর তার সমালোচনামূলক আক্রমণ ইসরায়েলের প্রতি দুদলের রাজনৈতিক সমর্থনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দুদলের ভোটারদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমছে। তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ মাসে এক ফোনালাপে মেজাজ হারিয়ে নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলেছেন।
সূত্র: রয়টার্স