ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন চারদিকে উড়ছে প্রিয় দলের পতাকা, তখন স্রেফ টাকার অভাবে একটি আর্জেন্টিনার পতাকা কিনতে পারেনি ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবির। তবে প্রিয় দল ও প্রিয় খেলোয়াড় লিওনেল মেসির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে থামাতে পারেনি।
বাজার থেকে পতাকা কিনতে না পেরে বাড়িতে থাকা সাদা ও আকাশি রঙের পলিথিন সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে নিজেই তৈরি করে নেয় আর্জেন্টিনার একটি পতাকা। এরপর পরম যত্নে সেটি বাড়ির উঠানে উড়িয়ে দেয় সে।
ব্যতিক্রমী এই ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয়দের মাধ্যমে বিষয়টি নজরে আসে 'আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহ'-এর। খবর পেয়ে ক্লাবের সদস্যরা দ্রুতই এই খুদে ভক্তের পাশে দাঁড়ান। উপহার হিসেবে আবিরের হাতে তুলে দেওয়া হয় নতুন অফিসিয়াল পতাকা, জার্সি ও একটি ফুটবল। কাঙ্ক্ষিত এই উপহার হাতে পেয়ে আবেগে কেঁদে ফেলে শিশুটি।
আবির ঝিনাইদহ সদর পৌর এলাকার ভুটিয়ারগাতী উত্তর পাড়ার বাসিন্দা আলিউল ইসলামের ছেলে। সে ঝিনাইদহ উজির আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে এলাকায় বিভিন্ন দলের সমর্থকেরা নিজ নিজ বাড়ির ছাদে ও আঙিনায় পতাকা উড়িয়েছেন। আবিরও আর্জেন্টিনার একজন অন্ধ সমর্থক। সবাইকে পতাকা ওড়াতে দেখে তার মনেও সুপ্ত ইচ্ছা জাগে প্রিয় দলের পতাকা ওড়ানোর। সে তার বাবার কাছে একটি আর্জেন্টিনার পতাকা ও জার্সি কিনে দেওয়ার আকুতি জানায়।
কিন্তু চরম আর্থিক সংকটের কারণে দিনমজুর বাবা ছেলের সেই ছোট ইচ্ছাটি পূরণ করতে পারেননি। আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম শহরের একটি গ্রিল কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। অভাব-অনটনের সংসারে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কোনোমতে দিন পার করেন তিনি। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে ছেলের জন্য বাড়তি টাকা খরচ করে পতাকা ও জার্সি কেনা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
তবে প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা থেকে আবির নিজেই বিকল্প উপায় বের করে। বাড়িতে থাকা সাদা ও আকাশি রঙের পলিথিন কেটে সুই-সুতা দিয়ে সেলাই করে তৈরি করে নেয় আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা পতাকা। পরে একটি বাঁশের কঞ্চিতে বেঁধে বাড়ির উঠানে সেটি উড়িয়ে দেয়।
এই ঘটনাটি প্রথমে প্রতিবেশী ও স্থানীয় যুবকদের নজরে আসে। প্রতিবেশী খালিদ হাসান জীবন বলেন, ‘রাতে আমি বাড়িতে ফিরলে আমার মা আমাকে জিজ্ঞেস করেন আর্জেন্টিনার একটি পতাকার দাম কত? আমি কারণ জানতে চাইলে মা আবিরের বিষয়টি আমাকে বলেন। আবির তার বাবার কাছে একটা পতাকা চেয়েছিল, কিন্তু টাকার অভাবে তার বাবা কিনে দিতে পারেননি। পরে সে নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছে। মায়ের মুখে এ কথা শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই আমি বিষয়টি আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের সদস্যদের জানাই। তারা অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দিয়ে দ্রুতই আবিরের জন্য উপহার নিয়ে আসে।’
উপহার পেয়ে আবির আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। উপস্থিত সদস্যদের সামনেই সে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং উপহার নিয়ে যাওয়া বড় ভাইদের জড়িয়ে ধরে। এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
আবিরের বাবা আলিউল ইসলাম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি একটি গ্রিল কারখানায় কাজ করি। সংসারে অনেক অভাব। ছেলে পতাকা ও জার্সি চেয়েছিল, কিন্তু কিনে দিতে পারিনি। পরে জানতে পারি সে নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছে। আজ যারা আমার অভাবের সংসারে এসে ছেলের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, তাদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ।’
আনন্দে আত্মহারা আবির বলে, ‘আমি আর্জেন্টিনার বড় সমর্থক। মেসির খেলা আমার খুব ভালো লাগে। সবাই যখন পতাকা উড়িয়েছে, তখন আমারও খুব ইচ্ছা হয়েছিল। কিন্তু বাবা কিনে দিতে পারেননি। তাই আমি নিজেই পলিথিন দিয়ে পতাকা বানিয়েছিলাম। আজ নতুন পতাকা, জার্সি আর ফুটবল পেয়ে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে।’
আর্জেন্টিনা ফ্যান ক্লাব ঝিনাইদহের অ্যাডমিন শাহীনুর আলম লিটন বলেন, ‘স্থানীয় আর্জেন্টাইন সমর্থক খালিদ হাসান জীবনের মাধ্যমে আমরা তথ্যটি জানতে পারি। আবিরের এই গল্পটি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। একটি ছোট শিশুর গভীর ভালোবাসা ও আবেগের প্রতি সম্মান জানাতেই আমরা আমাদের ক্লাবের পক্ষ থেকে তার জন্য সামান্য কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম। তার মুখের ওই চওড়া হাসিমুখ দেখেই আমাদের উদ্যোগ সার্থক হয়েছে বলে মনে করি।’