তসলিম শিমুল
একসময় বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকার দলগুলোকে বলা হতো ‘ডার্ক হর্স’। বড় দলকে চমকে দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও শিরোপার লড়াইয়ে তাদের খুব কমই গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ সেই পুরোনো ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এখন আফ্রিকার প্রতিনিধিরা শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে না, বরং বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সক্ষমতাও দেখাচ্ছে।
আফ্রিকায় ফুটবলের যাত্রা শুরু হয় ঔপনিবেশিক আমলে। ইউরোপীয় শাসকদের হাত ধরে খেলাটি মহাদেশে প্রবেশ করলেও খুব দ্রুতই এটি স্থানীয় মানুষের আবেগ, আত্মপরিচয় এবং ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশে ক্লাব গড়ে ওঠে, আর ফুটবল ধীরে ধীরে সামাজিক ও জাতীয় চেতনার অংশে পরিণত হয়।
স্বাধীনতার পর আফ্রিকান দেশগুলো নিজেদের ফুটবল কাঠামো আরও শক্তিশালী করে। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল। এরপর আফ্রিকান কাপ অব নেশনস মহাদেশের সেরা দলগুলোর প্রতিযোগিতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। একই সময়ে বিশ্বকাপে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবিতে আফ্রিকার দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনও গড়ে তোলে, যার ফলে ফিফা পরবর্তীতে আফ্রিকার জন্য স্থায়ী কোটা নিশ্চিত করে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে আফ্রিকার অগ্রযাত্রাও ধাপে ধাপে এগিয়েছে। ১৯৩৪ সালে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে মিশর বিশ্বকাপে অংশ নেয়। ১৯৮২ সালে আলজেরিয়া পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকে চমকে দেয়। ১৯৯০ সালে রজার মিলারের নেতৃত্বে ক্যামেরুন কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ে। ২০০২ সালে সেনেগাল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে হারিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। আর ২০২২ সালে মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে মহাদেশের ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করে।
৪৮ দলের বিশ্বকাপ হওয়ায় ২০২৬ আসরে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্বও বেড়েছে। এবার মূল পর্বে খেলছে রেকর্ড নয়টি আফ্রিকান দেশ- মরক্কো, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, ঘানা এবং ডিআর কঙ্গো। এই উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে আফ্রিকার ফুটবল এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
বর্তমান আফ্রিকান দলগুলোর অন্যতম বড় শক্তি হলো শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে আধুনিক কৌশলি ফুটবলের সমন্বয়। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলার অভিজ্ঞতা তাদের খেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে তারা শুধু গতি ও শক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত আক্রমণ এবং কৌশলগত পরিকল্পনাতেও সমান দক্ষতা দেখাচ্ছে।
আজ ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর সাফল্যের পেছনেও আফ্রিকান ফুটবলারদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তাই বিশ্বকাপের মঞ্চে তাদের সাফল্য আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, উন্নয়ন এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের ফল।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলের গল্প এখন শুধু ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাকে ঘিরে নয়। আফ্রিকাও এখন সেই গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের শিরোপা লড়াইয়ে আফ্রিকান কোনো দলকে দেখা গেলে সেটি আর বিস্ময়ের বিষয় হবে না; বরং বিশ্ব ফুটবলের স্বাভাবিক অগ্রগতিরই প্রতিফলন হবে।