সম্পাদকীয়
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ‘জুলাই-৩৬’ হলে সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বিশেষ ঘটনা নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একইসাথে যে শিক্ষার্থী ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, তার নৈতিকর মান এতো নিম্ন যে, কোনো মতেই তিনি আর বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার যোগ্যতা রাখেন না। লক্ষণীয়, যে ছাত্রী হলে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি সফল ছাত্রগণঅভ্যুত্থানের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় ‘জুলাই-৩৬’ নামে নামাঙ্কিত।
ওই নারী শিক্ষার্থী গোপনে সহপাঠীদের ছবি তুলে লন্ডনপ্রবাসী প্রেমিকের কাছে পাঠাতেন বলে অভিযোগ। গত বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) রাতে প্রকাশ্যে আসে এই ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি দীর্ঘদিন ধরে হলের অন্তত দশ সহপাঠীর ঘুমন্ত অবস্থা, স্বাভাবিক পোশাক কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি গোপনে তুলেছেন। এমনকি বোরকা-নিকাব পরিহিত পর্দানশীন শিক্ষার্থীদেরও ওড়না খোলা অবস্থায় ছবি তুলে তা লন্ডনে পাঠানোর প্রমাণ মিলেছে।
ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই হলজুড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগীরা ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তারা মনে করছেন, কেবল হল থেকে বহিষ্কার নয়, বরং আইনগত ব্যবস্থাও গ্রহণ করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপকর্মের সাহস না পায়। কারণ এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একাধিক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামাজিক মর্যাদা।
এই ঘটনায় প্রশাসন দ্রুত একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং অভিযুক্তকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে। আগামী ৯ আগস্টের মধ্যে লিখিত অভিযোগ জমা দিতে বলা হয়েছে ভুক্তভোগীদের। তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে ক্যাম্পাসে আলোচনা চলছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, হল প্রশাসনকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ তদন্তের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ অনুযায়ী, কারও সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত ছবি তোলা ও তা প্রচার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ঘটনায় স্পষ্টতই একাধিক আইনি লঙ্ঘন হয়েছে। যেমন, গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন, নৈতিকতা লঙ্ঘন এবং সাইবার অপরাধ। আইন বলে, ভুক্তভোগীরা চাইলে এই ঘটনায় মামলা করতে পারেন এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
নৈতিক দিক থেকে এটি আরও গুরুতর। কারণ একজন ছাত্রী যে তার সহপাঠী, বন্ধু বা রুমমেটের বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন, তা সামাজিক সম্পর্কের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশ্বাস ও নিরাপত্তার যে পরিবেশ থাকার কথা, এই ঘটনা তার ঠিক বিপরীত বাস্তবতা।
অভিযুক্তকে প্রমাণসাপেক্ষে শুধু শাস্তি দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। তাদের উচিত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া। যেমন, প্রতিটি হলের কমনরুম, বাথরুম ও করিডোরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্মার্টফোন ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়ানো, গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত কার্যক্রম ও মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ভুক্তভোগীদের ট্রমা থেকে বের করে আনতে উদ্যোগ গ্রহণ, দ্রুত ও ন্যায্য তদন্তের জন্য বহুপাক্ষিক স্বাধীন কমিটি গঠন করা।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও সজাগ থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে একটি সুস্থ, বিশ্বাসভিত্তিক ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে প্রত্যেককেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কাউকে সন্দেহজনক আচরণ করতে দেখা গেলে তা প্রশাসনকে জানানো উচিত, নীরব থাকলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
ইবি ‘জুলাই-৩৬’ হলের নামকরণ হয়েছে ২০২৪ সালের মহান ছাত্রগণঅভ্যুত্থান স্মরণে। আমরা দেখেছি, সেই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সম্পূর্ণ অপরিচিত নারী-পুরুষ শিক্ষার্থীরা ভাই-বোনের মতো কীভাবে পরস্পরকে আস্থায় নিয়ে সংগ্রাম করেছিলেন। সেই আস্থা-বিশ্বাসের পরিবেশ ভূলুণ্ঠিত হওয়া খুবই দুঃখজনক।