যশোর, বাংলাদেশ || বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

অর্থবছরের সময়কাল বদল: চ্যালেঞ্জ কোথায়

সজল দাস

প্রকাশ : বুধবার, ১৯ আগস্ট,২০২৬, ১২:০১ এ এম
অর্থবছরের সময়কাল বদল: চ্যালেঞ্জ কোথায়

গত প্রায় ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশের আর্থিক হিসাব-নিকাশের বছর শুরু হয় ১ জুলাই আর শেষ হয় ৩০ জুন। সেভাবেই বাজেট প্রণয়ন থেকে শুরু করে সরকারি আয়-ব্যয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা বা আর্থিক সব হিসাব করা হয়।

দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছর ধরে চলে আসা এই ধারায় এবার পরিবর্তন আনছে সরকার।

সম্প্রতি পহেলা জুলাইয়ের পরিবর্তে পহেলা এপ্রিল থেকে নতুন অর্থবছর শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হবে ৩১ মার্চ।

এই সিদ্ধান্ত ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছে।

অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত সামনে আসার পর থেকেই এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে কী সুবিধা বা অসুবিধা হতে পারে এবং সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের পথে কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সেসব আলোচনাও সামনে আসছে।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, অর্থবছর ঠিক করার মূলত কোনো ‘আন্তর্জাতিক নিয়ম’ নেই। প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব আবহাওয়া, কৃষি, রাজনৈতিক চক্র দেখেই এটি ঠিক করে।

যেমন- বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া এবং মিশরের মতো অনেক দেশ অর্থবছর হিসেবে জুলাই-জুন অনুসরণ করে। আবার ভারত, যুক্তরাজ্য, জাপানের অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ।

চীন, জার্মানি এবং ব্রাজিলের অর্থবছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থবছর অক্টোবর থেকে সেপ্টেম্বর।

বাংলাদেশের অর্থবছরে পরিবর্তন এনে এপ্রিল-মার্চ করার যে সিদ্ধান্ত সরকার নিয়েছে, তার মূল কারণ হিসেবে, বর্ষাকালকে অর্থবছরের শেষ থেকে সরিয়ে উন্নয়ন কাজের মান ও গতি বাড়ানোর কথা বলছে সরকার।

যদিও ৫৫ বছরের পুরনো চক্র ভেঙে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে নতুন ধারায় আনার এই উদ্যোগকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।
তারা বলছেন, ক্যালেন্ডারের পাতা তিন মাস এগিয়ে দিলেও যদি নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্প শেষ না হয়, ব্যয় না কমে, দুর্নীতি না থামে, তাহলে এই পরিবর্তন কোনো কাজে আসবে না।

‘বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন না এনে কেবল অর্থবছরের সময়কালে পরিবর্তন আনলে কোনো গুণগত পরিবর্তন হবে না’ বলেই মত সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের।

অর্থবছর কেন গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশে দৈনন্দিন জীবনে বঙ্গাব্দ ও খ্রিস্টাব্দ দুটোই ব্যবহার করা হয়। পহেলা বৈশাখ থেকে চৈত্র মাসের হিসাব যেমন অনেক ব্যবসায়ী ব্যবহার করেন আবার অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর বছরের হিসাব করা হয়।

কিন্তু রাষ্ট্রের আর্থিক হিসাব-নিকাশ চলে অন্য একটি ক্যালেন্ডারে- যার নাম অর্থবছর।

অর্থবছর হলো ১২ মাসের একটি নির্দিষ্ট সময়, যার মধ্যে সরকার আয়-ব্যয়ের হিসাব করে, বাজেট প্রণয়ন করে এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।

দেশের জিডিপি, রাজস্ব আদায়, মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ- সবকিছুর হিসাব এই অর্থবছর ধরেই হয়।

অর্থবছর এক দেশের সরকারের নীতি-সিদ্ধান্তে পরিবর্তনযোগ্য। গত কয়েক দশকে বিশ্বের বহু দেশ প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের অর্থবছর বদলেছে।

মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষে জুলাই-জুন অর্থবছর চালু হয়। পাকিস্তান আমলেও তা বহাল থাকে।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালে একবার ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে ৩০ জুন ১৯৭২ পর্যন্ত ‘শর্ট ইয়ার’ বাজেট দিয়েছিলেন।

এরপর থেকেই আজ পর্যন্ত ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন সময়টিই অর্থবছর হিসেবে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। যার পেছনে বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় এই দুটি বিষয়ই মোটাদাগে কাজ করে।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, জুন মাসে অর্থবছর শেষ করে নতুন বাজেট ঘোষণা- বাংলাদেশে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। ফলে বাংলাদেশের প্রশাসন, ব্যাংক, কর কাঠামো সবই এই চক্রে অভ্যস্ত।

এছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থবছর জুলাই থেকে শুরু। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বড় ঋণ ও অনুদান আসে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ থেকে। তাদের সঙ্গে হিসাব মেলাতে জুলাই-জুন সুবিধাজনক।

কতটা কার্যকর, চ্যালেঞ্জ কোথায়

অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা দুটিই রয়েছে। এছাড়া এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলেও মনে করেন অর্থনীতিবিদ এবং গবেষকরা।

তারা বলছেন, অর্থবছর মার্চ-এপ্রিলে আনার ফলে বর্ষাকাল অর্থবছরের শেষে না থেকে মাঝামাঝি চলে যাবে। ফলে মার্চের মধ্যে বড় কাজ শেষ করে বর্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া যাবে।

জুনের শেষ সপ্তাহে তাড়াহুড়ো করে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং বিল সমন্বয়ের প্রবণতাও কমবে বলে মত অনেকের।

এছাড়া বাংলাদেশ যদি বৈশাখ-চৈত্রকে অর্থবছর ধরা হয়, তাহলে ইংরেজি হিসাব দাঁড়াবে ১৪ এপ্রিল থেকে ১৩ মার্চ।

এর ফলে ধান-চাল সংগ্রহ, সার-বীজের ভর্তুকির বাজেট এক অর্থবছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বা বিআইবিএম এর অধ্যাপক মো. আহসান হাবিব বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে, শুধু তারিখ বদলালেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এটিও ঠিক নয় বলেই মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, উন্নয়ন খাতে বাজেট বরাদ্দ, অর্থের ব্যবহার এবং দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো ঠিক না হলে উন্নয়ন প্রকল্প একই গতিতে চলবে।

‘আবহাওয়ার অজুহাতে আগে মানুষ বাহানা করতো যে বৃষ্টির কারণে প্রজেক্ট শেষ হয় নাই। এখন দেখা যাক নতুন কী বাহানা আসে,’ বলেন তিনি।

বাংলাদেশে বাজেট বাস্তবায়নের ধরন যে কাঠামোতে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তন তেমন পরিবর্তন আনবে না বলেই মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

বর্ষাকালে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ, এই বিবেচনায় অর্থবছর পরিবর্তন যৌক্তিক নয় বলেই মনে করেন তিনি।

‘এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর নিয়ে গেলেও তো বর্ষাকাল চলে যাবে না। এখন শুরুর দিকে যে চ্যালেঞ্জ, সেটা মাঝপথে থেকেই যাবে,’ বলেন তিনি।

মি. মোয়াজ্জেম বলছেন, দেশের মোট বাজেটে উন্নয়ন অবকাঠামো বা ভূমি সংক্রান্ত অবকাঠামোর বাস্তবায়ন খুবই কম। বাজেটের বড়ো অংশই রেভিনিউ বাজেট, যার সঙ্গে বর্ষা, বন‍্যার সম্পর্ক নেই।

এছাড়া, বাংলাদেশে যে বাজেট ঘোষণা করা হয় তার এক-তৃতীয়াংশেরও কম এডিপি। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ রাজস্ব ব্যয়। সেখানে সময় পরিবর্তনের প্রভাব কম বলেই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট খরচে দুর্বল। এর সাথে বর্ষার সম্পর্ক কম।

এছাড়া অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রকল্পের যে উদাহরণ দেওয়া হচ্ছে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মি. মোয়াজ্জেম।

‘যে প্রকল্পের অজুহাত দিচ্ছি আমরা, সেই প্রকল্পের কোনোটাই তো তার নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না। উন্নয়ন প্রকল্পের অধিকাংশই দুইবার-তিনবার পর্যন্ত রিভিসন হচ্ছে। এখানে যে বরাদ্দ বাড়ছে, দুর্নীতি হচ্ছে- এগুলোর সাথে তো বর্ষার সম্পর্কই নাই,’ তিনি বলেন।

অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ, সময় পরিবর্তনের সাথে রাজস্ব আদায়, সরকারি ক্রয়, অর্থছাড়, প্রকল্প পর্যবেক্ষণসহ পুরো কাঠামোয় সংস্কার আনতে হবে।

এছাড়া সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা।

তারা বলছেন, এটি কেবল তারিখের পরিবর্তন নয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে নতুন চক্রে ঢালতে হবে।

অর্থাৎ এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগের সব সফটওয়্যার, বাজেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আপডেট করতে হবে।

আয়কর, রিটার্ন, ভ্যাট, ব্যাংক-বিমার করবর্ষ, কোম্পানির অডিট- সবকিছুর নতুন সময়সীমা ঠিক করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রুমানা হক বলছেন, আবহাওয়া, দাতা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়সহ নানা কারণে এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে, এটি বাস্তবায়নের আগে কীভাবে আর্থিক হিসাব সমন্বয় করা হবে সেই প্রস্তুতি জরুরি।

‘এর ফলে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে, অর্থ ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো প্রস্তুত কি না, বিভিন্ন প্রকল্পের মেয়াদ পুনর্মূল্যায়ন, প্রস্তুতির বিষয়গুলো দেখতে হবে,’ বলেন তিনি।

সরকার যা বলছে

বাংলাদেশে অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়। ২০১০ সালেও একবার এই সময়সূচি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন সরকার, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি।

এবারও জাতীয় সংসদে বাজেট নিয়ে আলোচনায় জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার প্রস্তাব দিয়েছিল বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী।

১৭ আগস্ট সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার ১৭তম বৈঠকে অর্থবছর পরিবর্তনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেখানে এর যুক্তি এবং কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশের অর্থবছর হবে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ।

এক্ষেত্রে ২০২৭-২৮ অর্থবছরকে ‘ট্রানজিশনাল’ ধরে জুলাই ২০২৭ থেকে মার্চ ২০২৮ পর্যন্ত নয় মাসে শেষ করা হবে।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যে প্রেস বার্তা দিয়েছে, সেখানে অর্থবছরের সময়সূচি পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমানে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল-মে-জুন, যে সময় দেশে বর্ষা শুরু হয়। ফলে সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন, স্থানীয় সরকারের অবকাঠামো কাজে ধীরগতি দেখা দেয়। এতে কাজের মান নষ্ট হয় এবং জনদুর্ভোগ বাড়ে।

এপ্রিল-মার্চ করা হলে অর্থবছরের শেষ তিন মাস হবে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ। এতে করে শুষ্ক মৌসুমে কাজ দ্রুত শেষ করা যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে একটি কর্মপরিকল্পনাও মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর দেওয়া প্রেস বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হচ্ছে, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, লেজিসলেটিভ বিভাগ ও অর্থ বিভাগকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করবে বলে জানানো হয়েছে।

সূত্র: বিবিসি

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)