ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
যশোর সদর উপজেলায় আমন ধানের আবাদ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সন্তুষ্টি থাকলেও ধানের ন্যায্য দাম নিয়ে রয়েছে হতাশা। মাঠে ধানের অবস্থা ভালো থাকলেও সার, কীটনাশক, সেচসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত লাভ হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় কৃষকেরা। তবে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে উপজেলায় সারের তেমন কোনো সংকট নেই।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চাহিদা অনুযায়ী অনেকেই সার পাচ্ছেন। তবে কিছু কৃষকের অভিযোগ, নগদ টাকায় না কিনে বাকিতে সার নিলে দোকানিরা কিছুটা বেশি দাম নিচ্ছেন। ফলে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে বলে তাদের দাবি।
সদর উপজেলার কৃষক মামুন হোসেন পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। এর মধ্যে দুই বিঘা জমি বৃষ্টিতে ডুবে গেলেও বাকি তিন বিঘা জমির ধান বেশ ভালো হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সারের তেমন সংকট তিনি বুঝতে পারছেন না। কয়েক দিন আগে সার কিনেছেন। জমি নিড়ানোর পর আবার সার কিনতে গেলে তখন পরিস্থিতি আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।
তবে ধানের দাম নিয়ে হতাশ আরেক কৃষক। তার ভাষ্য, ধানের দাম কম থাকায় চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, লোকসান হচ্ছে। সার, কীটনাশক, সেচসহ প্রায় সব কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে, অথচ ধানের দাম কম। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে পরিবারের খাওয়ার প্রয়োজন মেটানোর মতো ধান ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ধান চাষ না করার কথাও জানান তিনি।
কৃষক আলাউদ্দিন বলেন, তারা নিয়মিত সার পাচ্ছেন; সারের কোনো সংকট নেই। তবে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ধানের পাশাপাশি কীটনাশকের দামও বেশি। মাজরা, পচন ও কারেন্ট পোকার মতো রোগবালাই ধানের ক্ষতি করতে পারে। এসব রোগবালাই দমনে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে।
আলাউদ্দিনের মতে, ধানের দাম অন্তত এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা হলে কৃষকের কিছুটা লাভ হতে পারে।
কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, সারের দাম কিছুটা বেশি হলেও তারা সার কিনে ধানের আবাদ করছেন। মাঠে ধানের অবস্থাও ভালো। কিন্তু ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকেরা সমস্যায় রয়েছেন। ধানের দাম এক হাজার ৪০০ টাকা হলে কৃষকেরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে মনে করেন তিনি। তার অভিযোগ, কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি কেজি সারে পাঁচ থেকে দশ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কৃষক ইকরাম হোসেন বলেন, সারের সংকটের কথা মুখে মুখে শোনা গেলেও তাদের এলাকায় তেমন কোনো সংকট নেই। কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ডিলারের কাছ থেকে চার্ট অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামে সার কিনছেন তারা। তার দাবি, জমির ধানের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, সারের ঘাটতি নেই। বর্তমানে ধান বেশ ভালো অবস্থায় রয়েছে।
সার ডিলার বশির আহমেদ বলেন, যশোর সদরে পর্যাপ্ত পরিমাণে সার রয়েছে। কোনো কৃষক সার না পেয়ে তার দোকান থেকে ফিরে যাচ্ছেন না। তার অধীনে থাকা নয়জন সাব-ডিলারও নিয়ম অনুযায়ী সার নিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছেন। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি।
বশির আহমেদ বলেন, ইউরিয়া ও টিএসপি প্রতি বস্তা এক হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি এক হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি এক হাজার টাকা সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা হচ্ছে। কোনো কৃষকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর সার বিক্রির নিয়ম নেই বলেও জানান তিনি।
যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত পরিমাণে সারের মজুত রয়েছে। কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হচ্ছে। ডিলারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো কৃষকের কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম নেওয়া যাবে না এবং চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো কৃষক বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ করলে এবং তা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে সামগ্রিকভাবে যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাতে মাঠে আমন ধানের অবস্থা ভালো এবং সারের সরবরাহও মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে ধানের দাম কম থাকায় লাভের হিসাব মিলছে না কৃষকদের। তাদের আশঙ্কা, ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ধান চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে।
কৃষকদের দাবি, শুধু সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখলেই হবে না; সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উৎপাদিত ধানের ন্যায্য বাজারমূল্যও নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে পরিবারের খাবারের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত ধান উৎপাদনে আগ্রহ হারাবেন অনেক কৃষক।