যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

প্রাণিজগৎ

বাদুড় ঘণ্টায় ছয়শ’ মশা খায়

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
বাদুড় ঘণ্টায় ছয়শ’ মশা খায়

অন্নদাশঙ্কর রায় তার ‘বাদুড় ঝোলা’ ছড়ায় লিখেছেন: ‘আদুড় বাদুড় চালতা বাদুড় বাদুড় দেখ’ সে ট্রামগাড়িতে ঝুলছে বাদুড় রাত্রিদিবসে। বাসগাড়িতে ঝুলছে বাদুড় টিকিট না কেটে রেলগাড়িতে ঝুলছে বাদুড় প্রাণটি পকেটে।’

বাদুড় সব ব্যাপারেই ব্যতিক্রমী। এটাই পৃথিবীর একমাত্র উড্ডয়ন ক্ষমতাবিশিষ্ট স্তন্যপায়ী প্রাণী। পৃথিবীতে প্রায় এক হাজার ১০০ প্রজাতির বাদুড় রয়েছে। এদের প্রজাতি সংখ্যা স্তন্যপায়ী প্রাণীর মোট প্রজাতি সংখ্যার শতকরা ২০ ভাগ। এরা নিশাচর প্রাণী। দিনের বেলায় সাধারণত অন্ধকার স্থানে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে।
প্রাণীবিজ্ঞানীদের তথ্য মতে, প্রায় ৭০ ভাগ প্রজাতির বাদুড় পতঙ্গভুক, বাকিরা খায় ফলমূল।

এদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত ক্ষীণ। শ্রবণশক্তির ওপর নির্ভর করে চলাফেরা করতে হয়। বিশেষত বাদুড়ের কান শব্দোত্তর তরঙ্গের শব্দ শুনতে পায়। আর ওড়ার সময় বাদুড় মুখ দিয়ে ক্রমাগত শব্দোত্তর তরঙ্গের শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলে বাদুড় সেই প্রতিধ্বনি থেকেই আশপাশের সম্ভাব্য বাধাবিঘ্ন সম্পর্কে ধারণা পেয়ে তা এড়িয়ে চলতে পারে।

গাছের ডালে ঝুলতে হলে মানুষকে বেশ শক্তি ব্যয় করে ডাল ধরতে হয়। এই কাজে শুধু কবজির পেশিই নয়, কাঁধ ও বাহুর সব পেশি ফুলে ওঠে। তাই মানুষের পক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় ঘুমানো সম্ভব নয়। কিন্তু বাদুড়ের বেলায় ঠিক উল্টো ব্যাপার ঘটে। ঘুমানোর মতো জুতসই গাছের ডাল পেলেই থাবা ছড়িয়ে নখগুলো দিয়ে ডাল আঁকড়ে ধরে ঝুলে পড়ে। এ সময় এরা পায়ের পেশি সঙ্কুচিত করে না, শিথিল করে দেয়। শরীরের ওপরের অংশের ওজন তার নখগুলোকে দৃঢ়ভাবে গাছের ডালে আটকে থাকতে সাহায্য করে। তখন ঝুলে থাকার জন্য তার আর বাড়তি শক্তি ব্যয় করতে হয় না। আঁকড়ে ধরা নখ সহজে খোলে না। উল্টো হয়ে ঝুলে শরীরের ভার ছেড়ে দিতে পারে বলেই বাদুড় ওই ভঙ্গিতে ঘুমাতে পারে।

প্রাণিজগতের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি বাদুড়। এরা ঠিক জš§ান্ধ নয়। একদল পরীক্ষক পরীক্ষা করে দেখতে পান, অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশেও বাদুড় সূক্ষ্মভাবে চলাফেরা করতে পারে, সমস্যা হয় না।

শুধু রাতের আঁধারে শিকার ধরাই নয়, অন্য বাদুড়ের কণ্ঠও ঠিক চিনে নিতে পারে বাদুড়। ‘পালস কম্পিউটেশন বায়োলজি’ নামে বিজ্ঞানবিষয়ক এক জার্নালে সম্প্রতি এ গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, পাখাওয়ালা স্তন্যপায়ী এই প্রাণীটি তার ‘সহকর্মীদের’ আলট্রাসনিক ইকলোকেশন কলের পার্থক্য ধরতে পারে। এছাড়া বাদুড়দের ইন্টারনাল রেফারেন্স কলও রয়েছে। ইসরায়েলের ওয়েজম্যান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের একদল গবেষক এই গবেষণা চালান। তারা প্রমাণ পান, বাদুড় প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ভিন্ন শব্দের পার্থক্য শনাক্ত করতে পারে। গবেষকরা আশা করছেন, তাদের এই গবেষণায় বেরিয়ে আসতে পারে বাদুড় অন্ধকারময় জায়গায় দল বেঁধে থাকার পরও অথবা অন্ধকারে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা না খেয়েই অনেক উঁচুতে ওড়ার রহস্য।

অবশ্য আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, নানা কারণে বহু প্রাণী এখন বিপন্নের কাতারে চলে গেছে। বাদুড়ও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে কমে আসছে বাদুড়ের সংখ্যা। বাদুড় সুরক্ষায় সচেতনতা গড়ে তুলতে ইউরোপে ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে একাধিক বাদুড় সম্মেলন। ২০১০ সালে প্রাগে অনুষ্ঠিত একটি ব্যাট কনফারেন্স বলা হয়, বাদুড়ের বংশবৃদ্ধির জন্য হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং বাদুড়ের শরীরে দেখা দেওয়া রহস্যজনক নতুন ধরনের এক ফাঙ্গাশ। এর নাম হোয়াইট-নোজ সিনড্রোম। ফাঙ্গাশটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

সঙ্গত কারণে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ বেড়েছে। কারণ বাদুড় প্রচুর পোকামাকড় সাবাড় করে। তাদের হিসাব মতে, বাদুড় প্রজাতি যদি প্রতি রাতে লাখ লাখ পোকামাকড় না খায় তাহলে আমাদেরকে পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে বাড়ি এবং মাঠেঘাটে রাসায়নিক দ্রব্য ছিটাতে হবে। এতে পরিবেশ হবে আরো দূষিত। তারা বলেছেন, বাদুড়ের সংখ্যা অনেক কমে গেলে তা মানবজাতির জন্য সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। তারা বলছেন, প্রকৃতি সংরক্ষণে বাদুড় মূল্যবান ভূমিকা রাখে।

‘নেচার’ সাময়িকীর তথ্যে জানা যায়, একটি বাদুড় ঘণ্টায় ছয়শ মশা সাবাড় করতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের অনেক নগর পিতা যেখানে মশা দমন করতে ব্যর্থ, সেখানে একটা বাদুড় একাই একশ’। মশাসহ পোকামাকড় এরা ফাস্টফুড হিসাবে খায়। এছাড়া বাদুড় ফুলের পরাগায়নেও সহায়তা করে।

প্যাঁচার মতো বাদুড় দিনের চেয়ে রাতের অন্ধকারে ভালো দেখতে পায়। এদের চোখের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে এরা রাতের অন্ধকারে ভালো দেখে। মানুষের চোখে লেন্স থেকে রেটিনার যে দূরত্ব বাদুড়ের চোখে সে দূরত্ব অনেকগুণ বেশি। তাই তাদের চোখের রেটিনার ওপর ছবি অনেক বড় হয়ে প্রতিফলিত হয়। আবার মানুষের চোখে পেকটন অনুপস্থিত হলেও এদের চোখে তা বর্তমান। এটির কাজ হলো খুব দ্রুত লেন্সের ফোকাস ঠিক করে ফেলা। আর বাদুড়ের চোখে রেটিনা বিশেষ ধরনের প্রচুর সংখ্যক কোষ দিয়ে তৈরি। এসব কোষ ‘কোন’ ও ‘রড’ নামে পরিচিত। বাদুড়ের চোখে এ কোষের সংখ্যা প্রতি বর্গমিলিমিটারে দশ হাজারের কাছাকাছি, যা মানুষের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ বেশি। তাই বাদুড়ের চোখে খুব সামান্য আলো বিকীর্ণ হয়ে এদের চোখের রেটিনার ওপর প্রতিফলিত হয়। আবার বাদুড়ের চোখে প্রোটিন জাতীয় এক ধরনের লাল রঙের রাসায়নিক উপাদান চোখকে আলোর প্রতি বেশিমাত্রায় সংবেদনশীল বানাতে সাহায্য করে।
পৃথিবীতে বাদুড়ের আগমন ঘটেছিল প্রাচীনকালেই। ধারণা করা হয়, ডাইনোসর যুগেও এই পৃথিবীতে তারা ছিল।

রক্তচোষা বাদুড় নিয়ে অনেক কল্পকাহিনি রয়েছে। এসব কল্পকাহিনিতে রক্তচোষা বাদুড়কে যতটা ভয়ানক হিসেবে চিত্রিত করা হয়, বাস্তবে এসব বাদুড় ততটা ভয়ানক ও বিপজ্জনক নয়। তিন প্রজাতির রক্তচোষা বাদুড় রয়েছে। এরা বাস করে মধ্য আমেরিকার দুর্গম জঙ্গল বা জনমানবশূন্য এলাকায়। এরা পশুর রক্ত খেয়ে বাঁচে। ভীষণ খাদ্যাভাবে না পড়লে এরা মানুষকে কামড়ায় না।

নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে, এই প্রজাতির বাদুড়ের শরীরে থাকা এক প্রকার অনুভূতিক্ষম ইন্দ্রিয়ের (ইনফ্রারেড সেন্সর) মাধ্যমে এরা বুঝতে পারে প্রাণীর কোথায় কামড় বসালে ভালোমানের অধিক রক্ত পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের বরাত দিয়ে নেচার সাময়িকীতে সম্প্রতি এ তথ্য ছাপা হয়েছে।

গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন, রক্তচোষা বাদুড়ের নাকের ডগায় তাপনির্ণায়ক অণু রয়েছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম টিআরপিভি-১ বা ইনফ্রারেড সেন্সর। এর সাহায্যে এই বাদুড় বুঝতে পারে, তার শিকারের দেহের কোন অংশে দাঁত বসালে অল্প সময়ে ভালোমানের বেশি রক্ত পাবে। সাধারণত এরা ঘুমন্ত গরু-মহিষ ও ছাগলের শরীরে দাঁত বসিয়ে ২০ মিনিটে অন্তত ২০ গ্রাম রক্ত শুষে নেয়। অবশ্য বাদুড় ছাড়াও মানুষ ও অন্য পশুর শরীরেও টিআরপিভি-১ রয়েছে। এটার সাহায্যে প্রাণীরা অতিরিক্ত তাপমাত্রা বুঝতে পারে।

এই স্তন্যপায়ী প্রাণীটি প্রথম ব্যবহৃত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট যুদ্ধকাজে এ প্রাণীটি ব্যবহারের কথা প্রথম চিন্তা করেন। জাপানে বোমা ফেলতে ব্যবহার করেন প্রশিক্ষিত ছয় হাজার বাদুড়। সফলতাও পান হাতেনাতে। পরবর্তীকালে বাদুড়ের অনুকরণে মার্কিন বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন একটি উড়োযান, যেটি ছিল গোয়েন্দাগিরিতেও পটু।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ টোঙ্গায় বাদুড় অতি পবিত্র জীব। এটাকে ভাবা হয় আত্মার একটি বিশেষ রূপ। তবে বিশ্ব সংস্কৃতিতে বাদুড়ের প্রতি নেতিবাচক মনোভাবই বেশি। বিশ্বের অনেক দেশেই এই নিশাচর প্রাণীটি ভূত, মৃত্যু, রোগ আর অশুভ ইঙ্গিতের প্রতীক। তবে চীনারা এটাকে দীর্ঘজীবন ও সুখের প্রতীক ভাবে।
আকারগত দিক থেকে স্তন্যপায়ীদের মাঝে বাদুড়ের হায়াত বেশ লম্বা। কোনো কোনো বাদুড় ৪০ বছর বাঁচে। এরা সামাজিক জীব।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)