সুবর্ণভূমি ডেস্ক
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন জুমাবার হলো উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সাপ্তাহিক ঈদ ও অফুরন্ত রহমতের বারতা নিয়ে আসা একটি পবিত্র দিন। ইসলামি শরিয়তে এ দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদা অত্যন্ত সুউচ্চ। পবিত্র কুরআনে ‘আল-জুমা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সুরাও নাজিল করা হয়েছে। এই বরকতময় দিনে মুমিনদের জন্য রয়েছে বেশ কিছু বিশেষ আমল, যার মধ্যে অন্যতম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আমাদের নবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা। নিচে বিভিন্ন হাদিসের আলোকে জুমার দিনে দরুদ পাঠের অসামান্য ফজিলত তুলে ধরা হলো।
১. দরুদ পেশ করা হয় নবীজির (সা.) দরবারে
জুমার দিনে উম্মতের পাঠানো দরুদ সরাসরি মহানবী (স.)-এর দরবারে পেশ করা হয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন—
أَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنَ الصَّلَاةِ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَلَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ كُنْتُ لَهُ شَفِيعًا أَوْ شَهِيدًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘তোমরা জুমার দিন এবং জুমার রাতে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ কর। যে ব্যক্তি এরূপ করবে, কেয়ামতের দিন আমি তার জন্য সুপারিশকারী কিংবা সাক্ষ্যদাতা হব।’ (আবু দাউদ ১০৪৭)
২. আল্লাহর রহমত ও ফেরেশতাদের ইস্তেগফারের সুসংবাদ
হাদিসে কুদসিতে জুমার দিনে দরুদ পাঠের প্রতিদান হিসেবে বান্দার জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত ও ফেরেশতাদের ক্ষমার ঘোষণা। হাদিসে পাকে এসেছে—
أَكْثِرُوا الصَّلَاةَ عَلَيَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَإِنَّ جِبْرِيلَ أَتَانِي آنِفًا عَنْ رَبِّ العِزَّةِ جَلَّ جَلَالُهُ يَقُولُ: مَا مِنْ عَبْدٍ يُصَلِّي عَلَيْكَ صَلَاةً إِلَّا صَلَّيْتُ عَلَيْهِ عَشْرًا وَصَلَّى عَلَيْهِ كُلُّ مَلَكٍ عَشْرًا
‘তোমরা জুমার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পড়। কারণ, এইমাত্র জিবরিল (আ.) পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত রব আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণী নিয়ে আমার কাছে এলেন এবং বললেন— পৃথিবীতে যখন কোনো মুসলমান আপনার ওপর একবার দরুদ পড়ে, আমি তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করি এবং আমার সব ফেরেশতা তার জন্য দশবার ইস্তেগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৯৯)
৩. আসরের পর বিশেষ দরুদের আমল ও বিশাল সওয়াব
জুমার দিন আসরের নামাজের পর নির্দিষ্ট একটি দরুদ পাঠ করার বিষয়ে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন—
صَلَّى عَلَيَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ بَعْدَ الْعَصْرِ ثَمَانِينَ مَرَّةً غُفِرَتْ لَهُ ذُنُوبُ ثَمَانِينَ عَامًا وَكُتِبَتْ لَهُ عِبَادَةُ ثَمَانِينَ سَنَةً
‘যে ব্যক্তি জুমার দিন আসরের নামাজের পর সেই স্থানে বসা অবস্থায় ৮০ বার নিম্নে উল্লেখিত দরুদ শরিফ পাঠ করবে, তার ৮০ বছরের গুনাহ মাফ এবং ৮০ বছরের নফল ইবাদতের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে।’ (আফদালুস সালাওয়াত, পৃষ্ঠা ২৬)
দরুদ শরিফটি হলো—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ وَعَلَى آلِهِ وَسَلِّمْ تَسْلِيمًا
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাল্লিম তাসলিমা।’
৪. কিয়ামতের দিন নূরময় চেহারা
নবীজির (সা.) ওপর নিয়মিত ও জুমার দিনে বিশেষ দরুদ পাঠের মাধ্যমে কিয়ামতের দিন মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। হাদিসে পাকে হজরত আলি (রা.) বর্ণনা করেন—
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ مِائَةَ مَرَّةٍ، جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَعَهُ نُورٌ لَوْ قُسِمَ بَيْنَ الْخَلْقِ كُلِّهِمْ لَوَسِعَهُمْ
‘যে ব্যক্তি নবীজি (স.)-এর ওপর জুমার দিন ১০০ বার দরুদ পাঠ করে, সে কেয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার চেহারার নূরের জ্যোতি দেখে লোকেরা বলাবলি করতে থাকবে, ‘এই ব্যক্তি কী আমল করেছিল!’ (কানজুল উম্মাল ১৭৪)
৫. কিয়ামতের দিন নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়া
নবীজির (সা.) নৈকট্য লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম হলো তার ওপর বেশি বেশি দরুদ পেশ করা। হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
أَكْثِرُوا الصَّلَاةَ عَلَيَّ يَوْمَ الْجُمُعَةِ، فَإِنَّ صَلَاةَ أُمَّتِي تُعْرَضُ عَلَيَّ فِي كُلِّ يَوْمِ جُمُعَةٍ، فَمَنْ كَانَ أَكْثَرَهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً كَانَ أَقْرَبَهُمْ مِنِّي مَنْزِلَةً
‘আমার ওপর জুমার দিন বেশি বেশি দরুদ পাঠ কর। কারণ আমার উম্মতের দরুদ জুমার দিন আমার কাছে পৌঁছানো হয়। যে ব্যক্তি আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠাবে, সে ব্যক্তি কেয়ামতের দিন সবচেয়ে আমার নিকটবর্তী হবে।’ (আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব ১৫৭)
কুরআনে দরুদের নির্দেশ
শুধু হাদিসেই নয়, স্বয়ং মহান আল্লাহ তাআলা ও তার ফেরেশতারাও নবীজির (সা.) ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন এই আমলটি করতে—
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
‘নিশ্চয় আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠাও এবং তাকে যথারীতি সালাম জানাও।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৬)
পরিশেষে বলা যায়, আল্লাহর অসীম রহমত, ক্ষমা এবং নবীজি (সা.)-এর সুমহান সুপারিশ ও নৈকট্য লাভে জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠের কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের উচিত ব্যস্ততার ফাঁকে এই বরকতময় দিনে অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে ধন্য করা। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: ইসলামিক স্কলার ও মুফাচ্ছিরে কুরআন, পীরসাহেব, শাজুলিয়া দরবার শরিফ