ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতাকে ঘিরে এলাংখালী ঘাটে বসেছিল গ্রামীণ মেলা
মাগুরা ও মহম্মদপুর প্রতিনিধি
মধুমতী নদীর বুকে বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের ভাটিয়ালি গান আর দুই তীরে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস। কোথাও শিশুদের হাতে রঙিন বেলুন, কোথাও জিলাপি-পিঠার ঘ্রাণ। নদীজুড়ে নৌকা বাইচ আর তীরজুড়ে গ্রামীণ মেলা-সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজে মুখর হয়ে উঠেছিল মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী এলাংখালী ঘাট এলাকা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে মধুমতী নদীতে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা।
এতে বিভিন্ন এলাকা থেকে সুসজ্জিত ও বর্ণিল নৌকা নিয়ে অংশ নেন মাঝিরা। প্রতিযোগিতা শুরুর পর থেকেই নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে দর্শনার্থীদের ভিড়।
বৈঠার ছন্দে নৌকার এগিয়ে চলা, বাদ্যের শব্দ আর মাঝিদের সমবেত ভাটিয়ালি গানে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে নদীর পরিবেশ।
তীরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকেরা হাততালি ও উল্লাসে প্রতিযোগীদের উৎসাহিত করেন।
নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে মধুমতী নদীর দুই তীরে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মেলায় ছিল শত শত অস্থায়ী দোকান। খাবারের দোকানে পাওয়া যায় গরম জিলাপি, বাতাসা, কদমা, বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ ও পিঠাপুলি। পাশাপাশি ছিল বাঁশ ও বেতের তৈরি কুটিরশিল্প, কাঠের খেলনা, মাটির তৈরি শৌখিন সামগ্রী, মাটির ও অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার তৈজসপত্র।
শিশুদের আকর্ষণ ছিল রঙিন বেলুন। নারীদের প্রসাধনসামগ্রী, কাচের চুড়ি ও রিবনের দোকানেও ছিল ক্রেতাদের ভিড়।
নদীর বুকে নৌকা বাইচ আর তীরে মেলার এই আয়োজন পরিণত হয় নানা বয়সী মানুষের মিলনমেলায়। গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে বিনোদনের এমন সমন্বয়ে উৎসবস্থলজুড়ে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।
প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায়চৌধুরী।
বিশেষ অতিথি ছিলেন মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক আলী আহম্মেদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, মহম্মদপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাদমান আকিব, মহম্মদপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মৈমুর আলী মৃধা, কাজী সালিমা হক মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এসএম ইউনুস আলী সরদার, মাগুরা জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক সাইদুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শফিক, মহম্মদপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি আজিজুর রহমান টুটুল এবং বোয়ালমারী প্রেসক্লাবের সভাপতি কোরবান আলী।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মেলাকে কেন্দ্র করে বেচাকেনা বেড়েছে। দূরদূরান্ত থেকে মানুষের আগমনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও বিক্রেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন। একই সঙ্গে এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।
আয়োজকরা জানান, এ ধরনের আয়োজন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং গ্রামীণ সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন। ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ ও গ্রামীণ মেলার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তারা সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এ আয়োজন এলাকার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করবে। সরকার দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী কৃষ্টিকে পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলো আরও বেশি আয়োজনের মধ্য দিয়ে দেশের সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা সম্ভব হবে।
দিনব্যাপী এ আয়োজন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন আয়োজক ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা।