মো. মিজানুর রহমান
বর্তমানে আমাদের প্রতি গ্রামেই কমপক্ষে একটি মসজিদ আছে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতি পাড়ায় মসজিদ আছে। এই ধরুন মোল্লাপাড়া, কাজীপাড়া, মোড়লপাড়া, এমনকি সাহাপাড়ায়ও একটি মসজিদ আছে। জনসংখ্যা ও দূরত্ব বিচারে এর প্রয়োজনীয়তাও আছে। অধিক মসজিদ থাকায় আমাদের ঢাকাকে মসজিদের নগরী বলা হয়। আমরা যারা মুসলিম তারা বাড়ি করার জন্য জমি কিনতে চাইলে আগে দেখি জমি থেকে মসজিদের দূরত্ব কতোটা। অর্থাৎ মসজিদঘেঁষা জমি হলেই ভালো হয়। পাঁচ ওয়াক্ত আজান শুনতে পাবো। দ্রুত এবং অল্প শ্রমে মসজিদে যেতে পারবো।
আমাদের প্রতিটি মসজিদের তিনটি পদ আছে- ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং খাদেম। এলাকাভিত্তিক একজন নামাজি মানুষ মূলত খাদেম হিসেবে কাজ করে থাকেন। ইমাম এবং মুয়াজ্জিন নিয়োগ দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি পাড়ায় অবস্থিত মসজিদে দুইজন মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির চাকরির সুযোগ হয়। মসজিদ কমিটি যখন এই ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দেয় তখন সর্বোচ্চ গুণসম্পন্ন ছাত্রদেরকেই নির্বাচিত করে। কাজেই মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ছাড়াও মাদরাসায় শিক্ষিতদের একটি বিরাট অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। যাদের একটি বড় অংশই আবার মাদরাসায় শিক্ষকতা করে থাকেন।
আচ্ছা আমাদের দেশে মাদরাসার সংখ্যা কত? বর্তমানে আমাদের দেশে মাদরাসার সংখ্যা মসজিদের থেকেও বেশি। করোনা পরবর্তীতে দেখা যাচ্ছে যে, মাদরাসা এখন পাড়ায় পাড়ায় নয় বরং একটি পাড়ার একাধিক গলিতে মাদরাসা গড়ে উঠেছে। এই মাদরাসারগুলোর (আলিয়া মাদরাসা ব্যতীত) অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করেন একজন বড় হুজুর। অর্থাৎ একক সিদ্ধান্তেই গড়ে উঠছে এসব মাদরাসা। তার মাধ্যমেই অন্যান্য শিক্ষক মাদরাসায় নিয়োজিত হয়। তার নির্দেশনা মোতাবেকই শিক্ষকেরা ছাত্র সংগ্রহ করেন এবং তাদেরকে পড়িয়ে থাকেন। এই মাদরাসারগুলোর অন্য একটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত (এতিম/অসহায়/বাবা-মা হতে বিচ্ছিন্ন) বাচ্চারা এখানে অল্প খরচে অথবা বিনা খরচে আবাসিক সুবিধা পেয়ে থাকে। এইরকম সুবিধাবঞ্চিত ছাত্ররাই আবার বিশেষ সুবিধা নিয়ে পড়াশুনা শেষে বিভিন্ন মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন, যদি মাদরাসা শিক্ষাই তার শেষ শিক্ষা হয়। কাজেই এই শিক্ষকদের একটি বড় অংশেরই পরিবারের প্রতি স্বাভাবিক টান থাকে না। বাচ্চাদের প্রতি মমত্ববোধ যতটা থাকা দরকার, ততটা থাকে না। যেহেতু বাল্যকালে তাদের অনেকেই যেহেতু নিষ্ঠুর পরিবেশের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে, সেহেতু ওই নিষ্ঠুর জীবনই তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। ফলাফল হিসেবে তারা ছাত্রদের প্রতি প্রথম থেকেই কঠোর নীতিতে চলতে থাকে। তবে হ্যাঁ, সকল শিক্ষকই এমন- সেটা বলা যাবে না।
এবার ছাত্রদের পিতা-মাতার বিষয়ে কিছু জানতে চেষ্টা করি।
১. যখন মাদরাসায় কোনো স্বাভাবিক পরিবারের সন্তান পড়তে যায় তখনই ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। ৬-৭ বছরের আদরের সন্তানকে (যে এখনও নিজের খাবার গুছিয়ে খেতে পারে না) মাদরাসায় রেখে এসে মা-বাবা নিজেকে সান্ত্বনা দেন যে তিনি আল্লাহর নেয়ামত লাভের আশায় একটি ভালো নিয়তকে বাস্তবায়ন করছেন। তবে মন পড়ে থাকে বাচ্চার কাছে। অনেক ছাত্র যখন নালিশ করার জায়গা পায় না, এই সন্তানের পিতামাতা সেখানে নজর ফেলে রাখে মাদরাসায়।
২. আমাদের মধ্যে অনেকেই মানত করে ফেলেন প্রথম ছেলে সন্তান হলে তাকে মাদরাসায় পড়াবেন। হাফেজ বানাবেন। সন্তনের আগ্রহ-অনাগ্রহের ব্যাপারটা এখানে কোনো বিষয় না।
৩) কিছু ছেলে সন্তান অত্যন্ত দুরন্ত হয়ে থাকে। তাদের বাবা-মা এই বাচ্চাকে শান্ত করার লক্ষ্যেও মাদরাসায় দেয়। যাতে করে শৃঙ্খলাবোধ জন্মায়। অর্থাৎ তাদেরকে শাসনে রাখতেই মাদরাসায় দেওয়া হয়। এতে ঘটে দুটি ঘটনা-
ক. ওই অশান্ত ছেলেকে দেখে মাদরাসার শান্ত ছেলেটাও প্রভাবিত হয়;
খ. শিক্ষক যখন শাসনের অনুমতি পেয়েই গেলেন, তখন শাসিয়ে রাখাটা শিক্ষকের স্বভাবে পরিণত হয়।
কাজেই শুধু শিক্ষকের নিষ্ঠুরতায় সন্তানেরা এইরূপ নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকার হয় না। বরং পিতা-মাতাও এটার জন্য অনেকাংশে দায়ী থাকেন। তারা তাদের ৬-৭ বছরের বাচ্চাকে শিক্ষকের হাতে ছেড়ে দিয়ে আশা করে যে, একেবারে বড় হয়ে বাড়ি ফিরবে। মাদরাসাকে অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভাবতে হবে। কুরআনের হাফেজ আমাদের দরকার আছে। ঘরে ঘরে কুরআনের হাফেজ গড়ে উঠুক তা আমিও চাই। তাই বলে ৬-৭ বছরের বাচ্চাদের প্রতি জুলুম করে নয়। এই জুলুমের শুরুটা হয় প্রতিটা বাচ্চার ঘর থেকে। মা-বাবাই চান নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে (১০-১২ বছর) হাফেজ বানিয়ে সন্তানকে আবার সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। কাজেই জোরাজুরি পরিবার থেকেই শুরু। আর যাদের পরিবার নেই তাদের নিয়ে এতোটা আলাপ তৈরি হয় না। কাজেই শুধু শিক্ষকদেরকে দোষারোপ করে লাভ নেই। নিজের সন্তানের প্রতি আমরা নিজেরাই নিষ্ঠুর। অন্যে করলে সেটা আমাদের গায়ে লাগে। আমাদের চোখে লাগে।
মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় যে পরিবর্তন প্রয়োজন
১. মাদরাসা গড়ে তোলার যথাযথ নিয়ম থাকা চাই। সরকার একটি নীতিমালা করে মাদরাসাকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। আলিয়া মাদরাসাগুলো যেমন বড় পরিবেশ নিয়ে গড়ে ওঠে এই হাফেজিয়া-কওমি মাদরাসাগুলোকেও তাই করতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে দেখা যায় একটি ফ্লোর বা একটি ফ্লাট নিয়ে মাদরাসা গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে বাচ্চাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগটা নষ্ট হয়।
২. অভিজ্ঞ শিক্ষক থাকতে হবে। শিক্ষকের বয়সের নিম্নসীমা স্থির করে দিতে হবে। ২৫ বছর বয়স না হলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
৩. এতিমখানা ব্যতীত যতটা সম্ভব মাদরাসা থেকে আবাসিক ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে।
অভিভাবকের চিন্তাধারায় যে পরিবর্তন আনতে হবে
১. শিক্ষকদের হাতে ছাত্র শাসনের অধিকারটুকু থাকবে, এটা মেনে নিতে হবে। বাচ্চার গায়ে দুটি চড় পড়লো আর ওমনি আমরা পায়ে চপ্পল চাপিয়ে শিক্ষকের শ্রাদ্ধ করতে গেলাম- সেটাও নৈতিকতাবিরুদ্ধ। শাসন ছাড়া শিক্ষা হয় না।
২. বাচ্চার নিয়মিত খোঁজ রাখতে হবে।
৩. শিক্ষকদের সাথেও যোগাযোগ রাখতে হবে।
৪. যদি সামর্থ থাকে আবাসিকে না রেখেই বাচ্চাকে পড়াতে চেষ্টা করতে হবে।
শিক্ষকের শাসনের মাত্রা
১. বাচ্চার দুষ্টুমি নিয়ন্ত্রণে না রাখতে পারলে অবিভাবকদের জানাতে হবে।
২. শিক্ষকের কাজ পথ দেখিয়ে দেওয়া। পড়া গিলিয়ে দিতে গেলে তা বমি হয়ে আসবে। যার খেসারত শিক্ষককেই দিতে হবে।
পরিশেষে আমাদের চাওয়া- শিক্ষক, ছাত্র এবং অবিভাবকের স্বাভাবিক চিন্তাধারায় কুরআনের হাফেজ গড়ে উঠুক, দেশে মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতি বেড়ে উঠুক সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও কবি