যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ফ্যাসিস্ট বিতাড়নের দিন আজ

সুবর্ণভূমি ডেস্ক

প্রকাশ : বুধবার, ৫ আগস্ট,২০২৬, ১২:০১ এ এম
ফ্যাসিস্ট বিতাড়নের দিন আজ

আজকের এইদিনে (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও তীব্র প্রতিরোধের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।

এর মাধ্যমে প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশ এক ভয়ঙ্কর ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্তি পায়।

তার পালিয়ে যাওয়ার এবং দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার আজ দ্বিতীয় বার্ষিকী।

গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা তার নিজের দীর্ঘ শাসনামলে বহুবার অহংকার করে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা পালায় না’।

এমনকি ২০২৪ সালের ২২ জুলাই গণআন্দোলন চলাকালেও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চলা এক বৈঠকেও এ কথা পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই বক্তব্যের দুই সপ্তাহের মধ্যেই জনগণের তীব্র প্রতিরোধ, প্রচণ্ড ঘৃণা ও গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।

এ বিজয় অর্জনে হাজারো শহীদ, ২৩ হাজারেরও বেশি আহত, সাত শতাধিক মানুষ দৃষ্টিহারা, হাজারো মানুষের পঙ্গুত্ববরণ, হাজারো সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শিক্ষার্থীর কারাবরণ, নির্যাতন-নিপীড়নের অবর্ণনীয় ত্যাগ রয়েছে এ অর্জনে। রয়েছে প্রিয়জন, স্বজন এবং সন্তান হারানোর করুণ আর্তনাদ।

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের ৬টি মামলায় রায় ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আলোচিত ৬টি রায়ে ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড ও ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি এসব মামলার অপর আসামিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

যেভাবে হাসিনার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে

৫ আগস্টের কারফিউ উপেক্ষা করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকার অভিমুখে পদযাত্রা করেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার পদত্যাগের খবর নিশ্চিত করার পর জনতার উল্লাসে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। শেখ হাসিনার ক্ষমতার আধিপত্য এবং আওয়ামী লীগের কথিত রাজনৈতিক দুর্গ যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।

রাজধানীর রাজপথ দখলে নেয় লাখ লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতা শেখ হাসিনার তৎকালীন বাসভবন গণভবনে প্রবেশ করে বিজয় উদ্যাপন করা শুরু করে।

শুধু গণভবন নয়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার পর অসংখ্য মানুষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদেও প্রবেশ করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু, বৃদ্ধ, শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থী সবাই রাজপথে নেমে দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন উদ্যাপন করে।

শেখ হাসিনা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। ৫ আগস্ট রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। দুপুরের দিকে হাজার হাজার মানুষ শাহবাগে জড়ো হতে থাকেন। শেখ হাসিনা হঠাৎ দেশত্যাগ করার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজধানীসহ সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এতে অনেক মানুষ নিহত ও আহত হন।

২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকেই শেখ হাসিনা তার এই ‘নিরঙ্কুশ ক্ষমতা’ ধরে রাখতে চেয়েছেন। এ লক্ষ্যে তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণসহ শাসনব্যবস্থায় নানা অনিয়ম ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি সমালোচনাকেও সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে তার অধীনে একের পর এক বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচন করে ক্ষমতা ধরে রাখেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বর্জনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ১৫৩ জন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন, যা ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় সৃষ্টি করে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোটের পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটও অংশ নিয়েছিল। শেখ হাসিনা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও নির্বাচনের আগের দিন রাতেই সারা দেশের সব ব্যালট বাক্স ভর্তি করে নির্বাচন শেষ করা হয়।

ওই নির্বাচনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের কর্মীরা মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে। ইতিহাসে ওই নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপিকে মাত্র ৬টি আসনে বিজয়ী দেখানো হয়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ওই নির্বাচন আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের কর্মী এবং কতিপয় দোসরদের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপির সব শীর্ষ নেতৃত্বসহ জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং হাজার হাজার রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে কারাবন্দি করে রাখা হয়।

হাসিনা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অসংখ্য গুম, খুন ও ভয়াবহ কারা নির্যাতনের অসংখ্য নজির স্থাপন করেছেন। আয়নাঘরে আটক রেখে অবর্ণনীয় নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ হলে মানুষ আতঙ্কে শিহরিত হয়ে ওঠে। বর্বর এসব ঘটনা পৃথিবীর সব নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়। গুমের শিকার শত শত মানুষের সন্ধান এখনো মেলেনি।

চব্বিশের দুনিয়া কাঁপানো ৩৬ জুলাইয়ের (১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট) আন্দোলনেও একই ঘটনা ঘটায় হাসিনা সরকার। বিএনপি-জামায়াতসহ গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দলসমূহের অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃত্বকেই কারারুদ্ধ করে রাখা হয়।

চব্বিশের জুলাইয়ের টানা আন্দোলন আগস্টের ৫ আগস্ট সফলতা পায়, এটিই ৩৬ জুলাই আন্দোলন হিসেবে জনগণের কাছ থেকে স্বীকৃতি পায়।

সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের প্রতি হাসিনার উদাসীনতা এবং দমনমূলক আচরণই শেষ পর্যন্ত এ আন্দোলনকে সফল গণঅভ্যুত্থানে রূপ দেয়।

দেশের মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি, ১ জুলাই শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন একপর্যায়ে ছাত্র-জনতার সম্মিলিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এ রূপ নেবে।

শিক্ষার্থীরা শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করেই রাজপথে নামেন। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলনের মুখে সরকার এক প্রজ্ঞাপনে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে দেয়। ২০২৪ সালের জুনে হাইকোর্ট সেই প্রজ্ঞাপনকে অবৈধ ঘোষণা করে কোটা পুনর্বহালের রায় দেন।

হাইকোর্টের রায়ে ফের ৫৬ শতাংশ কোটা প্রথা পুনর্বহাল হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বঞ্চনার প্রতীক হিসেবে এই কোটা পুনর্বহালকে তারা প্রত্যাখ্যান করে এবং তীব্র ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে।

সরকার শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থক ক্যাডারদের মাঠে নামিয়ে দেয়, যার ফলে এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর আওয়ামী ক্যাডার বাহিনীর হামলার চিত্র মনে হলে এখনো গা শিউরে ওঠে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষ আহত হন। যার ফলে দেশ রক্তাক্ত এক প্রান্তরে পরিণত হয়।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা শাহবাগে আসতে শুরু করেন। তারা যখন কারফিউ ও পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে রাজধানীতে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তখনই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে হতাহতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা মূলত ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু ৩ ও ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের ‘রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের’ নামে চালানো হামলায় যথাক্রমে অন্তত ৯৩ ও ৬৬ জন নিহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচির সময় এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করেন।

আন্দোলন যখন সহিংস হয়ে ওঠে, সমন্বয়করা সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার তা না করে আন্দোলন দমনে কৌশল অবলম্বন করে। একপর্যায়ে ৯ দফা ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ছাত্র সমন্বয়করা।

এরপর চব্বিশের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক জনসভায় শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তুলে এক দফা ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণার পর আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও বেড়ে যায়। এরপর আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। দিনটিকে তারা ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাদের মতে, শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস শেষ হবে না।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন ৫ আগস্ট। ভোরে আলো ফুটতেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও শহরতলি থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজধানীর শাহবাগ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ঢাকার বাইরে থেকেও হাজার হাজার মানুষ পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীতে আসার চেষ্টা করেন।

পরিস্থিতি তখন ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হাজার হাজার মানুষ জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। তারা যেকোনো নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পদদলিত করে গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশের মাটিতে এটাই তার শেষ মুহূর্ত। এবার বিদায় নিতে হবে।

এরপর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

সূত্র: বাসস

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)