খুলনায় ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে ডা. শফিক
খুলনা অফিস
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, সরকার আধিপত্যবাদী শক্তির সামনে মাথা নত করলে তাদেরকে ছেড়ে কথা বলা হবে না। আধিপত্যবাদ রুখতে এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি যুবসমাজসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণকে দেশের মর্যাদা রক্ষায় আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান।
শনিবার (২০ জুন) বিকেলে খুলনা সার্কিট হাউজ মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
যুব সমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছেন। এখন নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানাতে প্রয়োজন হলে আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন দাবিতে আয়োজিত এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপি সভাপতি কর্ণেল (অব.) ড. অলি আহমদ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
জামায়াত আমির বলেন, ‘পুশইন-এর নামে একটি প্রতিবেশী দেশ তাদের নাগরিকদের আমাদের দেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে আমাদের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিজিবি) যখন সীমান্তে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়, দেশের জনগণ তখন তাদের ডান হাত তথা শক্তিতে পরিণত হয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না আমাদের কোনো প্রতিবেশীর ঘুম ও শান্তি হারাম হোক। একইভাবে কোনো প্রতিবেশী আমাদের দিকে কালো হাত বাড়াবে, সেটাও আমরা বরদাশত করবো না। যদি কেউ কালো হাত বাড়ায়, সেই কালো হাত ভেঙে দেওয়া হবে।’
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তারা মানুষকে বৈষম্যহীন সমাজ, সম্পদ লুণ্ঠন না করা, হত্যার রাজনীতি বন্ধ করা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ওয়াদা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু তারা প্রতিটি ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে। রাষ্ট্রের সকল বাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে মানুষ খুন ও পঙ্গু করা হয়েছে।
তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দম্ভোক্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যারা একসময় দম্ভ করে বলতেন, ‘হাসিনা পালায় না’, শেষ পর্যন্ত তীব্র জনস্রোতের মুখে সেই হাসিনাকেই অপমানজনকভাবে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। ১৫ বছর যাদের সেবাদাসী হিসেবে কাজ করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাদের কোলেই গিয়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি বর্তমানদের সতর্ক করে বলেন, জনরায়কে সম্মান না করার পরিণতি কী হতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশে যেন কোনো বিশৃঙ্খলা বা গৃহযুদ্ধ তৈরি না হয়, সেই কারণে সব যন্ত্রণা বুকে চেপে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একে কেউ দুর্বলতা ভাবলে ভুল করবেন। জামায়াত কারো ‘বাপ-দাদার চক্রান্তকে’ পরোয়া করে না।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি কোনো ফয়সালা সংসদে না হয়, তবে যেখানে কথা বলতে ‘মাননীয় স্পিকার’ বলতে হয় না, সেই পল্টনের মাঠ, বরিশালের মাঠ, চট্টগ্রামের মাঠ, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, রংপুর, রাজশাহী কিংবা বগুড়ার মাঠ থেকে গণজাগরণ তৈরি হবে। আর সেই জাগরণী জনমতই সরকারে পরিণত হবে।
সমাবেশে সম্মানিত অতিথি ছিলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবীবুল্লাহ মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, বিভাগীয় সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোবারক হোসাইন, জামায়াতের খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক এমপি এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি।
অন্যদের মধ্যে বক্তৃতা করেন, নগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, জেলা আমির মাওলানা এমরান হোসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমির উপাধ্যক্ষ শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমির মাওলানা রেজাউল করিম, ঝিনাইদহ জেলা আমির আলী আজম মো. আবু বক্কর এমপি, যশোর জেলা আমির অধ্যাপক গোলাম রছুল এমপি, মেহেরপুর জেলা আমির মাওলানা তাজ উদ্দীন খান এমপি, চুয়াডাঙ্গা জেলা আমির অ্যাডভোকেট রুহুল আমীন এমপি, নড়াইল জেলা আমির মো. আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি, লেবার পার্টির অধ্যক্ষ মো. সাইফুদ্দোহা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি শরীফ সাইদুর রহমান, এনসিপির আহম্মদ হামীম রাহাত, এবি পার্টির মো. আবু বক্কর সিদ্দিক মোড়ল, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মো. জাকির হোসেন খান, খেলাফত মজলিসের এফ এম হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মাওলানা মো. ইব্রাহিম খলিল, জাগপার মো. সাব্বির আহমেদ, বিডিপির অ্যাডভোকেট মো. হানিফ উদ্দীন প্রমুখ।
সভাপতির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ দলীয় জোটের খুলনা বিভাগীয় সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গণভোটে জনগণ যে রায় দিয়েছে, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকার তা থেকে সরে এসেছে। গণভোটে জনগণ যে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার অনীহা দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, দলীয়করণ বন্ধ এবং বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। অথচ বর্তমানে সেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করে সরকার কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে এগোচ্ছে।
বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগ নিয়ে জনগণ ভোট দিয়েছে, তা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থে নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে।
তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, জুলাই সনদ আর গণভোটের সাথে বিএনপি অন্তহীন প্রতারণা করেছে। তারা তলে তলে ‘না’ ভোটের ক্যাম্পেইন করেছে। গণভোটে ‘না’ এর পক্ষেই তারা প্রচারণা চালিয়েছে। গণভোটে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে মত দিয়েছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সেই রায়কে উপেক্ষা করে কেবল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে তা জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের শামিল হবে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় লড়াই রয়েছে- রাষ্ট্র সংস্কারের বাস্তবায়ন, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত করা। জনগণের আকাক্সক্ষার ব্যাপারে কোনো আপস করা হবে না। সংস্কার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমরা রাজপথে যেমন ছিলাম, ভবিষ্যতেও তেমনি থাকবো।’
বিএনপির সমালোচনা করে নাসির উদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, ‘গণতন্ত্র ও সংস্কারের প্রশ্নে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি ব্যর্থ হচ্ছে। ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অপপ্রচার বন্ধ করে জনগণের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। অন্যথায় জনগণই তার জবাব দেবে।’
তিনি আরও বলেন, খুলনাসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ করা হয়েছে। কেসিসি, কেডিএ, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো তার বড় প্রমাণ। তিনি দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কোনো বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারে কান না দিয়ে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
দুপুর ২টার দিকে সমাবেশের কাজ শুরু হয়। বিভাগের দশ জেলা ছাড়াও আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে সকাল থেকেই মানুষ সমাবেশস্থলে আসতে থাকে। নির্ধারিত সময়ের আগেই সার্কিট হাউজ মাঠসহ আশেপাশের সকল সড়ক ও অলিগলি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।