বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়া জামায়াতের সেই সংসদ সদস্যকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। আলোচিত এই সংসদ সদস্য সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত গাজী নজরুল ইসলাম।
বুধবার বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক থেকে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ দলীয় তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। দল থেকে বিতাড়িত হওয়ায় এখন তার সংসদ সদস্যপদও খারিজ হয়ে যাবে।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমে এই সংক্রান্ত একটি বিবৃতি পাঠান।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২২ জুলাই (বুধবার) বিকেল চারটায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্ত হয়। তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।
গত সোমবার রাতে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুহূর্তের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব ভিডিওতে এক তরুণীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্যকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যায়।
ভিডিওটি প্রকাশের পরপর জামায়াতের অনেক নেতা-কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করতে থাকেন। তবে মঙ্গলবার দুপুরে গাজী নজরুল ইসলাম নিজের ফেসবুক আইডিতে পোস্ট দিয়ে জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম বেগম। গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে ঢাকায় মরিয়াম বেগমের বাবা মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
তবে দৈনিক আমার দেশ কাবিননামা সম্পাদনকারী কাজীর সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন তথ্য জানতে পারে। তাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তড়িঘড়ি গাজী নজরুল ঢাকা থেকে ফোন করে সাতক্ষীরার শ্যামনগরের এক কাজিকে কাবিননামা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেন। অপরাধ ঢাকতে এই তৎপরতা চালানোয় সেখানে অনেক অসঙ্গতি থেকে গেছে।
এদিকে, দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি-না তা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে অস্পষ্টতার কারণ হলো, সংবিধানের ৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে দল থেকে পদত্যাগ করেন কিংবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে। এখানে ‘দল থেকে বহিষ্কার’ শব্দটি নেই।
এর ব্যাখ্যায় কেউ কেউ মত দেন শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই কারও এমপি পদ চলে যাবে- এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিষয়টি নির্ভর করবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭০-এর ব্যাখ্যা এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর।
যদি কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয় যে, কোনো এমপি অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী আসন হারিয়েছেন কি না, তাহলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতেও স্পিকারের মাধ্যমে বিষয়টি ইসিতে পাঠানোর বিধান রয়েছে। জামায়াত দলীয় সংসদ গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের তথ্য অবিলম্বে নির্বাচন কমিশনে পাঠাচ্ছে বলে তাদের বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো সংসদ-সদস্য তার নির্বাচনের পর এ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হয়েছেন কিনা কিংবা এ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হবে কিনা, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যরিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সংবিধান ও আইন অনুযায়ী গাজী নজরুল সংসদ সদস্য পদে থাকতে পারবেন না। কারণ নৈতিক স্খলনের কারণে দল তাকে বহিষ্কার করেছে। এক্ষেত্রে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ কার্যকর হবে। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত এক্ষেত্রে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৯৬ সালের পার্লামেন্টে বিএনপির তৎকালীন সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের প্রসঙ্গ টানেন। ব্যারিস্টার খোকন বলেন, ‘ফ্লোর ক্রসিংয়ের কারণে আখতারকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিনি কোর্টে গিয়েছিলেন। তখন আমি বিএনপি পক্ষে লড়েছিলাম। ওই মামলায় আখতার হেরে গিয়েছিলেন, তথা তার সংসদ সদস্য পদ হারাতে হয়েছিল।’
গাজী নজরুল ইসলামের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর তাকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি লেখেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে আছে ‘পদত্যাগ’। তিনি (গাজী নজরুল ইসলাম) হয়েছেন ‘বহিষ্কার’। জামায়াত আজকেই নির্বাচন কমিশনকে জানিয়ে (তাকে বহিষ্কারের বিষয়ে) দিচ্ছে। কারণ ‘নৈতিকস্খলন’। প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ সদস্য থাকতে পারবেন কি না? আমার মতে না।
তবে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে পদত্যাগ করলে, দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে বা ভোটদান থেকে বিরত থাকলে, কিংবা অনুচ্ছেদে বর্ণিত অন্যান্য পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে অনুচ্ছেদ ৭০-এ দল কর্তৃক বহিষ্কারকে সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে, কেবল নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার কারণে কোনো সংসদ সদস্যের সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে এমনটি সংবিধানের ভাষা থেকে বলা যায় না। তবে বহিষ্কারের পর যদি তিনি অনুচ্ছেদ ৭০-এ বর্ণিত অন্য কোনো পরিস্থিতির মধ্যে পড়েন, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। অতএব, বিদ্যমান সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী, শুধুমাত্র বহিষ্কারই সংসদ সদস্যপদ শূন্য করার জন্য যথেষ্ট আইনগত ভিত্তি নয়। কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সদস্যপদ শূন্য হওয়ার প্রশ্ন সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী নির্ধারিত হবে এবং প্রয়োজনে তা আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
যদি কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়, কোনো এমপি অনুচ্ছেদ ৭০ অনুযায়ী আসন হারিয়েছেন কিনা, তাহলে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিষ্পত্তি করবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান বলেন, এক্ষেত্রে ইসির সিদ্ধান্তই অ্যাবসলিউট না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দল কিংবা ইসির সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও পারেন। আবার না মানলে হাইকোর্টে রিটও করতে পারেন। সেখানেও সমাধান না হলে আপিলেট ডিভিশনে যাওয়ার সুযোগ আছে।