সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে চরম ধস নেমেছে। চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ব্যাপক লোকসান আর দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।
উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর এবং অন্যান্য উপজেলাতেও চামড়ার বাজারের এই একই করুণ চিত্র দেখা গেছে। জেলার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চামড়ার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতা না থাকায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তায় ফেলে রেখে চলে গেছেন।
শহরের কাটিয়া এলাকার কোরবানিদাতা আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে কসাই দিয়ে গরুর চামড়া ছাড়ালাম। কিন্তু বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। ৫০ টাকা দিয়েও কেউ চামড়া নিতে রাজি হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেদের আঙিনায় গর্ত খুঁড়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছি। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে তার কোনো প্রতিফলন নেই।'
একইভাবে সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার খলিলুর রহমান জানান, ছাগলের চামড়া নেওয়ার লোক না থাকায় তিনি তা কেটে পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে ফেলেছেন।
তালা উপজেলার ধানদিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম জানান, ছাগলের চামড়া কেউ বিনামূল্যেও নিতে না চাওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে তা খালের পাড়ে ফেলে দিতে হয়েছে।
প্রতিবছর কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের খরচের একটি বড় অংশ চালানো হয়। কিন্তু চামড়ার বাজারে ধস নামায় চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে জেলার শত শত মাদরাসা ও এতিমখানা।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ রেজাউল করিম বলেন, সারাদিন ও সারারাত অপেক্ষা করেও কেউ চামড়া কিনতে আসেনি। পরে দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে মাদরাসা চত্বরেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।
গাবুরা চাঁদনীমুখা মাদরাসার সভাপতি মো. আবু মুছা জানান, চামড়া বিক্রি না হওয়ায় এবার এতিম বাচ্চাদের ভরণপোষণের খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হবে।
স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনতে চাইছে।
অন্যদিকে সাতক্ষীরা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যরা জানান, চলতি মৌসুমে লবণের চড়া দাম এবং পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় তারা লোকসানের আশঙ্কায় চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এছাড়া জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আড়ত ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকাকেও তারা দায়ী করেন।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা মার্কেটিং অফিসার সালেহ মো. আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমরা চামড়ার বাজার মনিটরিং করছি। সরকারনির্ধারিত মূল্যে যাতে চামড়া কেনাবেচা হয়, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে লবণের দাম ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে মাঠপর্যায়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।'
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফএম মান্নান কবীর জানান, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া অবিক্রিত থেকে নষ্ট হওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সাথে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি।