দ্বিতীয় পর্ব
মুফতি আমানুল্লাহ কাসেমী
কুরবানির মধ্যে অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। এখানে কয়েকটি শিক্ষা সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো:
১. কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হলো, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে দৃঢ়, পরিপূর্ণ ও নিখুঁত করা। কুরবানি আমাদের এ শিক্ষা দেয় যে, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ, আর কোনো কিছু ইবাদতের উপযুক্ত নয়। সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহর করবো। আল্লাহ ছাড়া আর কারো, আর কোনো কিছুর ইবাদত করবো না। কোথাও উপাসনাধর্মী কোনো কাজ গায়রুল্লাহর জন্য হলে আমি তাতে শরিক হবো না। আল্লাহ তাআলা নবীজীকে বলেন, ‘আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরলপথ প্রদর্শন করেছেন, যা বিশুদ্ধ দ্বীন, ইবরাহিমের মিল্লাত, যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী।’ সুরা আনআম (৬) : ১৬১-৬৩।
এ আয়াতগুলোতে নবীজিকে নিখুঁত ও পরিপূর্ণ তাওহিদের ঘোষণা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির পশু জবেহ করার সময় তাওহিদের এই ঘোষণা উচ্চারণ করতেন। জাবির রা. থেকে বর্ণিত, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দুটি দুম্বা জবাই করেছেন। তিনি যখন এগুলোকে কেবলামুখী করে শোয়ালেন তখন বললেন, ‘আমি আমার মুখ তাঁর অভিমুখী করলাম, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, ইবরাহিমের মিল্লাতের ওপর, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী।’ সুনানে আবু দাউদ: ২৭৯৫।
২. কুরবানির আরেকটি বড় শিক্ষা হলো আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা। তাঁর আদেশকে শিরোধার্য করা। তাঁর হুকুম-আহকাম পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কুরবানির ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ইবরাহিম আ. আল্লাহর নির্দেশে বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত একমাত্র সন্তান ইসমাইল আ.-কে জবেহ করার জন্য খুশি মনে রাজি হয়েছিলেন।
৩. কুরবানির আরেকটি বড় শিক্ষা হলো যে, কোনো নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা। কুরবানির এ শিক্ষা উপরিউক্ত আয়াত ও হাদিস থেকেই আমরা পাই। অন্যত্র তা আরো পরিষ্কারভাবে এসেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহর কাছে সেগুলোর গোশত পৌঁছে না এবং সেগুলোর রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ সুরা হজ (২২) : ৩৭
হ্যাঁ, কুরবানির পশুর কিছুই তো আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। গোশত আমরা খেয়ে নিই। রক্ত-ময়লা ফেলে দিই। তাহলে আল্লাহর কাছে কী পৌঁছে? তাঁর কাছে পৌঁছে অন্তরের নিয়ত। যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কুরবানি করা হয়, তাহলে এটাই তাঁর কাছে পৌঁছবে এবং তাঁর কাছে এর প্রতিদান পাওয়া যাবে। আর যদি নামদাম, লৌকিকতা ইত্যাদি উদ্দেশ্যে করা হয় তাহলে তাঁর কাছে কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না।
মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানির ঘটনায়ও এ বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। যখন আদম আ.-এর দুই পুত্র কুরবানি পেশ করলেন তখন একজনের কুরবানি কবুল হলো, অপরজনের কুরবানি কবুল হয়নি। এ অবস্থায় তার (যার কুরবানি কবুল হয়নি) উচিত ছিল সত্য মেনে নেওয়া, কিন্তু সে উল্টো ঈর্ষাকাতর হলো এবং একপর্যায়ে অপর ভাইকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হলো। তখন ওই ভাই (যার কুরবানি কবুল হলো) বললেন, ‘আল্লাহ তো মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করেন।’ সুরা মায়েদা (৫) : ২৭।
হাদিসেও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামাজ আদায় করি। অতঃপর ফিরে এসে কুরবানি করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে, সে আমাদের নিয়ম মতো করলো। আর যে নামাজের আগেই পশু জবাই করলো সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, কুরবানি হবে না।’ সহিহ বুখারি: ৫৫৪৫; সহিহ মুসলিম: ১৯৬১।
এ হাদিস থেকে বোঝা গেল, কুরবানি শরিয়তের বিধান মোতাবেক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করতে হবে। অন্যথায় তা কুরবানি হবে না; বরং নিছক গোশত খাওয়ার আয়োজন হবে।
৪. কুরবানির আরেকটি শিক্ষা হলো, কোনো কাজেই এমনকি যদি অনেক বড় কোনো নেক কাজেরও তাওফিক হয়ে যায়, তবু অহংকার না করা, আত্মমুগ্ধতার শিকার না হওয়া; বরং বিনয়ী হওয়া এবং অন্তরে এই অনুভূতি থাকা চাই যে, এটা একমাত্র আল্লাহর দয়াই আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে। অন্যথায় আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। কুরবানির ইতিহাসে আমরা লক্ষ করেছি, ইবরাহিম আ. যখন ইসমাইল আ.-এর কাছে নিজ স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করে তাঁর অভিমত জানতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’
একবার নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি দুম্বা কুরবানি করেন। একটি নিজের পক্ষ থেকে, আরেকটি উম্মতের পক্ষ থেকে। দুম্বা দুটি জবাই করার সময় তিনি বলেন, ‘আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়ালাকা। হে আল্লাহ! এটা তোমার পক্ষ থেকেই এবং তোমার জন্যই।’ সুনানে আবু দাউদ: ২৭৯৫।
নবীজির বিনয় দেখুন, দুটি দুম্বা কুরবানি করা সত্ত্বেও তিনি অহংকার করেননি; বরং এই অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন যে, এটা আল্লাহরই দান, তিনিই এর তাওফিক দান করেছেন।
৫. কুরবানি র আরেকটি শিক্ষা হলো, সন্তানকে আল্লাহর অনুগত বানানোর চেষ্টা করা। কুরবানির ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ইবরাহিম আ. মনে মনে এমন সন্তানের কথাই ভাবতেন এবং আল্লাহর কাছেও এমন সন্তানই প্রার্থনা করতেন, যে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত হবে, আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। তিনি তা বাস্তবে প্রমাণ করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে কুরবানি করা এবং এর শিক্ষা দ্বারা আলোকিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: খতিব, দড়াটানা জামে মসজিদ
মুহাদ্দিস, দড়াটানা মাদরাসা, যশোর