যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

হিজরি বর্ষ উম্মাহর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ

মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সাল

প্রকাশ : শুক্রবার, ১৯ জুন,২০২৬, ০২:৪২ পিএম
হিজরি বর্ষ উম্মাহর আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মানুষের ইবাদত, সামাজিক আচরণ, রাষ্ট্রীয় বিধান ও ঐতিহাসিক স্মৃতি- সবকিছুর সাথেই সময় গণনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মুসলিম উম্মাহর নিজস্ব সময় গণনার পদ্ধতি হলো হিজরি বর্ষ। এই বর্ষ কেবল একটি ক্যালেন্ডার নয়; বরং এটি ত্যাগ, সংগ্রাম, ইমান ও আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার এক জীবন্ত স্মারক।
হিজরি বর্ষের সংজ্ঞা

হিজরি বর্ষ হলো চাঁদের আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত ইসলামি বর্ষপঞ্জি। আরবি শব্দ হিজরাহ থেকে ‘হিজরি’ শব্দটি এসেছে, যার অর্থ ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা বা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গমন করা। ইসলামি পরিভাষায় এটি বিশেষভাবে নির্দেশ করে মহানবী সা.-এর মক্কা থেকে মদিনায় গমনকে।

হিজরি বর্ষের ঐতিহাসিক পটভূমি

মক্কায় ইসলাম প্রচারের শুরু থেকেই মুসলমানরা নির্যাতন, অবরোধ ও সামাজিক বয়কটের শিকার হন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, আল্লাহ তাআলার নির্দেশে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করেন। এই হিজরত ছিল কেবল ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়; বরং এটি ছিল কুফরি সমাজ থেকে ইমানি সমাজে রূপান্তর, দুর্বলতা থেকে রাষ্ট্রীয় শক্তিতে উত্তরণ, দাওয়াত থেকে শাসনব্যবস্থার সূচনা।

এই যুগান্তকারী ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেই পরবর্তীতে মুসলমানরা একে বর্ষ গণনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন।

হিজরি বর্ষ প্রবর্তনের ইতিহাস

রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের পর খিলাফতে রাশেদার যুগে রাষ্ট্রীয় দলিল, চিঠিপত্র ও চুক্তিতে নির্দিষ্ট তারিখের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর খিলাফতকালে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শক্রমে হিজরতকে ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।

এভাবে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হিজরত থেকেই হিজরি সনের গণনা শুরু হয়, যা আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য সময় নির্ধারণের মানদণ্ড।
হিজরি সন। মুসলিম জীবনের এক তাৎপর্যময় অধ্যায়। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঐতিহাসিক তাৎপর্যময় ঘটনার অবিস্মরণীয় স্মারক এ হিজরি সন। হিজরি সনের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোদ নবী করিম (স.)। খ্রিস্টানদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি চুক্তিপত্রের নীচে ‘হিজরতের পঞ্চম বর্ষ’ উল্লেখ করার নির্দেশ দেন বলে ইসলামের ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) স্বীয় খেলাফতকালে হিজরতের ১৭তম বর্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে হিজরি সন গণনা শুরু করেন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হিজরি তারিখ গণনার সূচনা কীভাবে হলো, কবে থেকে হলো, তা বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘আল মাওসুয়াতুল ফিকহিয়া আল কুয়েতিয়া’ গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে এসেছে, ইসলাম আসার আগে আরবের সমষ্টিগত কোনো তারিখ ছিল না। সে সময় তারা প্রসিদ্ধ ঘটনা অবলম্বনে বছর, মাস গণনা করতো। মুসলিম মিল্লাতের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানরা কাবা শরিফ নির্মিত হওয়ার আগে তাঁর আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনা অবলম্বনে তারিখ নির্ধারণ করতো। কাবা শরিফ নির্মাণের পর তারা বিক্ষিপ্ত হওয়া পর্যন্ত এর আলোকেই সাল গণনা করতেন। তারপর বনু ইসমাইলের যারা হেজাজের তেহামা অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যেত, তখন সেই গোত্র বেরিয়ে যাওয়ার দিন থেকে তারিখ গণনা করতো। যারা তেহামাতে রয়ে যেত তারা বনি জায়েদ গোত্রের জুহাইনা, নাহদ ও সাদের চলে যাওয়ার দিন থেকে সাল গণনা করতো। কাব বিন লুয়াইয়ের মৃত্যু পর্যন্ত এ ধারা চলমান ছিল। পরে তার মৃত্যুর দিন থেকে নতুনভাবে সাল গণনা শুরু হয়। এটি চলতে থাকে হস্তীবাহিনীর ঘটনা পর্যন্ত। হজরত ওমর (রা) হিজরি নববর্ষের ঘোষণা করার আগ পর্যন্ত আরবে হস্তীবর্ষই প্রচলিত ছিল।

হিজরি সনের গোড়াপত্তন

মহানবী (স.)-এর হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মারক বানিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) হিজরি সনের আনুষ্ঠানিক অপরিহার্যতা বোধ করেন। তিনিই প্রথম মুসলমানদের জন্য পৃথক ও স্বতন্ত্র চান্দ্রমাসের পঞ্জিকা প্রণয়ন করেন। কেন একটি নতুন সন গণনা প্রথা চালু করতে হলো, এ নিয়ে বিভিন্ন অভিমত পাওয়া যায়।

আল্লামা ইবনে সমরকন্দি (র.) লিখেছেন, হজরত আবু মুসা আশয়ারি (রা.) ইরাকের গভর্নর থাকাকালে একবার হজরত ওমর (রা.)-এর কাছে চিঠি লেখেন যে, ‘আপনার পক্ষ থেকে আমাদের কাছে অনেক ফরমান আসে। কিন্তু তাতে তারিখ লেখা থাকে না। সুতরাং সময়ক্রম নির্ধারণের জন্য সন গণনার ব্যবস্থা করুন।’ তারপর ওমর (রা) হিজরি সনের আবশ্যকতা উপলব্ধি করেন।

যেভাবে সন গণনা শুরু

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। যখন হজরত ওমর (রা.) সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন তখন তিনি এক পরামর্শসভা আহ্বান করেন। সভায় হজরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা.) রাসুল (স.)-এর ওফাত থেকে সন গণনার প্রস্তাব দেন। হজরত তালহা (রা.) বিশ্বনবী (স.)-এর নবুয়তের বছর থেকে সন গণনার অভিমত ব্যক্ত করেন। আর হজরত আলী (রা.) প্রস্তাব দেন হিজরতের ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সন গণনার। অবশেষে সকলেই আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐকমত্য পোষণ করেন।

মাস নিয়ে মতপার্থক্য

এরপর কোন মাস থেকে শুরু হবে এ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) রজব থেকে শুরু করার প্রস্তাব দেন। কেননা এটি চারটি সম্মানিত মাসের মধ্যে প্রথমে আসে। হজরত তালহা (রা.) রমজান থেকে শুরু করার কথা বলেন। কেননা এটি উম্মতের মাস। হজরত আলী (রা.) ও ওসমান (রা.) মহররম থেকে শুরু করার পরামর্শ দেন।

হিজরি বর্ষ কেন হিজরত থেকে শুরু

হিজরত ইসলামের রাষ্ট্রীয় সূচনার মাইলফলক। এতে ত্যাগ, কোরবানি ও আল্লাহর সাহায্যের বাস্তব নিদর্শন রয়েছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; বরং উম্মাহগত পরিবর্তনের সূচনা।

হিজরতকে মূল্যায়ন করা হয় আল ফারিকু বাইনাল হাক্কি ওয়াল বাতিল তথা সত্য-মিথ্যার মাঝে সুস্পষ্ট পার্থক্যকারী বিষয় হিসেবে। হিজরতের পর থেকেই মুসলমানরা প্রকাশ্য ইবাদত ও সমাজ গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। প্রকাশ্যে আজান, নামাজ, জুমা, ঈদ ও অন্য সবকিছু হিজরতের পর থেকেই শুরু হয়েছে। এসব তাৎপর্যের দিকে লক্ষ্য করেই মুসলমানদের সন গণনা হিজরত থেকেই শুরু হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

হিজরি বর্ষের মাসসমূহ

হিজরি বর্ষে মোট ১২টি চান্দ্রমাস রয়েছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারো...’ (সুরা আত-তাওবা: ৩৬)

হিজরি মাসগুলো হলো মুহাররম, সফর, রবিউল আউয়াল, রবিউস সানি, জমাদাল উলা, জমাদাল উখরা, রজব, শা’বান, রমজান, শাওয়াল, জিলকদ এবং জিলহজ। এর মধ্যে মুহাররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ- এই চার মাসকে হারাম (সম্মানিত) মাস বলা হয়।

চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের পার্থক্য

হিজরি বর্ষ চন্দ্রভিত্তিক হওয়ায় এটি সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১০-১১ দিন ছোট। ফলে রমজান, হজ ও অন্যান্য ইবাদত ঋতুভেদে ঘুরে আসে। এতে মুসলমানরা বিভিন্ন আবহাওয়ায় ইবাদতের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ পায়। আল্লাহর বিধানের সর্বজনীনতা প্রতিফলিত হয়।

ইবাদতে হিজরি বর্ষের গুরুত্ব

ইসলামি শরিয়তের বহু বিধান সরাসরি হিজরি বর্ষের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন রমজানের রোজা, হজ ও কুরবানি, জাকাতের বছর পূর্ণ হওয়া, দুই ঈদ, আশুরা, আরাফা দিবস, শবেবরাত, শবেকদর, আইয়ামে বীজ।

অতএব হিজরি বর্ষ জানা ও মানা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইসলামের ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর দিন-তারিখগুলোকে খ্রিস্টীয় সন-তারিখে রূপান্তরিত করে পালন করা হয় বা স্মরণ করা হয়। এটা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

আমার মনে হয়, এটা যুক্তিযুক্ত নয় এবং এমনটি করা উচিত নয়। কারণ, এসব ঘটনা যেসব মাস বা দিনে হয়েছে সেগুলোর আলাদা তাৎপর্য আছে। যেমন বদর যুদ্ধের দিনের কথা বলতে পারেন। যুদ্ধটি হয়েছে রমজান মাসে। কোরআন নাজিলের মাসে। এখন এ যুদ্ধদিনের তারিখকে খ্রিস্টীয় সনে অনুসরণ করে স্মরণ করলে একসময় দেখা যাবে যে, দিনটি আর রমজান মাসে নেই। তখন এ যুদ্ধের ইতিহাসের যে আবেদন রয়েছে, তা কিছুটা হারিয়ে যাবে। তাই এজাতীয় ঘটনা ও দিবসকে হিজরি সন ও তারিখ দিয়েই গণনা করা উচিত। তবে হিজরি সন ঠিক রেখে কেউ যদি এর সঙ্গে খ্রিস্টীয় সনকে মিলিত করে উল্লেখ করেন, সেটা দোষণীয় নয়।

হিজরি সন বা ইসলামি সনকে স্মরণ ও অনুশীলনে রাখা মুসলমানদের জন্য কতটা দরকারি

শুধু হিজরি সন নয়, হিজরি সনের মাসগুলোর তারিখ ব্যবহারে ও চর্চায় রাখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কর্তব্য। মুসলমানদের হিসাব-নিকাশগুলো হিজরি তারিখ উল্লেখ করেই করা উচিত। অন্য সনের হিসাব অনুগামী হিসেবে আসতে পারে।

মনে রাখতে হবে, ইসলামি তারিখ বা চান্দ্রবর্ষের হিসাব রক্ষা করা মুসলমানদের জন্য ফরজে কেফায়া। একথা মনে করার কোনোই অবকাশ নেই যে, হিজরি সনটি আসলে আরবি বা কেবল আরবদের একটি সন; বরং এটি মুসলমানদের সন এবং ইসলামি সন। এক্ষেত্রে শুধু একটা চাঁদ দেখা কমিটি করে একটি মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব পুরোপুরি পালিত হয় না। বরং সব মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রের উচিত, তাদের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা বজায় রেখে ইসলামি বা হিজরি সনকে প্রাধান্য দেওয়া। (আল কাউসার)

হিজরি বর্ষের শিক্ষা ও তাৎপর্য

হিজরি বর্ষ আমাদের শেখায়, ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজনে সবকিছু ত্যাগ করতে। আল্লাহর ওপর ভরসা করলে অন্ধকারেও পথ খুলে যায়। সত্যের পথে সংগ্রামই শেষ পর্যন্ত বিজয়ের কারণ। হিজরত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলাম শুধু মসজিদে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুতি ও কোরবানি প্রয়োজন।

হিজরি বর্ষ উম্মাহর আত্মপরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি নিছক তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যম নয়; বরং এটি আমাদের ইতিহাস, ইমান ও দায়িত্ববোধের জীবন্ত দলিল। আজকের মুসলমানদের উচিত হিজরি বর্ষকে শুধু ক্যালেন্ডারে নয়, বরং চিন্তা, পরিকল্পনা ও আমলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেওয়া। তবেই হিজরতের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত হবে।

লেখক: ইমাম ও খতিব, নলডাঙ্গা রোড জামে মসজিদ, যশোর

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)