সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরি নির্ধারণের দাবিতে ঢাকার মিরপুর, আশুলিয়া, কালিয়াকৈর, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছেন পোশাক শ্রমিকরা। সোমবার সকাল থেকে তারা সড়ক আবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এসময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছে।
গাজীপুরের নওজোড়ে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এসময় পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। শ্রমিকরাও ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।
গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। তখন সময় টিভির প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এর আগেও একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সফিপুর পল্লী বিদ্যুৎ ও চন্দ্রা এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। বেলা ১১টার দিকে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও বিজিবি ধাওয়া দিলে আন্দোলনকারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন।
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রথমে অনন্তের সামনে আসেন ও পরে হামীমের সামনে এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় কারখানা থেকে শ্রমিকরা বিভিন্ন দাবিতে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে তাদের উত্তেজনা তৈরি হয়।
এক পর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে (লিংক রোড) নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন একাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা। সড়কটিতে অবস্থান নিয়ে অবরোধ তৈরি করায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই আন্দোলনে ফতুল্লার মেট্রো নিটিং, পলমল গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন এবং আজাদ-রিফাত ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিংসহ কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা অংশ নিয়েছেন।
ঢাকার মিরপুর ১০ নাম্বার থেকে মিরপুর ১২ নাম্বার পর্যন্ত যে প্রধান সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও ব্যাপক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি রয়েছে। মিরপুর ১০ থেকে একজনকে আটক করেছে পুলিশ। এছাড়া কাফরুল থানা পুলিশ আরো পাঁচজনকে আটক করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
সকালে মিরপুর ১১ নাম্বারে কয়েক দফায় পুলিশের সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। সে সময় পুলিশের পাশাপাশি সড়কে ছাত্রদল, যুবদল, শ্রমিকদলের নেতা-কর্মীদের অবস্থান নেয়।
শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা দূর করতে সোমবার সকাল থেকে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে তারা সড়কে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় গাজীপুরের সব কারখানা বন্ধ রয়েছে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেছেন, সোমবারও শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করছেন। শ্রমিক আন্দোলনের কারণে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি, জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশ কাজ করছে।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে, তবে তারা আবার মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য আসেন। সকাল থেকে এমন পরিস্থিতি চলছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’
এদিকে, পোশাকশিল্প খাতে সাম্প্রতিক আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে সেখানে সাধারণ শ্রমিক কিংবা শ্রমিকনেতাদের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, মূলত কিছু মুখোশধারী লোক এই আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা বলেন। এর আগে সকালে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ এবং বিকেলে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি।
ভিডিও ফুটেজের প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক দিনের আন্দোলনের ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের কোনো সংযোগ নেই। মুখোশধারী ব্যক্তিরা এতে অনুপ্রবেশ করেছে, যারা দাবি আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এবং শ্রমিকও নয়, তারাই সড়কের আন্দোলনে নৈরাজ্য তৈরি করছে। তিনি বলেন, সড়ক-মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
পরিস্থিতির শিকার নিরীহ শ্রমিকদের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আন্দোলনের ঘটনায় যেসব সাধারণ শ্রমিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন, সরকার তাদের বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় দেখবে। পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসার বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রমিকদের কারখানায় ফেরার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে। এবার আপনারা শিল্পে ফিরে যান, ঘরে ফিরে যান, উৎপাদনে ফিরে যান, কর্মস্থলে ফিরে যান। আপনাদের পক্ষ হয়ে এখন শ্রমিকনেতারা মজুরি বোর্ডের সভায় কথা বলবেন।’
তিনি আরও বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা ইচ্ছা করে সড়ক অবরোধ করে রাখছে, তারা কোনোভাবেই শ্রমিকদের বন্ধু হতে পারে না।
সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত গার্মেন্টস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও মজুরি বোর্ডের সদস্য বাবুল আখতার বলেন, এবারের আন্দোলনে বহিরাগতরা কারখানায় ঢুকে জোর করে ছুটি দিতে বাধ্য করেছে। এর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ হওয়া হকার, রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং যাদের বকেয়া পাওনা ছিল, তারা যুক্ত হয়েছে।
তিনি শ্রমিকদের সতর্ক করে বলেন, ‘কারও উসকানিতে শিল্পের ক্ষতি হয়, এমন কোনো কাজ করবেন না।’
বাবুল আখতার বলেন, কেউ শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ২৭ হাজার টাকা বলছেন, কেউ ৩০ হাজার টাকা, কেউ ৩২ হাজার কেউ ৩৭ হাজার টাকা বলছেন। শ্রমিক প্রতিনিধিরা বসে একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত করে মজুরি বোর্ডের প্রথম সভায় বিষয়টি তুলে ধরা হবে।
একই সংবাদ সম্মেলনে সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আকতারও শ্রমিকদের দ্রুত কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানান। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং শ্রমিকনেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।