সুবর্ণভূমি ডেস্ক
রাষ্ট্রও চাইবেন আবার মহৎ উদ্দেশ্যে পিস্তল হাতে এমপির মহড়াও চাইবেন, দুইটা একসাথে হয় না। ইশরাক আজকে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়সেন, কিন্তু কইসেন এমপি হিসাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ চালাইয়া যাবেন। মানে চেয়ারটা গেসে, পিস্তলের যুক্তিটা রইয়া গেসে। এভাবে কটাক্ষ করে লিখেছেন শীর্ষস্থানীয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও ইনফ্লুয়েন্সার পিনাকী ভট্টাচার্য্য। তার লেখাটি সুবর্ণভূমির পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
এনসিপির আখতার হোসেন কইসে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারতেসে না দেইখাই ইশরাককে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামতে হইসে। বিএনপির সিনিয়র নেতারা এনসিপিরে কয় চিলড্রেনস পার্টি। তারেক রহমান কইসেন বিরোধী দল বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করতেসে। দুই কথারই ভিত্তি আছে, আর মজার ব্যাপার হইলো দুইটার প্রমাণ এনসিপি একসাথে দিয়া দিসে। যেই কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজে ইশরাকরে পদত্যাগ করতে কইসেন, বিরোধী দলের সদস্যসচিব সেই কাজের পক্ষে যুক্তি সাজাইতেসেন। আর একটা দলের এত বড় নেতা যখন বলেন রাষ্ট্র পারে নাই তাই মন্ত্রীকে পিস্তল নিয়া নামতে হইসে, তখন বুঝতে হয় ওই দল রাষ্ট্র জিনিসটা কী, সেইটাই বুঝে নাই। ওদের চিল্ড্রেনস পার্টি বলাটা ভুল হয় নাই।
১৯১৯ সালে মিউনিখে ম্যাক্স ভেবার ছাত্রদের সামনে রাষ্ট্রের যেই সংজ্ঞা দিসিলেন, সেইটা আজও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম পাঠ। সহজ কথায়: একটা ভূখণ্ডের ভিতরে কে কার উপর জোর খাটাইতে পারবে, এই প্রশ্নের একমাত্র বৈধ উত্তর রাষ্ট্র। আর কেউ জোর খাটাইলে খাটাইতে পারে ঠিক ততটুকু, যতটুকু রাষ্ট্র তারে অনুমতি দিসে, এক বিন্দু বেশি না। ভেবার কথাটা শুরু করসিলেন ট্রটস্কিরে উদ্ধৃত কইরা: প্রত্যেক রাষ্ট্র দাঁড়াইয়া থাকে বলপ্রয়োগের উপর। মানে এইটা কোনো বুর্জোয়া আইনের বই থিকা আসা কথা না, বামপন্থীরা এইটা আরো ভালো কইরা জানে। বলপ্রয়োগের এই একচেটিয়া অধিকারটাই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। টেরিটরির ভিতরে আর কেউ যখন নিজের ইচ্ছায় বল প্রয়োগ করে, তখন রাষ্ট্র আর পুরা সার্বভৌম থাকে না, উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক।
ইশরাক কইসে, পিস্তলটা লাইসেন্স করা, হামলার আশঙ্কায় আত্মরক্ষার জন্য অল্প সময় উচাইসিলেন। লাইসেন্স মানে রাষ্ট্র তারে নিজের জান বাঁচানোর অনুমতি দিসে, অন্যের পিছে দৌড়ানোর অনুমতি দেয় নাই। ভিডিওতে দেখা যায় তিনি গাড়ি থিকা নাইমা পিস্তল উচাইয়া একদল লোকরে তাড়া করতেসেন, অস্ত্র তাক কইরা চিল্লাইতেসে "অ্যাই দাঁড়াও"। আত্মরক্ষা পিছায়, তাড়া আগায়। রবিন হুড হইয়া বল প্রয়োগ করলেও রাষ্ট্রের কাজ রবিন হুডরে ধরা, কারণ রবিন হুডরে ছাড়লে পরের জন আইসা কইবো আমিও রবিন হুড। ইশরাক যা করসে, একই যুক্তিতে বাংলা ভাইও নামসিলো। ওইটাই বিএনপির সর্বনাশ করসিলো। ওয়ান ইলেভেনের শুরু সেইখান থেকে। তারপরের ফ্যাসিবাদের বীজ ছিলো বাংলা ভাই ইস্যু। বিএনপির তিন এমপির প্রত্যক্ষ মদদে এই বাংলা ভাই তান্ডব চালাইসিলো। ইশরাককে নিয়া তারেক রহমান সঠিক সিদ্ধান্ত নিসে। এইটারে সাপোর্ট করেন। ইশরাককে না। রাষ্ট্রটারে ধ্বংস কইরেন না।
এমপির হাতে আছে আইন বানানোর ক্ষমতা, আইন খাটানোর না। আইন বানায় সংসদ, খাটায় পুলিশ, বিচার করে আদালত। এই তিনটা আলাদা রাখার জন্যই আধুনিক রাষ্ট্রের এত কসরত। এমপি তার এলাকার গডফাদার না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা তার চাকরি না। রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া পুলিশরে তার কাজে সাহায্য করতে পারেন, এর বাইরে এক বিন্দুও না। ইশরাকের পোস্টে ঘোষণা আসছে, মাদক কারবারি যে দলেরই হোক ছাড় পাবে না। ছাড় দেওয়ার বা না দেওয়ার মালিক তো আদালত। যিনি নিজে ঠিক করেন কে কারবারি আর কে ছাড় পাবে, তিনি একসাথে পুলিশ আর বিচারক দুইটাই হইয়া বসসেন। আর পিস্তল উচাইয়া ভয় দেখাইয়া যদি মাদক বন্ধ করা যাইতো, তাইলে দুনিয়াতে মাদক বইলা কোনো জিনিস থাকতো না। সবাই এই একশনে যাইতো।
এখন আসল জায়গায় আসি। আমরা যখন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা বল প্রয়োগ করি, ওইটারে কয় বিপ্লব। বিপ্লবে আগের রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার রাস্তায় হাইরা যায়। এই কারণেই পাঁচই আগস্টের পরে নতুন সংবিধান, নতুন রাষ্ট্র গড়ার দরকার ছিল। যেই বলপ্রয়োগের যন্ত্র একবার জনগণের হাতে পরাজিত হইসে, পরের দিন সকালে গেজেট দিয়া তারে আবার বৈধ বানানো যায় না। এই কারণেই পুলিশ আজ ডিসফাংশনাল। ইশরাকের পিস্তল এই শূন্যতারই লক্ষণ: রাষ্ট্র যখন একচেটিয়া অধিকার ধইরা রাখতে পারে না, তখন প্রত্যেক ক্ষমতাবান মানুষ নিজের হাতে খালি জায়গাটা ভরতে নামে।
কিন্তু আপনারা তো রাইখা দিসেন পুরানা রাষ্ট্রকাঠামো। তাইলে সেই কাঠামোরে কাজ করতে দেন, যেইভাবে তার কাজ করার কথা। রাষ্ট্রও চাইবেন আবার মহৎ উদ্দেশ্যে পিস্তল হাতে এমপির মহড়াও চাইবেন, দুইটা একসাথে হয় না। দুদু আর তামাকু একসাথে খাওয়া যায় না। সতীর পবিত্রতা আর বেশ্যার সুখ একসাথে পাওয়া যায় না। ইশরাক আজকে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়সেন, কিন্তু কইসেন এমপি হিসাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ চালাইয়া যাবেন। মানে চেয়ারটা গেসে, পিস্তলের যুক্তিটা রইয়া গেসে।
তাইলে সোজা কইরা বলেন, রাষ্ট্রের দরকার নাই। ভাইঙ্গা দেন সংসদ মংসদ। পুলিশ আর্মি লাগবো না, আইন আদালত লাগবো না। মাফিয়া গডফাদাররা এলাকা ভাগ কইরা নিয়া চালাক, আমরা গোত্রে গোত্রে ভাগ হইয়া ট্রাইবাল শাসন চালাই। ভালোই হবে। এখন একজন পিএম, তখন হাজার হাজার গোত্রপতি, প্রতি পাড়ায় একজন কইরা রবিন হুড। আমরা সবাই একজন ভালো, দয়ালু রবিন হুডের গোত্রে নাম লেখাইয়া দিন গুজরান করমু।
আমাদের কি স্যানিটি চইলা গেসে? কাউরে কইতে দেখলাম না তারেক রহমান ঠিক কাজ করসে। এইটাই তো রাষ্ট্রনায়কের কাজ। ইশরাক যা করসে তা ভুলই শুধু না অপরাধ। সারা দেশের মানুষ ইশরাককে সাপীর্ট করলেও এইটা অপরাধ। পিরিয়ড।।