যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

অস্ট্রেলিয়ায় মহাকাব্য লিখলো বাংলাদেশ

বিশেষ প্রতিনিধি

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ১৬ আগস্ট,২০২৬, ১২:২৪ পিএম
অস্ট্রেলিয়ায় মহাকাব্য লিখলো বাংলাদেশ

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো। তাও আবার ৯ উইকেটে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এর চেয়ে গৌরবের জয় খুঁজে পাওয়া কঠিন। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে আজ শুধু একটি টেস্টের ফল লেখা হয়নি। লেখা হয়েছে এক মহাকাব্য। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পুরো ম্যাচজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে বাংলাদেশ তুলে নিয়েছে অবিশ্বাস্য এক জয়।

টানা ১১টি সেশন অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রেখেছে বাংলাদেশ। র‍্যাঙ্কিংয়ে অস্ট্রেলিয়া এক নম্বরে। বাংলাদেশ নয় নম্বরে। টেস্ট শুরুর আগে তাই প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশ আদৌ ম্যাচটি তৃতীয় দিনে নিতে পারবে কি না। সেই বাংলাদেশই ম্যাচ শেষ করল চতুর্থ দিনের লাঞ্চের আগেই। এক দিনেরও বেশি সময় হাতে রেখে। তাও ৯ উইকেটের ব্যবধানে!

২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার টেস্টে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটি ছিল ঐতিহাসিক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এসে অস্ট্রেলিয়াকে এভাবে হারানোর মাহাত্ম্য অন্যরকম। দুই দশকেরও বেশি সময় পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে এসে বাংলাদেশ যা করল, তা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে থাকবে।

অস্ট্রেলিয়া বধে ডারউইনে প্রতিদিন বাংলাদেশ পেয়েছে নতুন নায়ক। প্রতি সেশনে বদলেছে গল্পের চরিত্র। প্রথম দিনে হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় দিনে তানজিদ হাসান।
তৃতীয় দিনে মেহেদী হাসান মিরাজ। আর তাদের পাশে দাঁড়িয়ে বাকিরাও করেছেন নিজেদের কাজ।

এটাই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে দলীয় পারফরম্যান্স।

প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮ রানের জবাবে বাংলাদেশ করেছিল ৪২৬, যা বাংলাদেশকে পাইয়ে দেয় ২২৮ রানের বিশাল লিড।

ইনিংস হারের শঙ্কা নিয়েই দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। চতুর্থ দিনের সকালে তাদের হাতে ছিল ছয় উইকেট। স্কোর ১৬১। বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে ৬৭ রানে। তখনও অস্ট্রেলিয়ার সামনে ইনিংস হার এড়ানোর লড়াই। লড়াইটা কিছুটা লম্বা করেছেন ক্যামেরন গ্রিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঘূর্ণি আর পেসের সামনে দাঁড়াতে পারেননি কেউ।

চতুর্থ দিনের সকালের উইকেট থেকে মেহেদী হাসান মিরাজ পেয়েছেন টার্ন ও বাউন্স। সেই সুযোগটিই কাজে লাগিয়েছেন নিখুঁত শৃঙ্খলায়। ইনিংসের ৬০তম ওভারে মিরাজের বাঁক খাওয়া একটি বল লাফিয়ে উঠেছিল। ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটের পেছনে। কট বিহাইন্ড।

এরপর ৬৬তম ওভারে বো ওয়েবস্টার। ৭৪তম ওভারে প্যাট কামিন্স। ৯৬তম ওভারে শেষ ব্যাটসম্যান নাথান লায়ন। অস্ট্রেলিয়ার লেজটা গুটিয়ে দিয়েছেন মিরাজই। তিনি ৬৬ রান দিয়ে নিয়েছেন ৫ উইকেট। টেস্টে এটি তার ১৫তম পাঁচ উইকেটের কীর্তি।

লাঞ্চের বিরতিতে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার ও ধারাভাষ্যকার ব্রেন্ডন জুলিয়ানকে নিজের বোলিংয়ের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মিরাজ। তার পরিকল্পনা ছিল সহজ। অফ স্টাম্পের বাইরে থাকা ফুটমার্কে বল ফেলেছেন। প্রতিটি ওভারে উইকেট পাওয়ার জন্য মরিয়া হননি। বরং শৃঙ্খলা ধরে রেখেছেন। সেই শৃঙ্খলাই অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধসের অন্যতম কারণ।

মিরাজ যখন অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ে ধস নামাচ্ছেন, তখন এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ২৮৪ রানের মধ্যে গ্রিন একাই করেছেন ১০৪। সেঞ্চুরিটি এসেছে বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে। কিন্তু সেই সেঞ্চুরিও অস্ট্রেলিয়াকে বাঁচাতে পারেনি।

প্রথম সেশনে ৩১ ওভার ব্যাটিং করে অস্ট্রেলিয়া হারিয়েছে তিন উইকেট। তিনটিই নিয়েছেন মিরাজ। লাঞ্চে যাওয়ার সময় স্কোর ৭ উইকেটে ২৪৩। লিড ১৫ রান। হাতে মাত্র তিন উইকেট।

লাঞ্চের পর ১১.১ ওভারও টিকতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। গ্রিনসহ বাকি ব্যাটসম্যানরা একে একে ফিরে গেছেন সাজঘরে। অস্ট্রেলিয়া অলআউট ২৮৪ রানে।

বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়াল মাত্র ৫৭।

গ্রিনের ১০৪ তাই শেষ পর্যন্ত হয়ে রইলো এক ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত বীরত্ব। দলের জন্য সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছু নয়।

বাংলাদেশের পেস আক্রমণও এই জয়ের গল্পে সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন হাসান মাহমুদ। দ্বিতীয় ইনিংসে গ্রিনের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটিও তার। দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেট একাই নিয়েছেন হাসান। তানজিদ হাসানও প্রথম ইনিংসে শতক করে বাংলাদেশের বড় লিড গড়ার ভিত তৈরি করেছেন। অর্থাৎ ম্যাচের প্রতিটি ধাপেই ছিল বাংলাদেশের আলাদা নায়ক।

৫৭ রানের লক্ষ্য। জয় তখন বাংলাদেশের হাতের মুঠোয়। তবু শুরুতেই একটি ধাক্কা। দ্বিতীয় ওভারেই জস হ্যাজলউডের বলে বোল্ড তানজিদ হাসান। তারপর আর কোনো বিপদ হতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। অভিজ্ঞ মুমিনুল আর সাদমান মিলে লিখেছেন ইতিহাসের শেষ কয়েকটি লাইন। সাদমান অপরাজিত ২৫। মুমিনুল অপরাজিত ৩০।

জয়সূচক রানটিও এসেছে মুমিনুলের ব্যাট থেকে। বো ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে মারা বাউন্ডারিতে। তারপরই উৎসব। গ্যালারি থেকে একটাই শব্দ-‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ।’ অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী বাংলাদেশিদের কণ্ঠে সেই ধ্বনি ডারউইনের আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সময়ের জন্য মারারা স্টেডিয়াম যেন হয়ে ওঠে বাংলাদেশেরই কোনো মাঠ।

ড্রেসিংরুমের সামনে ক্রিকেটাররা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছেন। আবেগে ভেসেছেন। আর ওপাশে অস্ট্রেলিয়ার ড্রেসিংরুম থেকে প্রেসবক্স-সবখানেই নেমে এসেছে নীরবতা।

মাঠের লড়াই চতুর্থ দিনে গড়ালেও ডারউইনের মানুষ যেন হেরে গিয়েছিল তৃতীয় দিনেই। চতুর্থ দিন ছিল ছুটির দিন। তারপরও মাঠে দর্শক ছিল অল্প। গ্যালারি প্রায় ফাঁকা। আগের তিন দিনের উৎসবমুখর পরিবেশও আর ছিল না। সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জ।

অন্য দিনগুলোতে সাবেক ক্রিকেটার, ক্রিকেট কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে জমজমাট ছিল জায়গাটি। বুফে। নানা ধরনের পানীয়। সাজানো টেবিল। পূর্ণ চেয়ার। রোববার কিছুই ছিলনা।

লাউঞ্জের এক কর্মীর ভাষ্য, টেস্ট তৃতীয় দিনের পর যাবে না ধরে নিয়ে চতুর্থ দিনের জন্য কেউ টিকিটই কাটেনি। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ চতুর্থ দিনে গড়ালেও অস্ট্রেলিয়ার অবস্থা দেখে নতুন করে আর টিকিট বিক্রি হয়নি। তাই বন্ধই ছিল লাউঞ্জ।

মাঠের খেলাটা অস্ট্রেলিয়া টেনেটুনে চতুর্থ দিনে নিয়ে যেতে পেরেছিল।
কিন্তু ডারউইনের মানুষ হয়তো ম্যাচের ফল মেনে নিয়েছিল আরও আগেই।

ইতিহাসের পাতায় শেষ পর্যন্ত জায়গা করে নেয় বিজয়ীরাই। সেই পাতায় আজ বাংলাদেশের নাম। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পাশে লেখা-৯ উইকেট। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক নতুন উচ্চতা।

অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪।
বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭।

অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে গ্রিন ১০৪। মিরাজ ৫/৬৬। হাসান ৩/৫৬। তাসকিন ও তাইজুল একটি করে উইকেট নিয়েছেন।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে মুমিনুল অপরাজিত ৩০। সাদমান অপরাজিত ২৫। তানজিদ শূন্য।

ফল-বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর আজ অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দ্বিতীয়বার তাদের হারাল বাংলাদেশ। তবে এই জয় শুধু আরেকটি জয় নয়।

এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের জয়।

এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার জয়।

এটি র‍্যাঙ্কিংয়ের হিসাবকে মাঠের বাস্তবতায় উল্টে দেওয়ার জয়।

ডারউনের ইতিহাসে তাই আজকের দিনটি শুধু একটি ম্যাচের দিন নয়। এ দিন বাংলাদেশ ক্রিকেট নিজের জন্য নতুন একটি উচ্চতা তৈরি করেছে। আর সেই উচ্চতার নাম-অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশের মহাকাব্যিক জয়।

সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া: ১৯৮ ও ২৮৪ (গ্র্রিন ১০৪, স্মিথ ৪৪, লাবুশেন ৩১, ক্যারি ৩০, স্টার্ক ১৮, লায়ন ১৫; মিরাজ ৫/৬৬, হাসান ৩/৫৬, তাসকিন ১/৬৬, তাইজুল ১/৫১, ইবাদত ০/৩৮) বাংলাদেশ: ৪২৬ ও ১/৫৭ (মুমিনুল ৩০, সাদমান ২৫, তানজিদ ০; হ্যাজলউড ১/৫, স্টার্ক ০/১৫, লায়ন ০/২৩)। ফল: বাংলাদেশ ৯ উইকেটে জয়ী।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)