সার্ফিংয়ে ‘হ্যাং টেন’ নামে একটি কসরত আছে। সাগরে সার্ফিং বোর্ডের একদম মাথায় দাঁড়িয়ে পায়ের দশটি আঙুল একসঙ্গে বাইরে ঝুলিয়ে দিতে হয়। এই কসরত দেখাতে দরকার নিখুঁত টাইমিং ও দুর্দান্ত ফুটওয়ার্ক।
বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১–১ গোলে ড্র করে ব্রাজিলও তেমন এক অথই সাগরে পড়েছিল। চারপাশ থেকে ধেয়ে এসেছিল সমালোচনা। নিখাদ ৯ নম্বর নেই, গোল করবেন কে! মিডফিল্ড যাচ্ছেতাই, খেলা তৈরি করবেন কে!
শুধু তাই নয়, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৮২ ধাপ পিছিয়ে থাকা হাইতির মতো দলের বিপক্ষেও ব্রাজিলের চাপে থাকা দৈব দৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছেন অনেকেই। ভুল। মাঠে দেখা গেল হাইতির গোলকিপার প্রথমার্ধেই জাল থেকে তিনবার বল কুড়ালেন!
প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে খেলা শুরুর বাঁশি বাজার আগে ব্রাজিল আসলে প্রত্যাশার চাপের সাগরেই হাবুডুবু খেয়েছে। কিন্তু সঙ্গে যদি থাকেন ‘হ্যাং টেন’ জানা কোনো ‘সার্ফার’—তাহলে আর চিন্তা কী!
বিশ্বকাপ নামে এই প্রত্যাশার চাপের সাগরের ঢেউ ব্রাজিলের জন্য যতটা খাঁড়া, মাতেউস কুনিয়ার পায়ের কাজও যেন ততটাই নমনীয়।
ফুটবলের পাশাপাশি কুনিয়ার সার্ফিংও যে ভালোই জানা, সেটা বোঝা গেল ম্যাচের ৩৬ মিনিটের মধ্যে তাঁর জোড়া গোলের উদ্যাপনে। দুবারই ‘হ্যাং টেন’ উদ্যাপনে কুনিয়া বুঝিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপের অথই সাগরে ব্রাজিলকে এখন থেকে আর হাবুডুবু খেতে হবে না। তার ৯ নম্বর জার্সির ‘সার্ফিং বোর্ডে’ই এখন থেকে গোল খুঁজে পাবে ব্রাজিল।
তবে ম্যাচটি দেখা থাকলে স্কোরবোর্ড দেখে ব্রাজিলের সমর্থকদের আক্ষেপ হতে পারে। হাইতির বিপক্ষে ব্রাজিল জিতেছে ৩–০ গোলে। অফসাইডে গোল বাতিল হয় দুটি।
১২ মিনিটে রাফিনিয়ার গোল এবং বদলি নামা এনদ্রিকের গোল বাতিল হয় ৭৮ মিনিটে। পাশাপাশি আরও অন্তত তিনটি গোলের সুযোগ নষ্ট করে আনচেলত্তির দল। সব গোলই এসেছে প্রথমার্ধে। একটু খটকা তাই থেকেই যায়, বিরতির পর ঠিক কী হয়েছিল আনচেলত্তির আক্রমণভাগের!
তবে ব্রাজিলের এই জয়ে বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষ দলগুলো কিন্তু একটি বার্তাও পেয়ে গেল। সেটা হলো, আনচেলত্তির আক্রমণভাগ জেগে উঠলে ভয় পেতেই হবে সবাইকে!
মরক্কো ম্যাচে সেই জাগাটা হয়নি। আনচেলত্তি তাই বরাবরের মতো এই ম্যাচেও একাদশে পরিবর্তন আনেন। কুনিয়াকে খেলান একাদশে। তাতে যেন গোল না পাওয়া এবং মিডফিল্ডে নখদন্তহীন হয়ে ওঠার ‘ধাঁধা’র শেষ সূত্রটা মিলিয়ে ফেলে ব্রাজিল।
মাঝমাঠে প্রত্যাশা পূরণ করেছেন ব্রুনো গিমারাইস ও লুকাস পাকেতা। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে গুছিয়ে উঠতে না পারলেও দুজনের বলের জোগানে ভিনি, রাফিনিয়া ও কুনিয়া ধীরে ধীরে পেখম খুলে ধরেন আক্রমণের। দুর্ভাগ্য, ৪০ মিনিটে চোটের কারণে উঠে যান রাফিনিয়া। বদলি নামেন ১৯ বছর ৩২০ দিন বয়সী ফরোয়ার্ড রায়ান।
২৩ থেকে ৩৬-এই ১৪ মিনিটের মধ্যে জোড়া গোল আদায় করে নেন কুনিয়া। এ দুটি গোলে পেছন থেকে অর্কেস্ট্রার ‘কন্ডাক্টর’ এর মতো বল জোগান দেন ভিনিসিয়ুস।
প্রথমটিতে তাঁর শট হাইতি গোলকিপার জনি প্লাসিড ঠেকানোর পর ফিরতি বলে গোল করেন কুনিয়া। পরের গোলটি ছিল ভিনির দুর্দান্ত থ্রু পাস।
৮১ মিনিটে উঠে যাওয়ার আগে ভিনিসিয়ুস দেখিয়েছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেও কম যান না! প্রথমার্ধে যোগ করা সময়ে পাকেতার পাস থেকে তার গোলটি ছিল নিখাদ ৯ নম্বরের মতো। হাইতি গোলকিপারের দুই পায়ের ভেতর দিয়ে বল জালে পাঠান।
বিরতিতে ৩–০ গোলে এগিয়ে থাকায় সম্ভবত দ্বিতীয়ার্ধে ধীরে ধীরে আক্রমণভাগ পরীক্ষামূলক করেন আনচেলত্তি। ৬৪ মিনিটে কুনিয়াকে তুলে এনদ্রিককে নামান। তখন মাঠে ব্রাজিলের চার ফরোয়ার্ড-এনদ্রিক, রায়ান, ভিনিসিয়ুস ও গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি। কিন্তু এই অর্ধে জমেনি ব্রাজিলের আক্রমণভাগ।
উল্টো দু-একবার ব্রাজিলের বক্সে ঢুকে গোলের খুব কাছাকাছি গিয়ে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল আগে তিনবারের সাক্ষাৎয়ে ব্রাজিলের কাছে ১৭ গোল হজম করা হাইতি।
দ্বিতীয়ার্ধে ভালো একটি সেভ করেন ব্রাজিলের গোলকিপার আলিসন। ব্রাজিলের পোস্টে এ সময় ৩টি শট রেখেছে হাইতি। ব্রাজিল গোটা ম্যাচে ৬টি শট পোস্টে রাখতে পেরেছে।
এই ম্যাচের আগে ব্রাজিলকে জাগাতে সমর্থক ও সাবেকদের চেষ্টার শেষ ছিল না। ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামের ৬৭ হাজার আসনে হাইতির সমর্থকদের চেয়ে ব্রাজিলের সমর্থক ছিল অনেক বেশি।
আগের ম্যাচের মতোই গ্যালারিতে ছিলেন ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি কাকা ও রোনালদো নাজারিও। এ ম্যাচে নতুন যোগ হন রোনালদিনিও। ভিনি মাঠে নামার আগে ‘গাউচো’র সঙ্গে হাতও মেলান। সেই প্রেরণা থেকেই সম্ভবত মাঠে প্রথমার্ধে হাইতির রক্ষণকে স্রেফ ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেন ভিনি!
২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ‘সি’ গ্রুপের শীর্ষে উঠল ব্রাজিল। মরক্কো ব্রাজিলের সমান ম্যাচে সমান পয়েন্ট নিয়ে দুইয়ে। গোল ব্যবধানে পিছিয়ে আফ্রিকার দলটি। ২ ম্যাচে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় স্কটল্যান্ড। তলানিতে থাকা হাইতি ২ ম্যাচেই হেরেছে।