যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি থেকে সরে আসার ফল

যশোর বোর্ডের ফল তিন বছর ধরে নিম্নমুখি

লীগ আমলে সর্বোচ্চ নম্বর দিতে বলা হতো: বোর্ড সচিব

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট,২০২৬, ১২:০১ এ এম
যশোর বোর্ডের ফল তিন বছর ধরে নিম্নমুখি

যশোর শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ফলাফলে ক্রমাবনতি অব্যাহত রয়েছে। ফ্যাসিবাদী জমানায় ‘সবাইকে পাস করিয়ে দাও’ নীতি থেকে সরে আসার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলের তিনটি পরীক্ষায় পাস, জিপিএ ৫ পাওয়া ও শত পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে, বেড়েছে শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বোর্ডের সচিব এই কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন। তবে পরীক্ষকরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তা এই সত্য কবুল করছেন।

ফ্যাসিবাদী জমানায় শেষ পরীক্ষা ২০২৪ সালে যশোর বোর্ডে ৯২ দশমিক ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলেও ২০২৬ সালে এই হার নেমে এসেছে ৬৬ দশমিক ২৭ শতাংশে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় পাসের হার কমেছে ২৬ দশমিক ০৫ শতাংশ। একই সময়ে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২০ হাজার ৭৬১ থেকে কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮ জন। হ্রাসের হার ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।

শুধু শিক্ষার্থীদের ফলেই নয়, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলেও অবনতির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৪ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৪২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী এসএসসিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭৫-এ। ২০২৬ সালে তা আরও কমে হয়েছে ৩৬টি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৩৮৬টি, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৯১ দশমিক ৪৭ শতাংশ কম।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার এক পরীক্ষক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে আমাদের প্রতি নির্দেশনা ছিল, যেকোনো উপায়ে পরীক্ষার্থীদের পাস করিয়ে দিতে হবে। এখন সেই বাস্তবতা নেই। ফলে যারা ঠিকমতো লেখাপড়া করেছে, তাদের ফলাফল তদনুযায়ী হয়েছে।’

অন্যদিকে, এবার যশোর বোর্ডে শতভাগ ফেল করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালে কোনো প্রতিষ্ঠানেই শতভাগ শিক্ষার্থী ফেল করেনি। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল দুই। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১১।

সোমবার এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম হোসেন আলী বলেন, উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং কাউকে অতিরিক্ত নম্বর দেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা যেমন পরীক্ষা দিয়েছে, ফলও হয়েছে তেমন।
তার মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। পাশাপাশি ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণেও এবার পাসের হার কমেছে।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পাসের হার বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। পরীক্ষকদের বলা হতো, শিক্ষার্থীরা যা-ই লিখুক, সর্বোচ্চ নম্বর দিতে।

তিনি বলেন, এখন সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। বর্তমানে শিক্ষার্থীরা যতটুকু নম্বর পাওয়ার যোগ্য, যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের ততটুকুই নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। পাসের হার বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় না গিয়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান ও প্রকৃত মেধার মূল্যায়নকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দীর্ঘদিন অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল না। তবে এখন শিক্ষার্থীরা আবার পড়ার টেবিলে ফিরছে এবং অভিভাবকদের সচেতনতাও বেড়েছে। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশে ফিরে এসে ভালো ফল করবে, আশাবাদ ব্যক্ত করেন এই কর্মকর্তা।

এবার যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের দশ জেলার দুই হাজার ৫৮১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এক লাখ ৩২ হাজার ৯৪০ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৭ জন। ফলে পাস করতে পারেনি ৪৪ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রতি ১০০ জনে প্রায় ৩৪ জন শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।

বোর্ড প্রকাশিত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে এক লাখ ৩৮ হাজার ৮৫১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল এক লাখ দুই হাজার ৩১৯ জন। সেই হিসেবে পাস করতে পারেনি ৩৬ হাজার ৫৩২ জন। এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে পাঁচ হাজার ৯১১ জন। কিন্তু পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ১৪ হাজার ২২২ জন। অর্থাৎ পরীক্ষার্থী সংখ্যা কমলেও ফেলের হার বেড়েছে।

২০২৫ সালে যেখানে মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ২৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ ফেল করেছিল, ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে প্রায় ৩৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এক বছরে ফেল করার হার বেড়েছে প্রায় ৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

জিপিএ ৫ এর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২০২৪ সালে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২০ হাজার ৭৬১ জন জিপিএ ৫ পেয়েছিল। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৫ হাজার ৪১৯ জনে। ২০২৬ সালে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও তিন হাজার ৯৪১ জন কমে হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৮। পূর্ববর্তী বছরের সাথে তুলনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় এবার জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে নয় হাজার ২৮৩ জন। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির হার প্রায় ৪৪ দশমিক ৭২ শতাংশ কমেছে।

প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলের হিসাবে অধোগতি আরও স্পষ্ট। ২০২২ সালে যশোর বোর্ডে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৫১৩টি। ২০২৩ সালে তা কমে হয় ১৯৩টি। ২০২৪ সালে আবার ৪২২টি প্রতিষ্ঠানে শতভাগ পাস হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭৫টিতে। এবার এই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬টিতে। ২০২২ সালের ৫১৩টি থেকে ২০২৬ সালের ৩৬টিতে নামার অর্থ হলো, চার বছরের মধ্যে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে ৪৭৭টি, অর্থাৎ প্রায় ৯২ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৩ সালে তিনটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। ২০২৪ সালে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না। ২০২৫ সালে ছিল দুটি। এবার বেড়ে হয়েছে ১১টি।

যশোর শহরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পরীক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখনকার ফলাফলই আসল চিত্রের প্রকাশ। এর আগের দেড় দশকে যা হয়েছে, তা ফলাফলের নামে প্রহসন।

যশোর বোর্ডে এবার শতভাগ ফেল করা ১১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যশোর ও সাতক্ষীরার চারটি করে, খুলনার দুটি এবং বাগেরহাটের একটি। যশোরের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো মণিরামপুর উপজেলার হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল, শার্শা উপজেলার সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল।

এসব প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থী সংখ্যাও কম। হেলাঞ্চি কৃষ্ণবাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে পরীক্ষার্থী ছিল একজন, চান্দুয়া সমসকাটি গার্লস হাইস্কুল থেকে তিন, সাড়াতলা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল থেকে দুই এবং মুক্তিযোদ্ধা জিকেজিএস সেকেন্ডারি গার্লস স্কুল থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নেয়।

সাতক্ষীরার শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো সাতক্ষীরা নাইসা সেকেন্ডারি স্কুল, গোদারা সেকেন্ডারি স্কুল, বাবুরাবাদ ধাপুখালি সেকেন্ডারি স্কুল এবং সাহেবখালি সিদ্দিক গাজী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার্থী ছিল যথাক্রমে সাত, চার, চার ও চারজন। খুলনার কাতেঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও আসমা সরওয়ার ইসলামিক উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল চারজন করে। বাগেরহাটের ডিএন একতা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পরীক্ষার্থী ছিল দুইজন।

বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলছেন, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ফল বিশ্লেষণে তাই শুধু মোট পাসের হার নয়, এসব বিষয়ের বিষয়ভিত্তিক ফলও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কারণ দুটি মৌলিক বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে তা একদিকে ফেল করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ায়, অন্যদিকে উচ্চ গ্রেড পাওয়ার সম্ভাবনাও কমিয়ে দেয়।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)