রায়হান সিদ্দিক
, যশোর
‘আমাদের পরিবারের কারও খাওয়া-ঘুম নেই। ও রাতে বাড়ি ফেরে না, কত রাত যে আমি জেগে বসে রইছি তার ইয়ত্তা নেই। রাতে উঠে কান্দি আর আল্লাহর কাছে সন্তানটার হেদায়েত চাই।’
চোখের পানি মুছতে মুছতে এই কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চাশ বছর বয়সী জাহানারা বেগম। শহরের পালবাড়ি নূতন খয়েরতলা এলাকার বাসিন্দা তিনি।
২০২০ সালে করোনা মহামারির মধ্যেই তার জীবনে নেমে আসে আরেক দুঃস্বপ্ন। বড় ছেলে আহনাফ জড়িয়ে পড়ে নেশার অন্ধকার জগতে। শুরুর দিকে স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের সাথে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ে সে। এরপর ধীরে ধীরে গাঁজা এবং ইয়াবার মতো মাদক সেবন শুরু। তখন আহনাফের বয়স মাত্র ১৫ বছর। ছোট ছেলে অন্তু সবে প্রাইমারির গণ্ডি পেরিয়েছে।
পাঁচ বছর আগেও হাসি-খুশি স্বাভাবিক জীবন ছিল এই পরিবারের। মাদকের ভয়াল থাবায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে পরিবারটির সেই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, হাসি-খুশি জীবন।
সন্তানকে সুপথে ফিরিয়ে আনতে জাহানারা বেগম কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেননি। ধর্মীয় শিক্ষা, তাবলিগ-তালিম থেকে শুরু করে সব ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক কাউন্সেলিংয়ের চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। বিপথে চলে যাওয়া সন্তানের কারণে পরিবারটি অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকার মানুষও কটূক্তি করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রায়ই মারধরের শিকারও হয় আহনাফ।
জাহানারা বেগম বলেন, একটা সন্তান খারাপ হওয়া মানে পুরো পরিবার নষ্ট হয়ে যাওয়া। বর্তমানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ছেলেটিকে একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
জাহানারা বেগমের মতো এমন হাজারো মা গুমরে কাঁদছেন, সম্মান-অর্থসহ সবকিছু হারাচ্ছে পরিবার। সুখ-শান্তি আর পারিবারিক বন্ধন এখন অতীত। ভয়াল নেশা থেকে কোনো মতেই সন্তানদের বের করে আনতে পারছেন না তারা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি এক জরিপে দেখিয়েছে, দেশের মোট মাদকাসক্তের প্রায় ৮০ শতাংশই তরুণ ও যুবা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৮৩ লাখ। যার মধ্যে ৬৫ লাখেরও বেশি তরুণ, যাদের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ, দেশের মোট যুবা জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকের জালে আটকা পড়েছে।
সীমান্তবর্তী জেলা যশোরে মাদকাসক্তির হার আরও বেশি হবে বলে সংশ্লিষ্টদের অনুমান। কারণ সীমান্তের ওপার থেকে আসা মাদক এখানকার জনপদে গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে চিহ্নিত। যশোরে মাদকের ব্যবহার, মাদকাসক্তি, তার পরিণাম, সমাজে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান করে সুবর্ণভূমি; যেখানে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র।
যশোরে অবস্থিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে আসক্তির সর্বনিম্ন বয়স ১৫ থেকে ১৮ বছর দেখা যেত, বর্তমানে তা কমে ১২ থেকে ১৪ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে এবং ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়সীদের মধ্যে আসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই তালিকায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল এমনকি মাদরাসাপড়ুয়ারাও। পুরুষের পাশাপাশি মাদকাসক্ত নারীদের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।
আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আসক্তি কাটিয়ে এই তরুণদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন, দেশে তার তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আসক্তির প্রথম ও প্রধান কারণ হলো কৌতূহল। পারিবারিক সমস্যা, মানসিক ডিপ্রেশন বা প্রেমে ব্যর্থতার কথা অনেকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও, তা মূলত নেশা করার একটি উসিলা মাত্র। প্রথমবার কৌতূহলবশত বন্ধুদের সাথে নেশা করার পর, পরবর্তীতে যেকোনো মানসিক চাপেই তারা মাদকের দিকে ধাবিত হয়।
শিক্ষিত ও সম্ভাবনাময় হয়েও কীভাবে ভুল পথে পা বাড়িয়ে একজন যুবক অভ্যাসের দাসে পরিণত হয়, তারই এক বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে একজন মাদকাসক্ত যুবকের কথোপকথনে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে মাদক সেবন করছেন যশোর শহরের মণিহার এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার গাজী।
তার ভাষ্য, বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কৌতূহলবশত এবং বিষণ্নতা কাটানোর বাহানায় মাত্র একটি টানের মাধ্যমে তার গাঁজা সেবন শুরু হয়। সেই শুরু। এখন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করেছে নেশা।
তার ভাষায়, ‘এখন মাদক না নিলে ভালো লাগে না। মাদক নেওয়ার পর এক ধরনের সাময়িক ও কৃত্রিম মানসিক শান্তি পাই, যা সংসারের অশান্তি ও সামাজিক দুশ্চিন্তা থেকে দূরে রাখে।’
মাদক যে আইনত নিষিদ্ধ এবং এটি একটি সমাজকে দ্রুত ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে তা স্বীকার করেন এই তরুণ। কিন্তু নেশার জগৎ থেকে নিজেও কোনো মতে সরিয়ে আনতে পারছেন না তিনি। যুবকটির কণ্ঠে ফুটে উঠেছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার তীব্র আকুতি।
তিনি সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘কে না চায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে? কিন্তু এই ফেরার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজ ও মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।’
তার অভিযোগ, একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি যখন সবকিছু পেছনে ফেলে ভালো পথে ফেরার চেষ্টা করে, তখনো পরিবার বা সমাজ তাকে সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। সমাজ তাকে সব সময় সন্দেহের চোখে দেখে এবং পূর্বের ভুলের জন্য প্রতিনিয়ত দোষারোপ করতে থাকে।
তিনি দাবি করেন, এই মানসিক যন্ত্রণা, অনাদর, অবিশ্বাস এবং সমাজের অবহেলা সহ্য করতে না পেরে অনেক সময় জেদের বশে বা চরম হতাশায় ভুগে তারা আবারও সেই মাদকের আশ্রয়েই ফিরে যেতে বাধ্য হন। সমাজ ও পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থার এই নেতিবাচক আচরণকে নিজের সুপথে ফেরার প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে বর্ণনা করেন।
যশোরের মাদকের পরিস্থিতি ও প্রভাব
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলায় সবচেয়ে বেশি আসক্তি তৈরি করছে ইয়াবা। অনেকে সিগারেট বা গাঁজার মাধ্যমে নেশার জগতে ঢুকলেও পরে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। একবার ইয়াবায় আসক্ত হলে তারা সাধারণত অন্য নেশা আর করতে চায় না।
ফেনসিডিল: ফেনসিডিল এখন খুবএকটা পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি হওয়ায় এই সিরাপ মুষ্টিমেয় নেশাসক্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
গাঁজা ও টাফেনটা: মধ্য ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে গাঁজা, ইয়াবা এবং টাফেনটার ব্যবহার বেশি। টাফেনটা মূলত ইন্ডিয়ার একটি ব্যথার ওষুধ হিসেবে তৈরি হয়েছিল, যা এখন নেশার উদ্দেশ্যে পানি বা কোল্ড ড্রিংকসের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি মাত্র ১০০ থেকে ২০০ টাকায় পাওয়া যায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যশোরের পরিদর্শক নাজমুল হোসেন খান জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক শিথিলতার সুযোগ নিয়ে যশোরে মাদকের বিস্তার বাড়িয়েছে সুযোগসন্ধানীরা। ভৌগোলিক কারণে সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এখান থেকে দেশের অন্যান্য জেলায় বিপুল মাদক পাচার হয়। আগে এই অঞ্চলে ফেনসিডিলের দাপট থাকলেও বর্তমানে ইয়াবার পাশাপাশি ‘উইনকোরেক্স’ নামে নতুন এক ধরনের সিরাপের ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ফেনসিডিলের মতোই ক্ষতিকর।
মাদক পাচার রোধে সীমান্তের নো-ম্যানসল্যান্ড পর্যন্ত কাজ করার নতুন আইনি এখতিয়ার তৈরি হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের। তবে এই মুহূর্তে যশোরে টাস্ক ফোর্সের পর্যাপ্ত অভিযান পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেটের ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, ম্যাজিস্ট্রেটরা নিজস্ব দাপ্তরিক কাজ ছাড়াও ভেজালবিরোধী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় ব্যস্ত থাকায় নিয়মিত বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ অভিযান বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই সংকট উত্তরণে জনবল বৃদ্ধি এবং নিজস্ব ভবনে নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক হাজতখানাসহ আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যশোরে বর্তমানে সরকারি কোনো নিরাময় কেন্দ্র নেই। বেসরকারিভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত দুটি কেন্দ্র চালু রয়েছে। কিন্তু এই কেন্দ্রগুলোতে শয্যা সংখ্যা সেবাগ্রহীতার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। কেন্দ্রগুলোতে আনুষঙ্গিক সাপোর্টও দুর্বল। ফলে নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরার পরও প্রায় ৬০ শতাংশ মাদকসেবী আবার পুরনো লাইনে ফিরে যান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন খান জানান, মাদকসেবীদের অপরাধী না ভেবে ‘অসুস্থ’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে তাদের সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে পরিবারকে। অনেক সময় পারিবারিক অবহেলার কারণে সুস্থ হওয়া ব্যক্তিরা আবার অন্ধকার জগতে ফিরে যান।
সন্তান মাদকাসক্ত কিনা তা চেনার জন্য পরিবারের উদ্দেশে তিনটি লক্ষণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, হঠাৎ করে প্রতিদিনের খরচের চাহিদা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়া, রাতে না ঘুমিয়ে দুপুর ১২টা-১টা পর্যন্ত ঘুমানো এবং সামাজিক ভদ্রতা বা পোশাক-আশাকের প্রতি চরম উদাসীনতা প্রকাশ পাওয়া গেলে পরিবারকে সতর্ক হতে হবে।
নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রক্রিয়া
মাদকের অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরে আসার মূল চাবিকাঠি হলো কাউন্সেলিং। রোগীকে মাদকের খারাপ দিকগুলো বোঝানো এবং পুনর্বাসন শেষে সমাজে তিনি কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২২ বছর ধরে এই কাজটি করে আসছে যশোর শহরের ধর্মতলায় অবস্থিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র ‘বন্ধন’। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এখানে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সুস্থতার হার প্রায় ৭৫ শতাংশ। বাকি ২৫ শতাংশ রোগী বাইরে গিয়ে আবার খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নেশার জগতে ফিরে যান।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মাহবুব হাসান জানিয়েছেন, নিরাময় কেন্দ্রে সাধারণত এমন সব রোগীদের আনা হয় যাদের পরিবার আর কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এখানে আসার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে বাধ্যতামূলক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (মুসলমানদের জন্য) আদায়, ধর্মীয় শিক্ষা ও কুরআন শরিফ পাঠের ব্যবস্থা রয়েছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য রয়েছে ধর্মীয় বই পড়ার সুযোগ। এই ধর্মীয় অনুভূতি রোগীদের কাউন্সেলিং গ্রহণ করতে দারুণভাবে সাহায্য করে।
তার মতে, বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই কঠিন।
তিনি বলেন, নেশা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেতে ওষুধের চেয়ে কাউন্সেলিং বেশি কার্যকর। তবে যেসব রোগী একসাথে একাধিক মাদকের নেশা করে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, তাদের সাময়িকভাবে সুস্থ করতে অভিজ্ঞ সাইকিয়াট্রিস্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ এক মাস ওষুধ সেবন করানো যেতে পারে। পরবর্তীতে সম্পূর্ণ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেই তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মাহবুব হাসান বলেন, আমাদের নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টের কার্যক্রম অনেকটাই সাধারণ। পুলিশ, আর্মি বা বিজিবির মতো তাদের কোনো অস্ত্র বা বিশেষ ক্ষমতা নেই, যার কারণে অপরাধীরা তাদের ভয় পায় না। মাদকের বিস্তার রোধে নারকোটিক্স ডিপার্টমেন্টকে আরও শক্তিশালী করতে হবে, তাদের অস্ত্র ও ক্ষমতা দিতে হবে। শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তাদের ক্যাম্প বা ফাঁড়ির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সামাজিক নানা বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের মতে, মাদক কেনার জন্য এখন সনাতন পদ্ধতির বদলে নানা আধুনিক উপায় বেরিয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অনলাইনে অর্ডার ও হোম ডেলিভারির সুযোগ। নানা কোম্পানির ডেলিভারিম্যানরা এখন বিভিন্ন ধরনের পণ্য হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। এর মধ্যে যে ঘরে ঘরে মাক পৌঁছে যাচ্ছে না, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং উল্টোটিই ঘটছে এবং এই বিষয়ে গণমাধ্যমে ইতিমধ্যে বেশকিছু প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে।
রিহ্যাব সেন্টার ‘বন্ধন’-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি থেকে ৬৪৪ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ১২৭ জন, ২০২৪ সালে ১১৪ জন, ২০২৫ সালে ১৯৭ এবং ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২০৬ জন।
তাদেরই একজন হাসান আলী। মাদকাসক্তির কারণে তিনি একসময় হারিয়েছিলেন স্বাভাবিক জীবন। পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অসম্মান আর শারীরিক-মানসিক অবক্ষয়ই হয়ে উঠেছিল নিত্যসঙ্গী। তবে সেই অন্ধকারকে পেছনে ফেলে এখন আলোর পথে ফেরার লড়াই চালাচ্ছেন এই যুবক। নিরাময় কেন্দ্রে টানা ৬২ দিন চিকিৎসার পর নেশার ভয়াবহতা উপলব্ধি করে এখন তিনি পুরোপুরি সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখছেন।
হাসান আলী তার অতীত ও বর্তমানের অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, ‘মাদকাসক্তির কারণে আমি জীবন উচ্ছন্নে চলে গিয়েছিলাম। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ফ্যামিলি আমাকে এই নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এখানে আসার পর আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, নেশা মানুষকে কীভাবে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ডুবিয়ে দেয়।’
মাদকের সর্বগ্রাসী ক্ষতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নেশা মানুষের জীবনে ভালো কিছু তো আনেই না, বরং সর্বপর্যায়ে ক্ষতি ডেকে আনে। এর কারণে সামাজিক ক্ষতি, আর্থিক ক্ষতি এবং মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি হয়। এখানে না আসলে হয়তো আমি কখনোই বুঝতে পারতাম না যে, মাদক সমাজ ও পরিবারের সামনে একজন মানুষকে কতটা খারাপভাবে প্রেজেন্ট করে।’
রিহ্যাবের নিয়মিত কাউন্সেলিং ও নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন এই যুবক। তার মতে, সুস্থ থাকতে হলে অবশ্যই খারাপ বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে, কোনো রকম নেতিবাচক পরিবেশে যাওয়া যাবে না এবং নিজেকে সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একই সাথে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া এবং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে পারে।
বাইরে থাকা মাদকাসক্ত এবং এখনো আসক্ত হয়নি এমন তরুণদের উদ্দেশে তার আবেগঘন বার্তা, ‘এখনো যারা নেশাগ্রস্ত, তারা বুঝতে পারছেন না যে, নিজের জীবনকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। নিরাময় কেন্দ্রে এসে সুস্থ জীবনে ফেরার চেষ্টা করুন।’
অন্যদিকে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় অন্ধকার জগতে থাকার পর অবশেষে আলোর দিশা পেয়েছেন রতন কুমার পাল। দীর্ঘ আট বছর ধরে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন তিনি।
শহরের বেজপাড়ার বাসিন্দা রতন জানান, সঙ্গদোষে প্রথমে অনিয়মিতভাবে মদ্যপান শুরু করেন তিনি। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই শখ রূপ নেয় নেশায়। ধীরে ধীরে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন এবং একপর্যায়ে প্যাথিডিন ইনজেকশনের মতো মারাত্মক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি।
মাদকাসক্তির সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রতন বলেন, ‘মাদকের কারণে পরিবার ও সমাজের কাছে আমি চরমভাবে অবহেলিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে সবসময় আড়াল করে রাখতাম। বাড়ির লোকজন আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিল, খারাপ ব্যবহার করতো। প্রতিউত্তরে আমিও তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করতাম। জীবনের সেই সময়টায় কোনো মানসিক শান্তি ছিল না।’
এই দুরবস্থা দেখে তার ভাই রতনকে একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে (রিহ্যাব) ভর্তির পরামর্শ দেন। ভাইয়ের মাধ্যমেই তিনি নিয়মিত চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং প্রোগ্রামে অংশ নিয়ে এখন সুস্থ জীবনযাপন করচেন।
মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবার ও সমাজের দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রতন কুমার পাল বলেন, একজন মানুষ যখন রিহ্যাব থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরে, তখন তার আচার-আচরণ ও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে। সমাজ ও পরিবারকে তখন তার সাথে ইতিবাচক আচরণ করতে হবে। তাকে যদি পুনরায় অবহেলা করা হয়, তবে সে আবারও নেশার জগতে ফিরে যেতে পারে। নেশা ছাড়ার জন্য ব্যক্তির নিজের ইচ্ছার পাশাপাশি পরিবারের সাপোর্ট সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধার সুবর্ণ সময় পার করছে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষই তরুণ। এই তরুণদের যদি মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সমীকরণ ভেঙে পড়বে।
[সম্পাদকীয় নোট: এই প্রতিবেদনে নেশাসক্ত ও তাদের পরিবার সদস্যদের ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে]