যশোর শাম্স-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি
বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
হালকা রোদ আর মেঘলা আকাশ, বিশাল সবুজ চত্বরে বেশকিছু তরুণ আর শিশু, তারা পৃথক স্থানে ফুটবল নিয়ে কসরৎ করছে।
শনিবার বিকেলে তাদের কসরৎ চলাকালে শুরু হয় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। ছেলেরা ভাগ হয়ে গেল দুই দলে। দুইজন কোচ তাদের তত্ত্বাবধান করছেন। খেলা শুরুর কয়েক মিনিট পরেই ঝুম বৃষ্টি। ছেলেরা দ্বিগুণ উৎসাহে খেলায় মনোযোগ দিয়েছে।
এই দৃশ্য যশোর সদরের ফতেপুর ইউনিয়নের হামিদপুর এলাকায়, শাম্স-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি চত্বরের। সুবিশাল মাঠ, কেবল সবুজ আর সবুজ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এখানে পূর্ণাঙ্গ তিনটি এবং ছোট একটি মাঠ রয়েছে। যেখানে ক্লাস সিক্স থেকে শুরু করে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ফুটবল প্রাকটিস করে।
একাডেমির গোড়াপত্তন
যশোর সদরের হামিদপুর বাজার এলাকায় ২০১১ সালের ১৪ মে শাম্স-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন রেডিয়্যান্ট ফার্মার চেয়ারম্যান, জাহেদী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল। সেই সময় স্কুলের মাঠ লিজ নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।
২০১৭ সালের ১৭ মার্চ হামিদপুরে তাদের নিজস্ব বিশাল এই মাঠের উদ্বোধন করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একাডেমির ছয় তলাবিশিষ্ট ‘ভাষাসৈনিক মুসা মিয়া ভবন’ নামে আন্তর্জাতিকমানের মাল্টিপারপাস আবাসিক উদ্বোধন করা হয়; যেখানে রয়েছে খেলোয়াড়দের জন্য দরকারি যাবতীয় সুবিধা।
এই ভবনে রয়েছে ২৪০ জন শিক্ষার্থীর আবাসন ব্যবস্থা, জিমনেশিয়াম, মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম, লাইব্রেরি ও স্টাডিরুম, কনফারেন্স রুম, ডাইনিং হল, প্রশাসনিক কক্ষ, গেস্ট রুম, মিনি গ্যালারি ও নামাজের স্থান।
দেশের বেসরকারি পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ একমাত্র ফুটবল একাডেমি।
ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনে এসেছিলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন।
শাম্স-উল-হুদার নামে একাডেমি
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর গ্রামে ১৯১৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন শাম্স-উল-হুদা। ১৯৩০ সালে তিনি স্কুলে পড়াকালে ফুটবল দলে প্রথম সুযোগ পান। ১৯৩৯ সালে আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতায় অল বেঙ্গল চ্যাম্পিয়ন দলের নিযমিত খেলোয়াড় ছিলেন। যশোর লীগে টাউন ক্লাব, ইয়াং মুসলিম ক্লাব, যতীন্দ্রমোহন ক্লাবে খেলেছেন শামস-উল-হুদা। ১৯৫০ সালে তার সক্রিয় সহযোগিতায় যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা গঠন এবং দুই বছর পর তিনি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ৩৬ বছর তিনি নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করেন।
এই ক্রীড়া সংগঠকের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যশোর স্টেডিয়ামের নাম তারই নামে নামকরণ করা হয়। ১৯৮৭ সালে তিনি মারা যান।
তার মেয়েজামাই নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল হলেন শাম্স-উল-হুদা নামে একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।
আবাসিক-অনাবাসিক
খেলাশেষে গায়ের কাদা-পানি পরিস্কার পানিতে গোসল সেরে বাড়িমুখো হচ্ছিল যশোর সদরের বসুন্দিয়া এলাকার মাদরাসাছাত্র নাইম মোল্লা। সে বসুন্দিয়া মডেল দাখিল মাদরাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
নাইম জানায়, একজন বড় ফুটবলার হতে চায়। সেকারণে সপ্তাহের চারদিন বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ি থেকে সোজা একাডেমি মাঠে হাজির হয়। খেলাধুলা শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আবারও বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেয়। এই বছর সে এখানে ভর্তি হয়েছে।
গোসল সারছিল দশম শ্রেণির ছাত্র সদরের নতুনহাট এলাকার রাকিব হোসাইন। সে বাইসাইকেলে চালিয়ে একাডেমি মাঠে আসে। প্রায় এক ঘণ্টা লাগে বাড়ি থেকে এখানে পৌঁছুতে।
আবাসিক ছাত্র সাদাত আল সাবিত জানায়, তার বড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুরে। গত বছর থেকে সে একাডেমিতে রয়েছে। চলতি বছর এসএসসি পাস করেছে ৪.৪৪ পয়েন্ট পেয়ে। ইচ্ছে আছে একজন ভালো ফুটবলার হওয়ার। সে অনূর্ধ্ব ১৫ জেলা টিমের সদস্য।
একাডেমি সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে মোট ১৮৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছে এখানে। এরমধ্যে আবাসিক ৬০ জন।
একাডেমির অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠানে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছে। স্কুল পর্যায়ে স্থানীয় হামিদপুর হাইস্কুল এবং কলেজ পর্যায়ে আল হেরা ডিগ্রি কলেজের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। আবাসিক শিক্ষার্থীরা সেখানেই পড়াশোনা করে।’
আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্যে চমৎকার আবাসন ব্যবস্থা, খাওয়া, পড়ালেখা, স্বাস্থ্যসেবা, জিম, পোশাক-আশাক, বিনোদন- অর্থাৎ জীবন চলার জন্যে যা যা প্রয়োজন, সবকিছুরই ব্যবস্থা রয়েছে।
কৃতিত্ব
সবশেষ এএফসি অনূর্ধ্ব ১৭ বাছাই ফুটবল (জাতীয় দল) প্রাথমিক ক্যাম্পে অনুশীলন করছে এই একাডেমির ১৩ তরুণ।
গত ৯ আগস্ট অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের হয়ে উজবেকিস্তানে খেলতে যান এই একাডেমির মাসুদ রানা। এমন আরও বেশ কয়েকজন তরুণ রয়েছেন, যারা বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের মূল দল ছাড়াও বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে বেশ খেলছেন।
২০২২ সালে এই একাডেমির ২০ খেলোয়াড় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের ক্লাবগুলোর অংশগ্রহণে অনূর্ধ্ব ১৮ শেখ জামাল ধানমণ্ডির হয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।
২০১৬ সালে ৮০টি টিম নিয়ে অনুষ্ঠিত ঢাকা পাইওনিয়ার লীগে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে অংশগ্রহণ করে। ক্লাবটি তৃতীয় বিভাগে উন্নীত হয়। এভাবে ২০১৮ সালে ১৫ খেলোয়াড় নিয়ে তৃতীয় বিভাগ ফুটবল লীগে আরামবাগ ফুটবল লীগের হয়ে অংশগ্রহণ করে এবং দ্বিতীয় বিভাগে উন্নীত হয়। ২০১৯ সালে একাডেমী কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়।
দেশের বাইরেও ইংল্যান্ড, কাতার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, মিয়ানমারসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এখানকার খেলোয়াড়রা।
২০২৩ সালে এই একাডেমির তরুণ ফুটবলার যশোর সদরের নওদা গ্রামের মিনহাজুল করিম স্বাধীনকে আমন্ত্রণ জানায় আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিভাগের দল এথলেটিকো ভিলা স্যান কার্লোস ক্লাব। ২০২২ সালে ব্রাজিলের সোসিয়েদাদ স্পোর্তিভো দ্য গামা ক্লাবের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পান যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নয়ন হোসেন। ২০১৩ সালে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন হাফিজুর রহমান।
২০১৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা কল্যাণী মিউনিসিপ্যালিটি স্পোর্টস একাডেমির সঙ্গে খেলায় ৭-০ গোলে বিজয়ী হয় শাম্স-উল-হুদা একাডেমি।
বেসরকারি উদ্যোগে একমাত্র স্বয়ংসম্পূর্ণ একাডেমি
যশোর সদরের হামিদপুর গ্রামে ছায়াঢাকা পাখিডাকা শান্ত সবুজ গ্রামে গড়ে উঠেছে দেশের বেসরকারি উদ্যোগে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ফুটবল একাডেমি।
বিশিষ্ট শিল্পপতি, রেডিয়্যান্ট ফার্মার চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী, যিনি জাহেদী ফাউন্ডেশনেরও চেয়ারম্যান, এই একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা।
অনুশীলনের জন্য প্রায় ৭০ বিঘা জমির উপরে সুবিশাল মাঠ, যেখানে রয়েছে সর্বাধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি আবাসিক ভবন। এই ভবনের পেছনে সুবিশাল পুকুর। সেখানে সাঁতার প্রাকটিস করে ছেলেরা।
এই একাডেমির প্রধান কোচ কাজী মারুফ হোসেন বলেন, বেসরকারি পর্যায়ে ফুটবলের জন্যে এমন আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান দেশে আর কোথাও নেই।
তিনি জানান, সমাজের সকল মানুষেরই সমাজের প্রতি কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। সমাজসেবার সেই মানসিকতা থেকে রেডিয়্যান্ট ফার্মার চেয়ারম্যান নাসের শাহরিয়ার জাহেদী এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন।
বলা প্রয়োজন, তিনি নিজেও একজন সংগঠক। বাফুফের নির্বাচনে তিনি সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে নির্বাচিত সহ-সভাপতি। তার শ্বশুর শাম্স-উল-হুদা ছিলেন একজন বরেণ্য ফুটবলার।
জাহেদী চান, খেলাধুলার মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল তারুণ্য গড়ে উঠুক। খেলার মধ্যে থাকলে সে মাদক-সন্ত্রাসের মতো অপাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে। তাছাড়া, আন্তর্জাতিকমানের ক্রীড়াশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি এখান থেকে ভালো খেলোয়াড় বের করতে চান, যারা অর্থিকভাবে সচ্ছল হবে আর দেশেরও সুনাম বয়ে আনবে। বাংলাদেশে তরুণরা এখন যে লেবেলে খেলছে, তাদের প্রত্যাশা তার চেয়ে উপরের লেবেলে যেন তারা খেলতে পারে।
এই একাডেমিতে বর্তমানে পাঁচজন প্রশিক্ষক (কোচ) রয়েছেন। তারা হলেন কাজী মারুফ হোসেন (প্রধান কোচ), মো. ইমদাদুল হক খান (সিনিয়র সহকারী কোচ), জাহিদ হাসান (সহকারী কোচ), আরিফুর রহমান পান্নু (গোলকিপিং কোচ) এবং আরিফুর রহমান লাল (সহকারী কোচ)। প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের ১৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
আগামীতে ভলিবল ও সাঁতারের জন্যে প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার পরিকল্পনা এই একাডেমির রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মেহেদি হাসান।