রাব্বি আল-আমিন ও ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
নীল আকাশে পেঁজা তুলোর মেঘ, প্রকৃতিতে শরতের এই বার্তা জানিয়ে দিচ্ছে- সনাতনিদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা সমাগত।
আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে সূচনা ঘটবে মূল পূজার। এ বছর দেবী দুর্গার আগমন ঘটবে ঘোড়ায় চড়ে, আর বিদায় নেবেন দোলা বা নৌকায়।
এরই মধ্যে যশোরের সাড়ে সাত শতাধিক পূজামণ্ডপে চলছে প্রতিমা তৈরি আর সাজ-সজ্জার কাজ। এগিয়ে চলেছে দুর্গোৎসবের যাবতীয় প্রস্তুতি। ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা।
এদিকে, সার্বিক নিরাপত্তা, উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা আয়োজনের ওপর জোর দিচ্ছেন নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
আয়োজকরা বলেন, চাঁচড়া বর্মনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে এবারই প্রথম এই অঞ্চলে সুবিশাল পরিসরে ১০১টি প্রতিমা নিয়ে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে, যা এলাকার ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘটনা।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর যশোরের আট উপজেলায় মোট ৭৩৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা গত বছরের চেয়ে ২৮টি বেশি।
মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। সময় কম তাই, পূজার বড় প্রস্তুতি প্রতিমা গড়ার কাজ চলছে মন্ডপে মন্ডপে। খড়-কুটা, ছন, মাটিসহ অন্যান্য উপাদান দিয়ে প্রতিমার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দু’এক দিনের মধ্যে রঙ আর সাজগোজ। যথা সময়ে প্রতিমা সরবরাহে রাতদিন ব্যস্ত ভাস্কররা।
যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের ভাস্কর শংকর মন্ডল বলেন, এবার ৩৭ টা প্রতিমা করেছি। সঠিক সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। তাই রাত-দিন কাজ করছি। এখন রঙের কাজ শুরু হবে। তারপরে সাজসজ্জা করে ঠিক সময়মতো ডেলিভারি দিতে হবে।
প্রতিমা ছাড়াও মন্ডপ এলাকায় প্যান্ডেল নির্মাণ ও অন্যান্য সাজসজ্জায় ব্যস্ত আয়োজকরা। প্রত্যাশা, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে এবারের দুর্গোৎসব সম্পন্ন করতে পারবেন। উৎসবের দিনগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ ও নিরাপত্তা চান।
এক মন্দিরে ১০১ প্রতিমা
বর্মণপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মণ বলেন, প্রতিবছর এখানে দুর্গাপূজা হয়। কিন্তু এবারের আয়োজনে বিশেষ আকর্ষণ ১০১টি প্রতিমা। দূর দুরান্ত থেকেও অনেক দর্শনার্থীদের মন্দিরে সমাগম ঘটবে বলেও আশাবাদ রাখেন তিনি।
গৃহবধূ শিপ্রা বর্মণ বলেন, ‘বিয়ে হওয়ার পর থেকে শ্বশুরবাড়িতে প্রতিবছরই দুর্গাপূজা দেখছি। কিন্তু এই প্রথমবার এমন বিশেষ আয়োজনে আমরা খুবই আনন্দিত। দুই মাসের পরিশ্রমে অধিকাংশ প্রতিমার নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। শুরু হচ্ছে রং ও সাজসজ্জা ‘
চাঁচড়া সর্বজনীন মন্দিরের সভাপতি তাপস বিশ্বাস বলেন, ‘এবারও আমাদের এলাকায় অত্যন্ত আনন্দ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পূজার দিনগুলো পার হবে। চাঁচড়া বামনপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে বিশেষ আয়োজনে এবার দুর্গাপূজা। এই প্রথম এখানে ১০১টি প্রতিমাসহ বিশাল পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে।’
স্থানীয়রা জানান, উৎসব উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন, জামাই ও দূর-দূরান্তের পরিচিত সকলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রস্তুতিও শেষপর্যায়ে। দুই-একদিনের মধ্যে রঙের কাজ শেষ হবে। এছাড়া, পুরোহিত ও ঢাকী বায়না করা শেষ হয়েছে এবং প্যান্ডেলের গেট ও মঞ্চ তৈরির কাজ পুরোদমে চলছে।
মন্দির কমিটির নেতারা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের আহ্বান জানান। সবাই মিলে শান্তিপূর্ণভাবে এই উৎসবের আনন্দ উপভোগের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তারা।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই দেশে হিন্দু ও মুসলিমদের উৎসবে পৃথক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় শিথিলতার প্রয়াস খুব একটা নেই বললেই চলে। ধর্মীয় ভিত্তিতে কাউকে বিভক্ত বা অন্য কোনো রাজনৈতিক অথবা কোনো গোত্র ভিত্তিতে বিভক্ত করা মোটেও হচ্ছে না। অন্যান্য অনুষ্ঠানে আমরা যে ধরনের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি, এটিও তেমন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সনাতনিদের এই বড় ধর্মীয় উৎসব যাতে নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর হয় এবং শঙ্কাহীনভাবে অব্যাহত থাকে, সেজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে যা যা করবার সবই করবো।’
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপংকর দাস রতন বলেন, ‘ডিজে নয়, শুদ্ধ সঙ্গ—ভক্তিগীতি বাজানোর ক্ষেত্রে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। প্রত্যেকটা মন্দিরকেন্দ্রিক হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান মিলিয়ে একটি সম্প্রীতি কমিটি নির্মাণ এবং সুশৃঙ্খলা পরিবেশে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হবে। এই পূজার আয়োজনটা যাতে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত সর্বজনীন উৎসবের রূপ লাভ করে, সেইক্ষেত্রে আহ্বান থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, দুর্গোৎসব চমৎকারভাবে উপভোগ করবো এবং এই আয়োজন সুন্দরভাবে সুসম্পন্ন হবে।’
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গোৎসব পালন করতে পারেন, সে জন্য সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। অতীতে প্রতিটি মণ্ডপে পাঁচশ’ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হতো, এবার তা বাড়িয়ে ছয়শ’ কেজি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাতের শেষভাগে বিচ্ছিন্ন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেনো না ঘটে, সেজন্য মণ্ডপ কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিশেষ নজরদারির আহ্বান জানানো হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পারাপার, মাদক, অস্ত্র কিংবা পটকাবাজির অনুপ্রবেশরোধে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুর্গোৎসবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পহেলা অক্টোবর থেকে মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহন বিশেষ তল্লাশির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সকল বৈধ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশে থেকে এই আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে সহায়তা করবে বলে আশা করছি।’
দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার আলোকসজ্জা সীমিত রাখার আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।