বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
(দ্বিতীয় পর্বের পর)
যশোরের চাঁচড়ায় ঐতিহাসিক শ্রীশ্রীদশমহাবিদ্যা মন্দিরে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকনকে শর্তসাপেক্ষে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলেও আস্তে আস্তে তারা পুরো মন্দিরটিকে নিজেদের কবজায় নিয়েছেন। মন্দির চত্বরে বসবাসকারীদেরকে উচ্ছেদ থেকে শুরু করে পুরো মন্দিরের যাবতীয় কাজে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্তারা।
এ নিয়ে সনাতনিদের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করলেও ইসকনের প্রভাবের কারণে কিছু বলতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটিকে ইসকনের কবল থেকে রক্ষা করা যাবে কি না তা নিয়ে খোদ সনাতনিদের মাঝেই সংশয় তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, মন্দিরের অধ্যক্ষ ও ইসকন নেতা অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাসের যৌন হয়রানি ও অসদাচরণের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা আত্মহত্যা করেছে। শিপ্রার ভাই পাপন আদালতে যে মামলা করেছেন তাতে তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, মন্দিরের পুরোহিত (প্রভু) অপার গোবিন্দ ও তার সহযোগীদের যৌন হয়রানি এবং ধারাবাহিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে শিপ্রা।
দশমহাবিদ্যা মন্দির কমিটির সভাপতি বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, ২০১৬ সালে ইসকন এখানে আসে। সেসময় বিমল রায়চৌধুরী, স্বপন ভট্টাচার্য্য, অপু কাপুড়িয়াদের অনুরোধে কিছু শর্তে ইসকনকে এখানে আসার সুযোগ দেওয়া হয়।
ঢাকা থেকে আসা ইসকনের পদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে তখন যশোরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অপু কাপুড়িয়ার বাড়িতে বৈঠকে বসেছিলেন দশমহাবিদ্যা মন্দির কমিটির সদস্যরাও। ঐতিহ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় মন্দির কমিটির সদস্যরা এখানে ইসকনকে প্রবেশ করতে দেওয়ার পক্ষে ছিলেন না। সে সময় বিমল রায়চৌধুরী এবং অন্যরা বলেছিলেন, প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এই মন্দিরে ওরা (ইসকন) এলে সংস্কার হবে, জমজমাট হবে। ইকসন একপাশে থাকবে, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের কাজে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। সাধারণ সনাতনিরা সেখানে দুর্গা, কালীসহ অন্যান্য পূজার আয়োজন করতে পারবেন।
সেসময় বিমল রায়চৌধুরীর মৌখিক প্রস্তাবে ইসকন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রয়োজনে তিন পুরুষ ধরে মন্দির চত্বরে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে বাইরে দুই কাঠা করে জমি কিনে দিয়ে পুনর্বাসন করা হবে, জানান বিশ্বনাথ দত্ত।
তিনি বলেন, দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর ইসকনের সাথে তাদের একটা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়। ইংরেজিতে লেখা সেই চুক্তিটি একজন শিক্ষক পড়ে শোনানোর পর মন্দিরের নেতারা তাতে সই করেছিলেন।
স্থানীয়দের দাবি, ইসকন সেখানে প্রবেশের পর কথাতো রাখেইনি, ধীরে ধীরে মন্দিরের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে। উল্টো ইসকন এখানে আসার আগে সাধারণ সনাতনিরা অবাধে যেভাবে মন্দিরে যাতায়াত ও পূজা-অর্চনা করতেন তাও সীমিত করে দেওয়া হয়। তারা আসার পর মন্দিরের প্রধান ফটক সাধারণ সময় বন্ধ রাখা শুরু হয়; নির্দিষ্ট পূজা ও উৎসব ছাড়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত থাকে। এমনকী পর্যায়ক্রমে এখান থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে তিনটি পরিবারকে।
মন্দির চত্বরে বসবাসকারী মৌসুমি ঘোষ, সুরঞ্জন বিশ্বাস, শুভ ঘোষ, মনি বিশ্বাসসহ পাশের বাসিন্দা কয়েকজন সনাতনি অভিযোগ করেছেন, দশমহাবিদ্যা মন্দিরের পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন ইসকনের হাতে। মন্দিরটিতে যে বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে তা ইসকন নিজেদের নামে করে নিয়েছে। পানির লাইনের নিয়ন্ত্রণও তাদের হাতে। দশমহাবিদ্যা মন্দিরের দানবাক্স ভরে গেলে ইকসনের লোকেরা নিয়ে ‘প্রভু’ অপার গোবিন্দের হাতে তুলে দেন। তার একটি টাকাও মন্দিরের কাজে ব্যবহার করার সুযোগ পায় না পরিচালনা কমিটি।
এমনকী সরকারি-বেসরকারি দান-অনুদান দশমহাবিদ্যা মন্দিরের নামে বরাদ্দ হলেও তা হাতিয়ে নেন এই ‘প্রভু’। সে কারণে ঐতিহাসিক এই মন্দিরটিতে আদতে পরিচালনা কমিটির আর কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয় সনাতনিদের।
মন্দির চত্বরে বংশপরম্পরায় বসবাসকারীদের অভিযোগ, মন্দিরটিতে ইসকনের সাধারণ পূজারির বাইরে অনেক অপরিচিত যুবকদের আনাগোনা রয়েছে। তারা কোথা থেকে আসে আবার কোথায় চলে যায়, কেউ জানে না। এসব যুবক স্থানীয় নাকি অন্য কোনো জেলা থেকে এসেছেন তা-ও অজানা। এমনকী তারা আদৌ বাংলাদেশি কি না তা নিয়েও সংশয় আছে সাধারণ সনাতনিদের।
মন্দির চত্বরে বসবাসকারীদের অভিযোগ, ইসকনের তৈরি করা ছোট ছোট ঘরে এসব অপরিচিত যুবক রাতযাপন করেন। তাদের কেউ চলে গেলে আবার অন্যজন আসেন। এসব কারণে তারা স্ত্রী-কন্যা সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গত শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মন্দির চত্বরে অবস্থানকালে সেখানে প্রবেশ করেন শান্ত রায় নামে এক যুবক। তিনি জানান, তার বাড়ি পঞ্চগড় জেলা সদরের হাড়িভাসা গ্রামে। যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে এইসএসসির শিক্ষার্থী তিনি। থাকেন ইসকনের তত্ত্বাবধানে। এজন্য তিনি মাসে আড়াই হাজার টাকা দেন। কিন্তু, ‘প্রভু’ টাকা গ্রহণের কথা অস্বীকার করেছেন।
নিজের পরিচয়পত্র আছে কি না জানতে চাইলে শান্ত তা দেখাতে ব্যর্থ হন। তিনি দাবি করেন, স্কুল সার্টিফিকেট দেখিয়ে তিনি কলেজে ভর্তি হয়েছেন। সেই সার্টিফিকেটের কোনো কপিও তিনি দেখাতে রাজি হননি। কথা বলার এক পর্যায়ে দ্রুত ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েন শান্ত।
‘প্রভু’ অপার গোবিন্দ ‘আত্মগোপনে’ যাওয়ার পরই মন্দিরটিতে আগমন ঘটে সুমন বিশ্বাসের। ইসকনে তার নাম সুমুখ শ্যামহরিদাস। অপার গোবিন্দের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, অভয়নগরের রামসরা ধাম থেকে তাকে এখানে ২১ সেপ্টেম্বর পাঠানো হয়েছে। অপার গোবিন্দ কোথায় আছেন তা তিনি জানেন না।