আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরার মিষ্টির নাম শুনলেই জিভে জল আসে না-এমন লোক খুঁজে পাওয়া দায়। জেলার সীমান্ত ছাড়িয়ে দেশের সীমানা পেরিয়ে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জায়গা করে নিয়েছে উপকূলীয় এই জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন।
শতবছরের সুনাম, খামারিদের নিরলস শ্রম এবং খাঁটি ছানার সুস্বাদু ছোঁয়ায় সাতক্ষীরার মিষ্টির কদর ছড়িয়ে পড়েছে কানাডা, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।
সাতক্ষীরার মিষ্টির ইতিহাস শুরু ব্রিটিশ আমলে হাজারি ময়রার হাত ধরে, যা সেসময়েও লন্ডনে যেতো। পরবর্তীতে সুশীল ময়রা, কেষ্ট ময়রা ও ফকির ময়রার হাত ধরে এ অঞ্চলের মিষ্টি শিল্প অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। বিশেষ করে ফকির ময়রার হাত ধরেই খ্যাতি পায় বিশ্ববিখ্যাত ‘প্যাড়া সন্দেশ’।
মূলত খাঁটি ছানার প্যাড়া সন্দেশ ও সন্দেশই সাতক্ষীরার প্রধান ঐতিহ্য। এই মিষ্টি শিল্পের মূল ভিত্তি হলো জেলার উদ্বৃত্ত দুধ।
জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই লাখ ২৫ হাজার ৮৩০ মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রকৃত উৎপাদন হয়েছে দুই লাখ ৮৭ হাজার ৫৪১.১৩ মেট্রিক টন। তালার জিয়ালা ও খলিশখালিসহ সদর ও কালিগঞ্জের বিপুল উদ্বৃত্ত দুধ ও উন্নত ফ্যাটের কারণে এ অঞ্চলের মিষ্টির স্বাদ অতুলনীয়।
সাধারণ মিষ্টির মেয়াদ কম হলেও নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশ সাধারণতাপমাত্রায় ১০-১৫ দিন এবং ফ্রিজে মাসের পর মাস ভালো থাকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২০২২ সাল থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কানাডায় নিয়মিত যাচ্ছে নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশ, সন্দেশ, ল্যাংচা ও কাঁচাগোল্লা। বছরে গড়ে প্রায় এক টন মিষ্টি মাইনাস ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ফ্রোজেন করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর হয়ে কানাডায় পাঠানো হচ্ছে।
‘দই সন্দেশ’-এর ম্যানেজার সাদ বলেন, আমাদের এখান থেকে বিদেশগামী ক্রেতাদের মাধ্যমে বিশেষ করে রসগোল্লা এবং প্যাড়া সন্দেশ-এই দুটি মিষ্টি সবচেয়ে বেশি সৌদিআরবে নিয়ে যাওয়া হয়।
‘সাগর সুইটস’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেহেদী হাসান তাজ বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পাশাপাশি সাতক্ষীরার নলেন গুড়ের প্যাড়া- সন্দেশ বিদেশে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। ২০২২ সাল থেকে ভেন্ডর হিসেবে আমরা কানাডায় গড়ে প্রতি বছর এক টনের মতো মিষ্টি পাঠাচ্ছি। নলেন গুড়ের বিশেষ ফ্লেভারের কারণে আমাদের এই মিষ্টিটি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয় এবং এটি সাতক্ষীরার জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পূর্ণ দাবি রাখে। সাতক্ষীরায় ফ্রোজেন আইটেমের জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রসেসিং ইউনিট না থাকায় জেলাভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন ও সরাসরি পণ্য বিক্রির সহজ আন্তর্জাতিক মাধ্যম চালুর দাবি জানাচ্ছি।
প্রবীণ সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি বলেন, সাতক্ষীরার মিষ্টির মূল ইতিহাস ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু। সে সময় হাজারি ময়রার মিষ্টির দোকান এতোটাই খ্যাতনামা ছিল যে, তার তৈরি মিষ্টি ইংল্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হতো। পরবর্তীতে সুশীল ময়রা ও কেষ্ট ময়রা মিষ্টির বাজার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাদের পর ফকির ময়রার হাত ধরে বিশেষ করে ‘প্যাড়া সন্দেশ’ দেশজুড়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে। এ ছাড়া কেষ্টা ময়রার সন্দেশও তার নিজস্ব ফ্লেভারের জন্য দারুণ জনপ্রিয়। পরবর্তীতে পূর্ণ সাহা ও বর্তমানে তার ছেলে কীর্তি সাহা ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ধারা ধরে রেখেছেন।
তিনি আরো বলেন, সাতক্ষীরার আসল ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি বলতে মূলত খাঁটি ছানার সন্দেশ এবং নলেন গুড়ের প্যাড়া সন্দেশকেই বোঝায়। এর পাশাপাশি একসময় প্রতাপনগর ও নয়াবেকি হাটে ছানার তৈরি লাল রঙের ‘মালফো’ নামের বিশেষ একটি বড় মিষ্টি খুব নাম করেছিল, যা এখন আর তেমন দেখা যায় না। অন্যদিকে বর্তমানে বাজারে থাকা ‘ভাগ্যকূল’ বা ‘সাগর’ সাধারণ মিষ্টি তৈরি করে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ এম মান্নান কবির বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি। দুই লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টনের জায়গায় প্রায় দুই লাখ ৮৭ হাজার মেট্রিক টন দুধ উৎপাদিত হয়েছে। চাহিদার তুলনায় দুধ উদ্বৃত্ত থাকায় এবং গুণগতমান ভালো হওয়ায় সাতক্ষীরার মিষ্টির সুনাম আজ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, উৎপাদনের দিক দিয়ে দুগ্ধ খাতে সাতক্ষীরা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। প্রতিদিন রাতে ঢাকার গাড়িতে বিপুল পরিমাণ মিষ্টি দেশের নানা প্রান্ত চলে যায়। তবে মিষ্টি শিল্পে ব্যাংক লোন বা সরকারি সহায়তার সুযোগ নেই। আমাদের দাবি, এখানকার ঐতিহ্যবাহী প্যাড়া সন্দেশকে দ্রুত জিআই স্বীকৃতি দেওয়া হোক।