যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

৫ অক্টোবর: যবিপ্রবির ইতিহাসে কালো রাত

রুহুল আমিন

, যবিপ্রবি

প্রকাশ : সোমবার, ৫ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
৫ অক্টোবর: যবিপ্রবির ইতিহাসে কালো রাত

২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর। রাত তখন আনুমানিক ১১টা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) প্রধান ফটকের সামনে হঠাৎ এসে থামে তিন থেকে চারটি কালো মাইক্রোবাস। গাড়ি থেকে নেমে আসে মুখোশধারী কয়েক ব্যক্তি। ফটকে দায়িত্ব পালনরত দুই আনসার সদস্যকে মারধর করে তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় আগন্তুকরা।

এর কিছুক্ষণ পরই একের পর এক বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মসিয়ূর রহমান হল। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। রাতারাতি বদলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ।

সেই রাতটি আজও যবিপ্রবির ইতিহাসে একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের আধিপত্যের দ্বন্দ্বের জেরে ওই রাতে শহীদ মসিয়ূর হলে হামলা, লুটপাট ও শিক্ষার্থীদের মারধরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে ঘটনাটি ‘হল ডাকাতি’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়।

রাতে হলের কক্ষগুলোতে তাণ্ডব

প্রত্যক্ষদর্শী ও তৎকালীন নিরাপত্তাকর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই রাতে তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের অনুসারীসহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন বহিরাগত মুখে মাস্ক ও কালো কাপড় বেঁধে এবং আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হলটিতে ঢোকে।

হলে ঢোকার পর তাদের বিরুদ্ধে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগও ওঠে। এরপর একে একে বিভিন্ন আবাসিক কক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের লকার ভেঙে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা নিয়ে যায় তারা।

সেই রাতে অন্তত ৫০টি কক্ষে তল্লাশি ও লুটপাট চালানো হয়। প্রায় তিন শতাধিক মোবাইল ফোন এবং শতাধিক ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য প্রায় ৪১ লাখ টাকা বলে তখন দাবি করা হয়েছিল। তবে ঘটনাটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা।

বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা

হামলার সময় হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। এতে তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী আহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। তৎকালীন এফএমবি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর অভিযোগ ছিল, তাকে লোহার পাইপ দিয়ে মারধর করে পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়।

আকস্মিক আক্রমণে আতঙ্কিত অনেক শিক্ষার্থী তখন জীবন বাঁচাতে লুঙি পরে, খালি গায়ে হলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে নিচে লাফ দেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। কেউ কেউ হল থেকে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডরমিটরিতে গিয়ে আশ্রয় নেন। সেই রাতের আতঙ্ক দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের মনে ছাপ রেখে যায়।

কেন ঘটেছিল সেই ঘটনা

ঘটনার পেছনে ছিল তৎকালীন যবিপ্রবি ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার মধ্যকার রাজনৈতিক বিরোধ, এমনটাই উঠে আসে সে সময়কার বিভিন্ন বক্তব্য ও অভিযোগে। তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান শুরুতে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাইফুর রহমানের রাজনৈতিক বলয়ের অনুসারী ছিলেন।

পরে ২০১৭ সালের দিকে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক গ্রুপ বদল করে তখনকার যশোর সদর আসনের সংসদ সদস্য কাজী নাবিল আহমেদ এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারী হন। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ তীব্র হয়।

এ বিরোধের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন টেন্ডার ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিষয়ও জড়িয়ে ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় সুব্রত গ্রুপ শামীম গ্রুপকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে। এরপর ক্যাম্পাসে ফিরে আসা এবং শহীদ মসিয়ূর হলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করেই ৫ অক্টোবরের হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, ঘটনাটি শুধু একই সংগঠনের দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধ ছিল না; এর সঙ্গে হলের নিয়ন্ত্রণ, ক্যাম্পাসে আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নও জড়িয়ে ছিল।

প্রশাসনের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর ছিল

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। হল আক্রমণ ও লুটপাটের অভিযোগে সাত শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তাদের এবং অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তবে পরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করে, সাময়িক বহিষ্কারের পরও অভিযুক্তদের কেউ কেউ নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হননি।

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে। তবে সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়েও পরে অভিযোগ ওঠে। তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ কমিটির কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘ভুয়া আহত শিক্ষার্থীর তালিকা’ তৈরি করে ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তবে এসব অভিযোগের সবকটির বিষয়ে আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

তদন্ত কমিটি হয়েছিল, বিচার কতদূর

ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এত বড় একটি ঘটনার যথাযথ বিচার হওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কার্যকর বিচার সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তবে তার বক্তব্যও একটি ব্যক্তিগত দাবি; এর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার নথি পুনরায় পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

‘আমরা কোনো কিছু লুট বা ছিনতাই করিনি’ বলে হল ডাকাতির অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছিলেন তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান। তার ভাষ্য ছিল, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের কোনো কিছুই লুট বা ছিনতাই করি নাই। আমরা যদি এমন কিছু করে থাকতাম, তাহলে ওখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ পুলিশ বাহিনী উপস্থিত ছিল। তারা নিশ্চয় আমাদের এমন কিছু করতে দিত না।’

তিনি আরও দাবি করেছিলেন, কারও কোনো কিছু লুট বা ছিনতাই হয়ে থাকলে থানায় অভিযোগ করার কথা। তার জানা মতে, তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ করা হয়নি। অর্থাৎ, একদিকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মালামাল লুটের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্ত পক্ষের সরাসরি অস্বীকার, ঘটনাটির এই দ্বৈত বয়ানের মীমাংসা হয়নি আজও।

প্রশাসন তখন যা বলেছিল

ঘটনার সময় শহীদ মসিয়ূর হলের প্রভোস্ট ছিলেন অধ্যাপক ড. ইকবাল কবির জাহিদ। তিনি ঘটনার দিন ঢাকায় ছিলেন বলে জানান। হলে শামীম গ্রুপের উপস্থিতির বিষয়ে তিনি আগে অবগত ছিলেন না বলেও দাবি করেন।

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তার বিষয়ে তিনি বলেন, আনুমানিক ৯০ থেকে ৯৫ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন এবং মেডিকেল সার্টিফিকেটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে নিয়ম অনুযায়ী তাদের সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক শেখ মিজানুর রহমান জানান, ঘটনার রাতে আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন এবং পরে হলে উপস্থিত হন। সেখানে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ছাত্রলীগের সুব্রত গ্রুপ হল থেকে বের হয়ে গেছে এবং শামীম গ্রুপ হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

অন্যদিকে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ঘটনাটিকে ছাত্ররাজনীতির ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে হল থেকে বের করে দিয়েছিল। পরবর্তীতে সেই গ্রুপ আবার হলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো দায় নেই বলেও দাবি করেছিলেন।

ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন, প্রায় এক মাস শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়েছিল।

বিচারহীনতার আট বছর

২০১৭ সালের সেই রাতের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় নয় বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজন্ম বদলেছে, ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলেছে। কিন্তু ৫ অক্টোবরের ঘটনা এখনও যবিপ্রবির ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। কারও কাছে এটি ছাত্ররাজনীতির অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতি, কারও কাছে এটি আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রতীক। আবার কারও কাছে এটি ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা ও হলের নিয়ন্ত্রণ দখলের লড়াই। কিন্তু এত বছর পরও একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে, সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, কারা হামলা চালিয়েছিল, কারা লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং সেই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়েছিল?

বর্তমান প্রশাসন যা বলছে

যবিপ্রবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন এবং মামলার কাগজপত্র পর্যালোচনা করতে হবে। সবকিছু জেনে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বর্তমান প্রশাসনের এই বক্তব্য নতুন করে সেই পুরনো ঘটনার নথিপত্র সামনে আনার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

ইতিহাসের দায়

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে রাতের আঁধারে মুখোশধারীদের প্রবেশ, বিস্ফোরণ, গুলি, শিক্ষার্থীদের মারধর, কক্ষ ভাঙচুর এবং মূল্যবান সামগ্রী লুটের অভিযোগ, যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই ভয়াবহ ঘটনা। ৫ অক্টোবর তাই কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দুই পক্ষের সংঘাতের স্মৃতি নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, ক্যাম্পাস রাজনীতি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও স্মারক। সেই রাতের সত্য পুরোপুরি জানতে হলে প্রয়োজন ঘটনার সময়কার তদন্ত প্রতিবেদন, মামলা ও আদালতের নথি, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য নতুন করে যাচাই করা। কারণ ইতিহাস শুধু মনে রাখার জন্য নয়, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্যও জরুরি, মনে করেন পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)