সুবর্ণভূমি ডেস্ক
দিন পেরুলোই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট নির্বাচনি রূপরেখা ঘোষণার পর থেকেই দেশের শহর, নগর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, পাড়া-মহল্লা সর্বত্র জোর আলোচনা শুরু হয় বহু আকাঙ্ক্ষিত এই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। নানা সংশয় থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন একই বছরের ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণা করে। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনি প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে নির্বাচনের যাবতীয় কর্মকাণ্ড প্রায় সব সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এখন শুধু ভোটগ্রহণের পালা।
সারাদেশের মতো যশোরের ছয়টি আসনেও ভোটের হাওয়ায় উড়ছে এই অঞ্চলের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। আমাদের বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী সোমবার দিনভর ঘুরেছেন যশোরের বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন, গ্রাম। সাধারণ মানুষের ভোট নিয়ে চিন্তা-ভাবনার কথা তুলে এনেছেন আমাদের পাঠকদের জন্যে।
যশোর সদরের নওয়াপাড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরেছেন আমাদের স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ মোস্তফা হাসমী। তিনি জানাচ্ছেন সেখানকার ভোটের পরিবেশ, মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টি-
দীর্ঘ বিরতির পর একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
এলাকায় হাট-বাজার ও চায়ের দোকানগুলোতে এখন প্রধান আলোচনার বিষয় নির্বাচন। অনেক তরুণ জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে উচ্ছ্বসিত। তবে, ভোটারদের কাছে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।
বাহাদুরপুর, বাঁশতলা, আড়পাড়া, বাহাদুরপুর স্কুলপাড়া, তেঁতুলতলা এলাকার ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণ এবং সুলভে নিত্যপণ্য প্রাপ্তি, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, সন্ত্রাসমুক্ত গ্রাম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত পরিবেশ।
বাহাদুরপুর বাঁশতলা এলাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে ইকরাম হোসেন বলেন, ‘আগে ভোট দেওয়ার পরিবেশ ছিল না। এবার ভোট দিতে পারবো। ভোটের মাধ্যমে যারাই সরকারে আসুক, আমার প্রত্যাশা তারা এলাকার উন্নয়ন, সন্ত্রাস চাঁদাবাজমুক্ত পরিবেশ উপহার দেবে।’
লস্করপাড়ার রাজমিস্ত্রি জাহিদ হাসান ও মিন্টু বিশ্বাস বলেন, বিগত পনের বছর ভোটের মাঠে গেলেই বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার পরিবেশ পরিবর্তন হয়েছে। তাই ভোট দিতে যাবেন তারা। রাজনৈতিক দল কোনো বিষয় না, যে দল ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা যেন এলাকার উন্নয়ন, রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে, সেটাই চান এই দুই ভোটার।
তেঁতুলতলা এলাকার বাসিন্দা রিমা বেগম ও আফরোজা বেগম জানিয়েছেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে মানুষ ভোট চাইতে আসছে। যে যোগ্য বলে মনে হবে, তাকে ভোট দেবেন। তারা এবার আশাবাদী ইউনিয়ন পর্যায়ে মহিলাদের সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা সরকার থেকে পাবেন।
এই এলাকার তরুণ ভোটার সাব্বির খান, জয়নাল ইসলাম, রিফাতসহ কয়েকজন বলেন, তারা এবারই প্রথম ভোটার হয়েছেন। ভোটার হয়ে ভালো লাগছে জানিয়ে তারা যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দেবেন বলে আশা করছেন।
আড়পাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক মোল্লা বলেন, ‘ভোট দিয়ে কী আর হবে? কোনো সরকারের কাছ থেকে কৃষকরা সুবিধা পায় না। সকল দলের লোকজনই বাড়ি আসছে ভোট চাইতে। যে প্রার্থী কৃষকদের কথা ভাববে, বীজসহ কৃষি উপকরণের সহজলভ্য এবং ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবে- তাকেই ভোট দেবো।’
বাহাদুরপুর স্কুলপাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠ মনু মিয়া বলেন, গ্রামের মানুষ ‘ভিলেজ পলিটিক্স’ বোঝে; কিন্তু রাজনীতি বোঝে না। নতুন সরকার যে দলেরই হোক, তারা যেন সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত একটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে থাকতে পারে, সেই ব্যবস্থা করা দরকার।
যশোর সদরের রামনগর ইউনিয়নে নিরাপত্তা ও উন্নয়নই সেখানকার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা- এমনটিই জানিয়েছেন আমাদের স্টাফ রিপোর্টার ইমরান হোসেন রাজ। রামনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তিনি এই বিষয়টি জানতে পেরেছেন।
রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও এই এলাকার অধিকাংশ ভোটারের প্রত্যাশা- নিরাপদ জীবনযাপন, কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম আব্দুল মমিন বলেন, ‘এমন একজন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি ক্ষমতায় এসে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং দুর্নীতি কমাবেন। বিভিন্ন সময় হামলা, মামলার শিকার হলেও সুষ্ঠু বিচার যাতে পাওয়া যায়।’
কৃষক শৈলেন সরকার বলেন, ‘আমরা এমন একজনকে চাই, যার সময় দেশে শান্তি থাকবে। আমরা যেন নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারি, গরু-বাছুর নিরাপদে রাখতে পারি- এটাই আমাদের চাওয়া।’ প্রার্থীর সংখ্যা বা প্রতীক সম্পর্কে তার পরিষ্কার ধারণা নেই, তবে ধানের শীষ, লাঙ্গলসহ কয়েকটি প্রতীক তিনি দেখেছেন।
কৃষক তফসির জানান, ভালো প্রার্থীকে দেখে-শুনে ভোট দেবেন তিনি। এলাকার মানুষের পাশে আগে কে ছিল, চলাফেরা কেমন এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান তিনি।
সৌরভ হোসেন বলেন, এবারের নির্বাচনে তার আগ্রহ কম। নির্বাচন একতরফা মনে হলে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা থাকে না। তবে ভোট দিলে তিনি লাঙ্গল প্রতীককে সমর্থন করার কথা বলেন।
ব্যবসায়ী হৃদয় হোসেনের ভাষ্য, ‘এবারকার নির্বাচন বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে। বিগত দিনগুলোতে একতরফা ভোট দেখেছি। এবার দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীষ দুই প্রতীকের প্রচারণা বেশি চোখে পড়ছে।’ উন্নয়নমূলক কাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভোট দেওয়ার কথা জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শশাঙ্ক পাল বলেন, এলাকার উন্নয়ন, ভালো আচরণ ও তরুণদের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারবে এমন প্রতিনিধিই সংসদে দেখতে চান তিনি। তার অভিযোগ, উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না পেয়ে হতাশায় ভুগছেন।
তরুণ ভোটার মোহাম্মদ অনিক বলেন, ‘১২ তারিখের নির্বাচন দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা চাই এমন সরকার আসুক, যারা যশোরকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে এবং সন্ত্রাস ও মাদকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে।’
আমাদের স্টাফ রিপোর্টার রাসেল মাহমুদ ঘুরেছেন যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অন্ধ মোহ নয়, বরং সৎ, যোগ্য এবং দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থাকা প্রার্থীকেই নির্বাচিত করতে চান সাধারণ মানুষ। তারা এবার উন্নয়নের কারিগর হিসেবে এমন একজনকে দেখতে চান, যিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের সাথী হবেন।
শহরের পালবাড়ি মোড়ের বেসরকারি চাকরিজীবী মওদুদ আহম্মেদ বলেন, ‘দল বুঝি না, আমরা চাই একজন নির্লোভ মানুষ, যিনি ক্ষমতায় গিয়ে সাধারণের হক মেরে খাবেন না।’
শহরের বড়বাজারের কাঁচামাল বিক্রেতা বোরহান উদ্দীন জানান, যশোরকে একটি আধুনিক ও তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়তে সুশিক্ষিত ও উন্নয়নকামী নেতার বিকল্প নেই।
যশোর-৩ আসনে এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী হলেন বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত ও জামায়াতের মো. আব্দুল কাদের।
এছাড়াও হাতপাখায় মো. শোয়াইব হোসেন, লাঙ্গলের মো. খবির গাজী, কাস্তে মার্কায় রাশেদ খান ও চশমা মার্কায় মো. নিজামউদ্দিন অমিত এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সন্ত্রাসমুক্ত যশোর গড়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো বিষয়গুলো এবার প্রধান নির্বাচনি ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ভোটাররা প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের প্রত্যাশা, তারা যেন নির্বাচনের পরে সাধারণ মানুষকে ভুলে না যান।
আমাদের স্টাফ রিপোর্টার গোলাম মোস্তফা কথা বলেছেন যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনের সাধারণ মানুষের সঙ্গে। তিনি জানান, এ অঞ্চলে সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতাদের তেমন একটা বিশ্বাস করতে চায় না। আশির দশক থেকে ভবদহের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রী এমনকী সরকার প্রধানের ফুলঝুরি বক্তব্য শুনতে শুনতে ক্লান্ত। ভোটের আগে সবাই ভবদহের সমাধানের আশ্বাস দেয়। কিন্তু বিজয়ের পর তারা ভবদহকে সোনার ডিম পাড়া হাঁস বানান। ভবদহ সমস্যার সমাধানের দাবি তোলায় তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বিক্ষুব্ধ এসব মানুষ নেতা নির্বাচনে ভোট দিতে আগ্রহ দেখাননি।
কপালিয়ার ঘোষবাড়ি এলাকার ফিরোজের চায়ের দোকানেই এসব কথা বলছিলেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, ‘ভোটের রাজনীতিতে কেউ তেমন জড়াতে চায় না। তবে, স্থানীয় নেতাদের কারণে এবার ভোট দিতে যেতে হবে। ভোট কিন্তু হিসেব করেই দিতে হবে।’
সিরাজুল ইসলাম নামে পল্লী বিদ্যুতের কর্মী জানান, ভবদহের সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার যাওয়ার পর সবাই ভুলে গেছে।
আব্দুস সাত্তার জানান, এখানকার অর্ধেক ভোটার হিন্দু। তারা যাকে ভোট দেবে তিনিই যাবেন সংসদে। মূলত হিন্দু ভোটাররা মণিরামপুর-৫ আসন নির্বাচনের মূল্যায়নে ভূমিকা নিয়ে থাকে। যেহেতু এবারের নির্বাচনে নৌকা নেই, তাই তারা ধানের শীষে ভোট দিতে পারেন।
মণিরামপুর মোট ভোটার সংখ্যা চার লাখ দশ হাজার ৪২৭। যার মধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৩৬।
শহিদুল ইসলাম নামে ভবদহ এলাকার আরেক ভোটার জানান, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতারা এলাকাছাড়া। ফলে হিন্দু ভোটাররা ভোটের মাঠে যাবে বলে মনে হয় না। আর যদি ভোটের মাঠে যায়, তাহলে ধানের শীষ ছাড়া অন্য কোথাও ভোট দেবে না।
আনিসুর রহমান নামে এক ভোটার জানান, মণিরামপুরের ভোট তিনভাগে বিভক্ত। ধানের শীষ, কলস এবং দাঁড়িপাল্লা। যেহেতু আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই, সেখানে ধানের শীষ জিতবে। সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কালিবাড়ি বাজার বয়োজ্যেষ্ঠ বাবুরাম সরকার জানান, ভোট দিতে যাবেন কি না তা ঠিক করেননি। তারপর নৌকা ছাড়া তিনি কোনোদিন অন্য কোনো প্রতীকে ভোট দেননি। এবার যদি কেন্দ্রে যান, তবে কীসে ভোট দেবেন, মনস্থির করেননি।
মোস্তাফিজুর রহমান নামে স্থানীয় এক দোকানি বলেন, ‘মণিরামপুরের মানুষ বিএনপি বলতে শহীদ ইকবালকে বোঝেন। সেখানে সেই ইকবাল ভাই ধানের শীষ প্রতীক পাননি। ক্ষোভ একটা রয়ে গেছে। তারপরও তারা ধানের শীষ প্রতীকেই ভোট দেবো।’
এবার নির্বাচনে মণিরামপুর আসনে ছয় প্রার্থী লড়াই করছেন। তারা হলেন- ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে অ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে রশীদ আহমাদ, ‘হাতপাখা’ প্রতীকে জয়নাল আবেদীন টিপু, ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে এমএ হালিম, ‘কলস’ প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শহীদ মো. ইকবাল হোসেন ও ‘ফুটবল’ প্রতীকে কামরুজ্জামান।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা- চৌগাছা) আসনে সাধারণ ভোটাররা বলেছেন, তারা দল দেখেই ভোট দেবেন। দলের যে প্রার্থী, সে ভালো হোক কিংবা খারাপ- প্রতীকই হচ্ছে প্রধান কথা- এমন কথা উঠে এসেছে বিশেষ প্রতিনিধি জহর দফাদারের সরেজমিনে।
তবে, যাকে তারা ভোট দেবেন, তিনি যেন এই এলাকারই সন্তান হয়, সেটি বিবেচনায় রাখবেন। প্রার্থীকে সৎ, শিক্ষিত, সাধারণ মানুষের কথা শোনেন, সংসদে তাদের কথা বলা এবং এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন- তেমন প্রার্থী তাদের পছন্দ।
ঝিকরগাছা উপজেলার মাগুরা ইউনিয়নের কায়েমকোলা বাজারের চা দোকানি বিপুল হোসেন। তিনি বলেন, প্রার্থীকে সৎ হতে হবে, ভালো মানসিকতার লোক যে কি না সামাজিকভাবে পরিচিত, তেমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া উচিৎ।
এই এলাকার ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি প্রান্ত হোসেন ভোটার হওয়ার পর এবারই ভোট দেবেন। তিনি বলেন, ‘যাদের পরিচিতি আছে- আমরা যাকে চিনি, তাদের মধ্য থেকেই যোগ্যকে বেছে ভোট দেবো। এই আসনে দুইজন নতুন প্রার্থী রয়েছেন, দুইজনই অল্পবয়সী, লেখাপড়া জানে শুনেছি। কিন্তু তাদের এই এলাকায় কোনো কর্মী নেই, নির্বাচনি অফিসও নেই। তাদের আমরা আগে কখনো দেখিনি। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় তাদের বিষয়টি আমরা ভাববো না। এবার দাঁড়িয়েছে, পরিচিতি পাক, মানুষের জন্যে কাজ করুক।’
বড়কুলি গ্রামের ফিরোজ হোসেন একজন প্রবাসী। সম্প্রতি দেশে এসেছেন। ভোটের পরে ফের চলে যাবেন। কী কী গুণ থাকলে একজন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া যায়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসলে ভোটের সময় যেসব রঙ-বেরঙের প্রার্থী আসেন ভোট চাইতে, তাদের দিয়ে আসলেই কি সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয়?- উল্টো প্রশ্ন করেন তিনি। এখন যারা ভোট চাইতে আসছেন, অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন- ভোটে জিততে পারলে তাদের আর পেছনের কথা মনে থাকে না। নিজেদের বাড়ি-গাড়ি, জমি-জমা আর সম্পদের পাহাড় গড়তে গড়তে সময় পার হয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রবাসীরা বাইরে কতো কষ্ট করে দেশে টাকা পাঠাই। আর ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা এই ভোট নেওয়া মানুষ নেতা হয়ে সেই টাকা হাপিস করে, বিদেশে নিজেদের আরাম-আয়েশে ব্যয় করে। তবুও তো ভোট দিতে হবে। সেই মানুষটাকেই নির্বাচিত করা দরকার যিনি ভালো মানুষ, পরের সম্পদ লুট করবে না, মানুষের সাথে যার নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হয়, এই এলাকার ভালোমন্দের সঙ্গে সবসময়ই ছিল, তেমন মানুষকেই নির্বাচিত করা উচিৎ।’
চৌগাছা বুড়িন্দিয়া এলাকার মাহবুব আলী বলেন, ‘একজন ভদ্র, সৎ মানুষ যাকে আমরা কাছে পাবো- তেমন মানুষকেই ভোট দিতে চাই। এই আসনে দলের থেকেই প্রার্থী বেশি। কয়েকটা ছোট দল থেকেও প্রার্থী হয়েছে। আমরা পাড়ার লোকজন এক জায়গায় বসে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেবো।’
মনোহরপুর এলাকার বাসিন্দা নরসুন্দর রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আসলে কাকে ভোট দেবো, সেই বিষয়টি খুব গোপন। আমি চাই গরিবের বন্ধু, ভদ্র, কথাবার্তা আচার-আচরণ যার ভালো, তেমন মানুষ নির্বাচিত হোক। যে মানুষটি আমাদের এলাকা মাদক-সন্ত্রাসমুক্ত করতে সোচ্চার থাকবেন, তাকেই নির্বাচিত করা উচিৎ।’
ফুলবাড়ী গ্রামের কৃষিজীবী মোমিনউদ্দিন বলেন, ‘নতুন কাউকে আমরা ভোট দেওয়ার পক্ষে না। তারা পরীক্ষা দিক। পুরনোদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত করা উচিৎ।’
‘সৎ-যোগ্য প্রার্থী বোঝা যায় নির্বাচিত হওয়ার পরেই’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, তখন রাষ্ট্রীয় যেসব ভাতা দেওয়া গরিবদের, সেটি তিনি বণ্টন করেন, না পুরোটাই মেরে দেন।
তবে রুবেল রানা নামে এক যুবক বলেন, ‘আমি দল দেখেই ভোট দেবো। আমার দলের প্রার্থী খারাপ হোক কিংবা ভালো, তাকেই নির্বাচিত করবো।’
ঝিকরগাছার হোসনেআরা পুুতুল নামে এক গৃহবধূ জানান, তার স্বামী একটি দলের পক্ষে নির্বাচনে ক্যাম্পেইন করছেন। কিন্তু তিনি সেই দলের প্রার্থীকে পছন্দ করেন না। ভোট দেওয়ার সময়ও এই বিষয়টি মাথায় থাকবে। সেক্ষেত্রে তিনি দলকেই প্রাধান্য দেবেন।
যশোর-২ (ঝিকরগাছা-চৌগাছা) আসনে লড়ছেন আটজন। তারা হলেন, বিএনপির (ধানের শীষ) সাবিরা সুলতানা, জামায়াতের (দাঁড়িপাল্লা) মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দীন ফরিদ, ইসলামী আন্দোলনের (হাতপাখা) মো. ইদ্রিস আলী, বাসদের (মই) ইমরান খান, বিএনএফের (টেলিভিশন) মো. শামসুল হক এবং এবি পার্টির (ঈগল) রিপন মাহমুদ। এছাড়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহুরুল ইসলাম ঘোড়া এবং মো. মেহেদী হাসান ফুটবল প্রতীক পান। এরমধ্যে চৌগাছা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জহুরুল ইসলাম মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেছিলেন। যদিও জেলা রিটার্নিং অফিসার সেইসময় জানান, তিনি কোনো কাগজপত্র জনা দেননি। সেকারণে তিনি না চাইলেও তাকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৫, যার মধ্যে পুরুষ দুই লাখ ৬৭ হাজার ৭৪৩ এবং নারী ভোটার রয়েছে দুই লাখ ৫৯ হাজার ২৫১ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার আছেন একজন।