খুলনা-৫ আসনে লড়াই হবে দু হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে
জিয়াউস সাদাত
, খুলনা
আওয়ামী বলয়ের শক্ত ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত খুলনা ৫ আসনের এবারের নির্বাচনের চিত্র অন্যরকম। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও এ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররাই ফ্যাক্টর। ডুমুরিয়া এবং ফুলতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনের মোট ভোটারের প্রায় এক চতুর্থাংশই সনাতনী সম্প্রদায়ের। যা নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোতে এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে।
মৎস্য ঘের এবং কৃষি অর্থনীতি নির্ভর এ জনপদে জলাবদ্ধতা, কৃষি এবং শিল্প সংকট দীর্ঘ দিনের সমস্যা। তাছাড়া চরমপন্থি অধ্যুষিত এ এলাকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। ডুমুরিয়া এবং ফুলতলার আটটি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মোট ৪ জন প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক সভাপতি আলী আজগার লবী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মধ্যে। এ দু হেভিওয়েট প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই এর সম্ভাবনা রয়েছে। জোট রাজনীতির সূত্রে এক সময়ের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র এ দু’নেতা সময়ের ব্যবধানে ভোটের মাঠে আজ পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসাবে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। হিন্দু অধ্যুষিত এ আসনের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে তার জনপ্রিয়তা রয়েছে। ৫ আগস্টের পরে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী সমর্থক ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নানা রকম হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ওই সময় জামায়াতের সনাতন শাখাকে সক্রিয় করে তাদের উদ্যোগে উপজেলা সদরে সমাবেশের আয়োজন করা হলে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। তাছাড়া বিগত দিনে সকল ধরণের প্রতিকূল পরিবেশেও গোলাম পরওয়ার ধারাবাহিকভাবে এলাকাবাসীর পাশে থেকে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছেন। তিনি এলাকার অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান করেছেন।
করোনাকালে তিনি এ এলাকার মানুষের জন্য যথাসম্ভব সহযোগিতার চেষ্টা করেছেন।এসব কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ তাকে খুবই পছন্দ করেন। এবারের ভোটে তার প্রতিফলন ঘটবে বলে মনে করছেন অনেকে। জামায়াত মনোনীত ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৪ বছরে যারা বারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, তারা সুশাসন, সততা ও নৈতিকতার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, `দেশের মানুষ এবার একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চায়। এই পরিবর্তনের অর্থ হলো—যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দলীয়করণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তাদের আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যাবে না।’
গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, অতীতে ক্ষমতায় থাকা প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো প্রশাসনকে দলীয়করণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে এবং ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বারবার যারা পরীক্ষায় ফেল করে, তাদের আবার সুযোগ দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে এমপি ও মন্ত্রীরা রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন না এবং সরকার হবে জনগণের সেবক। তিনি আরও বলেন,‘আমরা ক্ষমতায় গেলে শাসক নয়, জনগণের খাদেম হিসেবে কাজ করব।’ নিজ নির্বাচনি এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, অতীতে তিনি সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন। আবার নির্বাচিত হলে জলাবদ্ধতা নিরসন, ব্রিজ নির্মাণ, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং হাসপাতাল উন্নয়নে কাজ করবেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকবে। অতীতে মন্দির নির্মাণ ও ধর্মীয় উৎসবে সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, `ডুমুরিয়া-ফুলতলা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল উদাহরণ।' তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচন নিরপেক্ষ হলে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট দিয়ে জনগণ একটি মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়বে।
অপরদিকে বিএনপি মনোনীত আলী আসগার লবী ২০০১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার ছেড়ে দেওয়া খুলনা-২ আসন থেকে উপ-নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ফুলতলার ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান লবী, জিয়া পরিবারের বিশ্বস্ত এবং তারেক রহমানের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। ২০০৭ সালের ১/১১ সরকারের আমলে আলী আসগার লবী গ্রেপ্তার হন। বন্ধ করা হয় তার সব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। তার অনুসারীরা বলেন, ওয়ান ইলেভেনের সরকার ও পরবর্তীতে আওয়ামী সরকার তাকে চরম নির্যাতন এবং হয়রানি করেছে। বছরের পর বছর তাকে কারাগারে আটক রাখা হয়। নানাবিধ ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন তিনি। অত্যন্ত সদালাপী এবং সজ্জন ব্যক্তি লবি খুলনায় একজন ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে পরিচিত। গত এক বছর ধরে তিনি ফুলতলা এবং ডুমুরিয়ায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে তার সঙ্গে কাজ করছেন। ইতোমধ্যেই তিনি ভোটারদের মাঝে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। এ আসনে তিনি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলেছেন। জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী আলী আসগার লবী জানান, আমি এলাকার মানুষের সেবক হিসাবে কাজ করতে চাই। নির্বাচিত হলে আমি দল মত নির্বিশেষে সকল শান্তিপ্রিয় মানুষের জিম্মাদার হয়ে থাকবো। আমার জীবন থাকতে এই এলাকার কোন মানুষকে আমি হয়রানি হতে দেবোনা। আমি কথা দিচ্ছি, কোন দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের ঠাঁই হবে না। খারাপ মানুষ সে যে দলেরই হোক ডুমুরিয়া-ফুলতলার মাটিতে তাকে ভালো হয়েই চলতে হবে। কোন জন হয়রানি সহ্য করা হবে না।
লবী আরও বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি ডুমুরিয়া এবং ফুলতলায় দু'টি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ, দু'টি সুদর্শন মন্দির এবং দু'টি জেলা মানের স্টেডিয়াম নির্মাণ করবেন। এলাকার মানুষের জন্য সর্বোচ্চ সরকারি আর্থিক সহায়তা ও অনুদান নিশ্চিত করবেন। ডুমুরিয়ায় ২৫০ শয্যার হাসপাতাল ও ফুলতলা হাসপাতালকে আধুনিকায়নসহ কমিউনিটি হাসপাতাল গড়ে তুলবেন। এ এলাকায় "ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব" কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং প্রতিটি ইউনিয়নে আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন। নারী শিক্ষা ও ঝরে পড়া দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দরিদ্র পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ,সকলের জন্য নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ এই বিশ্বাসকে সামনে রেখে বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নে বিএনপির চিন্তাধারার আলোকে ডুমুরিয়ায় একটি আধুনিক মেগা স্টেডিয়াম নির্মাণ করবো। এতে আমাদের তরুণ সমাজ মাদকমুক্ত হয়ে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্রীড়াঙ্গনে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। শুধু স্টেডিয়াম নয়, খেলোয়াড়দের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও তিনি দেন। পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ ও বিনোদনের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক শিশু পার্ক নির্মাণ করা হবে।’তিনি বলেন, 'জীবনের শেষ সময়ে আমি আমার পৈত্রিক নিবাস ডুমুরিয়া-ফুলতলাবাসীকে কিছু দিতে চাই। মন প্রাণ উজাড় করে তাদের উন্নয়নে কাজ করতে চাই।'
ভোটাররা জানান, অতীতে যারা এ আসনে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন তারা এ জনপদের মানুষের সঙ্গে উন্নয়নের নামে প্রতারণা করেছেন। বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা এ এলাকার অভিশাপ। যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভোগাচ্ছে। শৈলমারী–সালতা নদী পলি ভরাটের কারণে নিষ্কাশন বন্ধ হেয়ে গেছে, ফলে ডুমুরিয়ার কয়েকটি এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। টানাবৃষ্টিতে একাধিক ইউনিয়ন মাসের পর মাস পানিবন্দি থাকে ফলে ফসল ও মৎস্য ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব হিসাব-নিকাশ কষে এবার মানুষ ভোটের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
শক্তিশালী দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর বাইরে খুলনা-৫ আসনে এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির চিত্তরঞ্জন গোলদার ও জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন (ইয়াসমীন) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে তাদের প্রচারণা তেমন চোখে পড়েনি। খুলনা-৫ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন। বিগত দিনের নির্বাচনি ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এর বিতর্কিত নির্বাচনে এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ এমপি হন। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটের প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার বিজয়ী হন। ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা সালাহ উদ্দিন ইউসুফ এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।