স্টাফ রিপোর্টার
, যশোর
পাঁচ বছর ধরে ভারতের গুজরাটে পরিবারের সাথে বসবাস করতো ১২ বছর বয়সী আমানুল্লাহ (ছদ্মনাম)। সেখান থেকে সাত মাস আগে স্বপরিবারে দেশে ফিরছিল তারা। পশ্চিমবাংলার রানাঘাট থেকে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে আমানুল্লাহর বাবা, মা এবং ভাইকে পাঠানো হয় কারাগারে। আমানুল্লাহকে রাখা হয় জুভেনাইল হোমে (শিশুকেন্দ্র)। সেখান থেকেই বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফিরে এসেছে আমানুল্লাহ।
আমানুল্লাহদের বাড়ি খুলনা জেলায়। বুধবার (১৯ নভেম্বর) ভারত থেকে যে ৩০ শিশু দেশে ফিরেছে তাদের অধিকাংশকেই গ্রেপ্তারের পর বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তারা দেশে ফিরতে পারলেও জানেনা যে বাবা-মা এখনো ভারতের কারাগারে আটক আছেন, নাকি মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন।
আমানুল্লাহর মতো ফিরে আসাদের অনেক শিশুরই এখন আশ্রয় হবে চাচা, মামা, খালাদের বাড়িতে।
শিশুদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রত্যাবসিত অধিকাংশ শিশুই মানব পাচারের শিকার। হয় তারা বাবা-মায়ের সাথে ভারতে যেয়ে গ্রেপ্তার হয়েছে। অথবা, ভারতে বসবাসের এক পর্যায়ে দেশে ফিরে আসার সময় গ্রেপ্তার হয়েছে। এসব পরিবার দালালের খপ্পরে পড়ে ভালো চাকরি এবং ভালো থাকার প্রতিশ্রুতিতে ভারতে গিয়েছিল।
শিশু বয়সে পিতার সাথে গুজরাট গিয়েছিলেন নড়াইলের জামিল আহমেদ (ছদ্মনাম)। বর্তমানে তার বয়স ৩৫ বছর। সেখানেই তিনি বিয়ে করেছিলেন খুলনার এক মেয়েকে। জামিলের স্ত্রীও চাকরির খোঁজে প্রায় ১২ বছর আগে দালালের প্ররোচণায় পড়ে গুজরাটে যান। সেখানে পৌঁছানোর পর দালাল তার কোনো দায়িত্ব নেয়নি। তিনি সেখানে কোনোমতে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। পরে জামিলের সাথে বিয়ে হয়। তাদের ঘরে জন্ম নেওয়া সন্তানের বয়স এখন আট বছর।
প্রায় এক বছর আগে গুজরাট থেকে পুলিশ জামিল আহমেদকে গ্রেপ্তার করে বিমানে আগরতলায় নিয়ে আসে। সেখানে দশদিন রাখার পর কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয় তাকে।
জামিল দেশে ফিরে আসার পর গুজরাট থেকে শিশুকন্যাকে নিয়ে দেশে ফিরছিলেন তার স্ত্রী। কিন্তু, আসার পথে কোলকাতার লালবাগ থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন তারা। বর্তমানে জামিলের স্ত্রী দমদম সেন্ট্রাল জেলে আটক রয়েছেন। শিশুকন্যাকে রাখা হয় বহরমপুরের শিলায়ন হোমে। সেখান থেকে বুধবার দেশে ফিরেছে মেয়ে। আট মাস পর মেয়েকে ফিরে পেয়ে খুশি জামিল আহমেদ। এখন তার চিন্তা, কবে ভারতের কারাগার থেকে মুক্ত হবেন স্ত্রী, কবে ফিরবেন দেশে।
লেখাপড়ায় অমনোযোগী হওয়ার কারণে বকেছিলেন পিতা। সেজন্য রাগ করে তিন বান্ধবীর সাথে সীমান্তের অবৈধ পথ পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়েছিলো রাহেলা (১৪-ছদ্মনাম)। সুন্দরবন এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশের সাথে সাথেই তাদেরকে গ্রেপ্তার করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। পরে তার আশ্রয় হয় কোলকাতার এক শেল্টারহোমে। সেখানে কয়েক মাস থাকার পর বাংলাদেশি উপ-হাইকমিশনের বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে বুধবার (১৯ নভেম্বর) বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে দেশে ফেরত এসেছে সে।
রাহেলার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। সেসহ মোট ৩০ শিশু বুধবার বেনাপোল ইমিগ্রেশন দিয়ে ভারত থেকে দেশে ফিরে আসে। এদের সবারই বয়স ১৮ বছরের নিচে। প্রত্যাবসিত শিশুদের মধ্যে ১৯ বালক এবং ১১ বালিকা।
এসব শিশুদের মধ্যে স্বইচ্ছায় বাড়ি থেকে পালিয়ে ভারতে যাওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে শেল্টারহোমে যাওয়াদের তালিকা বেশি না। অধিকাংশই সীমান্তের অবৈধ পথ দিয়ে বাবা-মায়ের সাথে যাওয়ার পর অথবা বাবা-মায়ের সাথে ফিরে আসার সময় বিএসএফ’র হাতে গ্রেপ্তার হয়। বাবা-মাসহ বয়স্কদের পাঠানো হয় কারাগারে, শিশুদেরকে বিভিন্ন শেল্টারহোমে।
মানবাধিকার সংস্থা রাইটস যশোরের তথ্যানুসন্ধান কর্মকর্তা তৌফিকুজ্জামান জানান, এসব শিশু দীর্ঘদিন উত্তর দিনাজপুরের সিএনসিপি বয়েজ হোম, কোলকাতার সুকন্যা, লিলুয়া, বহরমপুরের শিলায়ন, নদীয়ার নির্মল হৃদয় সমিতি, উত্তর চব্বিশ পরগনার ইন্ডিয়া সোসাইটি ফর স্পন্সরশিপ অ্যান্ড অ্যাডপশন, বারাসাতের কিশলয়া, জলপাইগুড়ির কোরাক, কোলকাতার সংলাপ ও ধ্রুব আশ্রম এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার দিগম্বরপুর হোমে আশ্রয়ে ছিল। পরে তাদের হোম ইনভেস্টিগশন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানোর পর বাংলাদেশি হাই কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বেনাপোল ইমিগ্রেশনের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শওকত হোসেন বলেন, ফিরে আসা শিশুদের বাড়ি যশোর, চুয়াডাঙ্গা, খুলনা, নড়াইল, পিরোজপুর, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, রংপুর এবং ঠাকুরগাও জেলায়।
বুধবার রাত ৮টার দিকে প্রয়োজনীয় আইনগত কার্যাদি সম্পন্ন করে এসব শিশুকে বেনাপোল পোর্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়। সেখান থেকে জিডি’র মাধ্যমে রাইটস যশোর ১২, জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার ১০ ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি আট শিশুকে নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে।
তাদের সবাইকে বেনাপোলস্থ রাইটস যশোরের হাফওয়ে হোমে নিয়ে যাওয়া হয়। যাদের পরিবারের সদস্যরা প্রত্যাবসনের সময় উপস্থিত ছিলেন তাদেরকে পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদেরও নিজ নিজ পরিবারে ফিরিয়ে দেবে দায়িত্ব নেওয়া সংস্থাগুলো।
রাইটস যশোরের কর্মকর্তা তৌফিকুজ্জামান আরও বলেন, মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সক্রিয়। তারা মানুষকে প্রলোভনে ফেলে ভারতে নিয়ে বিক্রি করে দেয় অথবা সেখানে নিয়ে ছেড়ে দেয়। এসব মানুষের মধ্যে অনেকে আত্মগোপনে থেকে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে যুক্ত হন। অধিকাংশের আশ্রয় হয় জেলখানা বা খারাপ জায়গায়।
তিনি বলেন, ভারত সরকারের বাংলাদেশি বিতাড়ন কর্মসূচিতে অনেককে বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ধরে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হচ্ছে। অনেকে নিজেরাই দেশে ফেরার সময় আটক হয়ে জেলখানায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এসময় শিশুদেরকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।
এসব শিশু দেশে ফিরতে পারলেও তাদের ঝুঁকি না কমে বরং আরও বেড়ে যায়। কারণ, অধিকাংশের বাবা-মাই এখনো ভারতে কারা অভ্যন্তরে রয়েছেন।