আসাদুজ্জামান সরদার
, সাতক্ষীরা
সাতক্ষীরা সীমান্তের বেড়িবাঁধের ওপর বসে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আহমদ আলী চৌদালী। দৃষ্টি কাঁটাতারের ওপারে ভারতের দিকে। তার আক্ষেপ, নিজের দেশের সমাজব্যবস্থা নিয়ে। এই পাশের সীমানাটাই যেন তার কাছে আরও কঠিন- এক অদৃশ্য সামাজিক দেয়াল, যা চোখে দেখা যায় না। কিন্তু প্রতিটি আচরণে টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রামের নাম বলদিঘাটা, মানুষ ব্যঙ্গ করে বলে ‘বলদঘাটা’। কাজ চাইতে গেলে বলে, তোরা আলাদা জাত। আমরা মুসলমান, কিন্তু সমাজ আমাদের আলাদা করে রেখেছে। না বুঝি উপজাতি, না বুঝি কোনো তালিকা; শুধু টিকে থাকাই আমাদের ধর্ম।”
পরিচয়হীনতার শেকড়
চৌদালীদের নিয়ে গবেষণা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিস আলী।
তার গবেষণা অনুযায়ী সাতক্ষীরার ছয়ঘরিয়া, পারুলিয়া, কুলিয়া, ভাদছড়া, গাজীপুর, ঘোনা, কাথন্ডা, খলিলনগর, বৈকারি, কুশখালী, হিজলদি ও চন্দনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এ সম্প্রদায়ের বসবাস। পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকায় তাদের বসতি রয়েছে।
চৌদালীদের আদি পরিচয় স্পষ্ট নয়। প্রচলিত আছে, তাদের পূর্বপুরুষ মাথায় ডালা নিয়ে মাছ বিক্রি করতো। তাই ‘ডালা সৈয়দ’ নামটি এসেছে। ধর্মীয় দিক থেকে মুসলিম হলেও একসময় তাদের ‘বাগদি’ বলা হতো। দীর্ঘদিন মাছধরাই ছিল প্রধান পেশা; কিন্তু জলাধার সংকটে অনেকেই এখন কৃষিকাজ ও ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করছেন। শিক্ষার হার খুবই কম; প্রাথমিকের গণ্ডি পেরুনো শিক্ষার্থীও হাতেগোনা। শিশুকাল থেকেই অনেকে মাছধরা বা কাগজ কুড়ানোর কাজে জড়িয়ে পড়ে। দারিদ্র্য এতো গভীর যে, প্রায় ৯০ শতাংশ পরিবার মাটির ঘরে থাকে; অধিকাংশ ঘরের ছাউনি নারকেলের পাতা দিয়ে। সামান্য বসতভিটাই একমাত্র সম্পদ। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ালে এ অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তার মতে, ‘তাদের একটি পৃথক সাংস্কৃতিক পরিচয় আছে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় স্বীকৃতি না থাকায় তারা উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে পড়ছে।’
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’র তালিকায় ৫০টির বেশি গোষ্ঠীর নাম থাকলেও চৌদালীদের নাম নেই। ফলে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির (ভাতা/সাহায্য) কোনো সুফল তারা পায় না। জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাদের কাছেও এদের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

রাষ্ট্রীয় নথিতে নেই কোনো অস্তিত্ব
বৈকারীর সাহেব আলী (৬২) বলেন, ‘পরিচয় পেলে আমাদের সঙ্গে কেউ মেশে না। কামার, কুমার, মুচি, কায়পুত্র, হরিজন সবাই তো কোনো না কোনো তালিকায় থাকে। আমরা তালিকার বাইরের মানুষ।’
জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ‘চৌদালী’ নামে আলাদা কোনো জনগোষ্ঠীর তথ্য তাদের কাছে নেই। চৌদালীরা আদিবাসী বা দলিত/বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কোনো তালিকাতে না থাকায়, তারা ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠী’ হিসেবে বিশেষ বরাদ্দ বা তালিকাভুক্ত সেবার কোনো সুবিধা পায় না। যদিও কিছু সংখ্যক ব্যক্তি সাধারণ সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর (যেমন বিধবাভাতা, বয়স্কভাতা) সুবিধা পেয়ে থাকে, কিন্তু মোবাইলফোন না থাকায় সেই টাকাও অনেক সময় প্রতারক চক্র হাতিয়ে নেয়।
বঞ্চনার দৈনন্দিন চিত্র
সাতক্ষীরায় কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার মতে, চৌদালীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দলিতমূলের এক অনগ্রসর জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিনের বৈষম্য, পরিচয় সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে তাদের উন্নয়ন দৃশ্যমান নয়।
সাবেক ইউপি সদস্য ওজিয়ার রহমান জানান, কাথন্ডা বাজারসংলগ্ন এলাকায় এক হাজারের বেশি চৌদালী থাকলেও শিক্ষায় অগ্রগতি নেই।
‘আমি ছাড়া কেউ এসএসসি পাস করতে পারেনি। অধিকাংশ পরিবার এখনো মাটির ঘরে থাকে, যুবকদের মধ্যে মাদকের প্রবণতাও বাড়ছে,’ বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ‘ঋশিল্পীর দুটি স্কুল থাকলেও তৃতীয় শ্রেণির পর বেশিরভাগ শিশু কাজের খোঁজে ঝরে পড়ে। পরিচয়পত্রে বয়সের গরমিল থাকায় অনেক বয়স্ক মানুষ ভাতার সুবিধাও পান না। সামগ্রিকভাবে সরকারি সেবা ও উন্নয়ন এখনো তাদের কাছে পৌঁছায়নি।’
বঞ্চনার মুখে নারী
সাতক্ষীরা জেলার বৈকারী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা সালমা বেগম বঞ্চনাময় জীবনের চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্ম এই মাটির ঘরে, মৃত্যুও এখানে। অন্যরা আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না, তাই কাজও জোটে না। পুরুষদের পাশাপাশি আমাদেরও কাজ করতে হয়, নইলে সংসার চলে না।’
তিনি জানান, সামাজিক বৈষম্য ও চরম দারিদ্র্যের কারণে এখানকার মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। গায়ের রঙ এবং তাদের ‘নিচু’ পেশার দোহাই দিয়ে অন্য গোষ্ঠী থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে না, ফলে, বিবাহ সম্পর্ক কেবল নিজ জনগোষ্ঠীর (যেমন- বৈকারী, ঘোনা) মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বর্তমানে তাদের মাছধরার চিরায়ত পেশাটি সংকটে পড়ায় জীবনধারণ কঠিন হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মানুষ আগে যেমন মাছ ধরে বেঁচে থাকতো, এখন আর পারে না। অনেকে কাজের সন্ধানে ভারতে চলে গেছে, আর যারা এখানে থাকে, তাদের বেশিরভাগই ইটভাটায় কাজ করতে যায়।’
একমাত্র উচ্চশিক্ষিত জামাত আলী
চৌদালী জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা একজনই উল্লেখযোগ্য উচ্চশিক্ষিত মানুষ- জামাত আলী। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি সরকারি ব্যাংকে উচ্চপদে কর্মরত। সমীক্ষা অনুযায়ী, তার আগে বা পরে এই জনগোষ্ঠী থেকে আর কেউ এতোদূর উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে পারেননি।
জামাত আলী বলেন, ‘চৌদালীরা শিক্ষায় ও অর্থনীতিতে সবচেয়ে পিছিয়ে। আমাদের পূর্বপুরুষরা মাছ ধরে জীবিকা চালাতো। সাতক্ষীরার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় দশ হাজার চৌদালী থাকলেও উচ্চশিক্ষায় আমরা কার্যত অনুপস্থিত।’
তিনি জানান, দারিদ্র্য, পরিচয় সংকট ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাবে এখনও বহু পরিবার বঞ্চনার মধ্যে বসবাস করছে। কম বয়সে বিয়ে, বিশেষত মেয়েদের ১৩-১৪ বছরেই বিয়ে- এখনও এই সম্প্রদায়ের বড় সামাজিক বাস্তবতা।
শিক্ষায় পিছিয়ে থাকার কারণ ও ঋশিল্পীর উদ্যোগ
ঋশিল্পী ইন্টারন্যাশনালের জোসেফ খাঁ বলেন, ‘চৌদালী সম্প্রদায়ের পড়াশোনায় অনাগ্রহের মূল কারণ আর্থিক অনটন ও সচেতনতাহীনতা। শিশুরা মনে করে ছোট বয়সে অল্প শিক্ষাই যথেষ্ট। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঋশিল্পী কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুল পরিচালনা করছে, যা শিশুদের মাধ্যমিক স্তরে উন্নীত করতে সাহায্য করে। এছাড়া, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কর্মসূচির ফলে মেয়েদের বিয়ের বয়স কিছুটা বেড়েছে।’
মানবাধিকারকর্মী মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, ‘চৌদালীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বীকৃতি ছাড়া কোনো উন্নয়নই তাদের কাছে পৌঁছাবে না। বৈষম্য দূর করে তাদের মানবিক মর্যাদা দিতে হবে।’
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
বৈকারী ইউপি চেয়ারম্যান আবু মো. মোস্তফা কামাল জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় তিন হাজার চৌদালী সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, যাদের অধিকাংশ ‘জেলে কার্ড’ পেলেও কোনো বরাদ্দ পায় না।
সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সায়েদুর রহমান মৃধা জানান, জেলার অসহায়, দলিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারি সহায়তা ও ভাতা আছে। কিন্তু চৌদালীদের কোনো তালিকা তাদের কাছে নেই।
তবে, আগামীতে তাদের প্রান্তিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে পরিকল্পনার আশ্বাস দেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ‘ক্রিশ্চিয়ান এইড’, ‘আমরাই পারি’ পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্মিলিতভাবে Expanding civic space through active CSO participation and strengthened governance system in Bangladesh (ECSAP) নামে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক নারী, দলিত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।