যশোর, বাংলাদেশ || শনিবার, ৯ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সুন্দরবনে মধুর সঙ্গে মিশে থাকা ভয়

এম জুবায়ের মাহমুদ

, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা)

প্রকাশ : শনিবার, ৯ মে,২০২৬, ১০:০০ এ এম
সুন্দরবনে মধুর সঙ্গে মিশে থাকা ভয়

ভোরের অন্ধকার তখনও পুরোপুরি কাটেনি। গাবুরার ও বুড়িগোয়ালিনীর নদীপাড়ে সারি সারি ছোট নৌকা। কোথাও চাল-ডাল তোলা হচ্ছে, কোথাও শুকনো কাঠ, দড়ি, ধোঁয়ার পাত্র আর খালি ড্রাম গুছিয়ে রাখছেন মৌয়ালরা। কারও মুখে দোয়া, কারও চোখে উৎকণ্ঠা। পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন। তারপর ধীরে ধীরে নদীর স্রোতে মিলিয়ে যাচ্ছে নৌকাগুলো, সোজা সুন্দরবনের দিকে। চিত্রটি শুক্রবার (৮ মে) সকালের।

প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হয়েছে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুমের দ্বিতীয় ধাপ। কিন্তু বনজীবীদের ভাষায়, এই সময়টাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির। কারণ, প্রথম দফায় কোনো এলাকায় বেশি মধু পাওয়া গেছে, সেই খবর তখন ছড়িয়ে পড়ে বনজুড়ে। আর সেই সঙ্গে বাড়ে নির্দিষ্ট এলাকায় দস্যুদের নজর, চাঁদার চাপ ও অনিশ্চয়তা।

সাতক্ষীরা রেঞ্জসংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের সামাদ মাঝি বহু বছর ধরে মধু সংগ্রহ করেন। বাবাও ছিলেন মৌয়াল। জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে সুন্দরবনের নদী আর খালে।

নৌকায় সরঞ্জাম তুলতে তুলতেই সামাদ বলেন, বাঘের ভয় তো আছেই, কিন্তু এখন মানুষের ভয় বেশি। দ্বিতীয়বার বনে গেলে সবাই জানে কোথায় চাক আছে। তখন নানা চাপও বাড়ে।

মধুর সঙ্গে মিশে থাকে ভয়

সুন্দরবনের মৌয়ালদের কাছে মধু সংগ্রহ শুধু পেশা নয়, টিকে থাকার লড়াইও। গভীর বনে ঢোকার পর দিনের পর দিন কাটাতে হয় অনিশ্চয়তায়। কখন কোথায় বাঘের মুখোমুখি হতে হবে, কখন নদীতে ঝড় উঠবে, কিংবা কোন খালে কার মুখোমুখি হতে হবে- তার নিশ্চয়তা নেই।

স্থানীয় বনজীবীরা বলেন, কয়েক বছর আগের বড় দস্যু বাহিনীর তৎপরতা কমলেও এখন আবার আগের রূপে ফিরেছে। ‘নানাভাই’ ও ‘ডন বাহিনী’ ছাড়াও ছোট কয়েকটি চক্র এখনও বনজুড়ে তাদের রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। গভীর বনের অধিকাংশ এলাকায় বেশি আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করেন মৌয়ালরা।

একজন অভিজ্ঞ মৌয়াল বলেন, বনে গেলে পরিবার জানে না মানুষটা ঠিকভাবে ফিরতে পারবে কি না। ফোনের নেটওয়ার্কও থাকে না। কয়েকদিন যোগাযোগ না থাকলে বাড়ির মানুষ অস্থির হয়ে যায়।

উপকূলের অধিকাংশ মৌয়াল গরিব। মৌসুম শুরুর আগেই স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিতে হয় তাদের। সেই টাকা দিয়ে নৌকা ভাড়া, জ্বালানি, খাবার, দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনেন তারা। মধু কম পেলে বা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেই ঋণের বোঝা পুরো পরিবারকে টানতে হয়।

দাতিনাখালী এলাকার শাহাজামাল সামা নামে এক মৌয়াল বলেন, ‘বনে না গেলে সংসার চলে না। আবার বনে গেলেও মনে হয় জীবনটা হাতে নিয়ে যাচ্ছি।’

স্থানীয় মৌয়ালদের ভাষ্য, এবার বনপথে নানা ধরনের চাপ আগের চেয়ে বেশি অনুভব করছেন তারা। পাস নেওয়া থেকে শুরু করে বনের বিভিন্ন স্তরে বাড়তি খরচের কথাও বলছেন কেউ কেউ। অনেকের দাবি, পাস রিনিউ বা নবায়নের সময় এক কেজি করে মধু দিতে হয় সংশ্লিষ্ট স্টেশন কর্মকর্তাদের।

তবে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনীহা বেশিরভাগ বনজীবীর। কারণ, বননির্ভর জীবিকার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয় তাদের মধ্যে স্পষ্ট।

কুড়িকাহুনিয়া এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, একদিকে দাদনের চাপ, অন্যদিকে বনে যাওয়ার খরচ। আবার মাঝপথে নানা ঝামেলা। সব মিলিয়ে মৌয়ালদের জীবনটা খুব কঠিন হয়ে গেছে।

সংখ্যায় আশাব্যঞ্জক, বাস্তবে অনিশ্চয়তা

বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১৫৫টি পাসের বিপরীতে এক হাজার ৪৭ জন মৌয়াল সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। এ সময়ে সংগ্রহ হয়েছে ৫২৩ কুইন্টাল মধু এবং ১৫৭ কুইন্টাল মোম। এই হিসেবে মৌসুম ভালো গেলেও মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন বলছেন মৌয়ালরা। কারণ, উৎপাদন ভালো হলেও ব্যয় ও ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না।

এবছর ১১শ’ কুইন্টাল মধু ও ৬শ’ কুইন্টাল মোমের লক্ষ্যমাত্রা পশ্চিম সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জের।

রাত নামলেই ভীতি

রাত নামলেই বাড়ে আতঙ্ক সন্ধ্যার পর সুন্দরবনের চিত্র যায় বদলে। নদীতে তখন শুধু জোয়ারের শব্দ আর দূরে কোথাও বন্য প্রাণীর ডাক। অন্ধকারে নোঙর করা ছোট নৌকাগুলোতে গাদাগাদি করে রাত কাটান মৌয়ালরা। অনেকেই রাতভর জেগে থাকেন পাহারায়।

আলেক হোসেন নামের একজন মৌয়াল বলেন, রাতে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কখন কী হয়, বোঝা যায় না।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষকের সহকারী এরফান হোসেন বলেন, ‘মৌয়ালদের আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’ পাস রিনিউয়ের সময় মধু নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আমতা আমতা করে ফোনের লাইন কেটে দেন।

স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক আবু নাঈমের ভাষ্য, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হলে সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতা ও বনজীবীদের ওপর বিদ্যমান চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

স্থানীয় কলেজ শিক্ষার্থী তাহমিদ হোসেন বলেন, শঙ্কা নিয়েই আবার বনমুখী হচ্ছে মানুষ।

সুন্দরবনের মধু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু এই মধুর প্রতিটি ফোঁটার পেছনে জড়িয়ে থাকে উপকূলের মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা আর টিকে থাকার সংগ্রাম।

তারপরও প্রতি মৌসুমে আবার নৌকা নামে নদীতে। কারণ, সুন্দরবনের সম্পদের ওপর টিকে থাকা এসব ব্যক্তির কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য- বনে না গেলে সংসার চলে না।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)