যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৮ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোর জেনারেল হাসপাতাল

তালাবদ্ধ আইসিইউ, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি হয়েছে ‘শো-পিস’

সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৮ মে,২০২৬, ১২:০০ পিএম
আপডেট : শুক্রবার, ৮ মে,২০২৬, ০২:০৯ এ এম
তালাবদ্ধ আইসিইউ, কোটি টাকার যন্ত্রপাতি হয়েছে ‘শো-পিস’

যশোরসহ এতদঞ্চলের সাধারণ মানুষের উন্নত চিকিৎসার শেষ ভরসা হওয়ার কথা ছিল জেনারেল হাসপাতালের। কিন্তু অব্যবস্থাপনা আর জনবল সংকটে তা এখন ‘কাগজের হাসপাতাল’। একদিকে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি নিয়ে ১৬ বছর ধরে খুঁড়িয়ে চলছে ২৮ শয্যার করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ), অপরদিকে গত পাঁচ বছর ধরে লিফট আর জনবলের অভাবে তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে আধুনিক আইসিইউ (ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিট)।

সিসিইউর বেহাল দশা

যশোরের একমাত্র স্বতন্ত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ২৮ শয্যার এই সিসিইউ ইউনিটে হৃদরোগীদের জন্য রয়েছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক যন্ত্রপাতি। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, দীর্ঘ ২০ বছরে এই যন্ত্রপাতির সুফল পায়নি সাধারণ রোগীরা। হার্টের রিং পরানো বা জরুরি শারীরিক সাপোর্ট তো দূরের কথা, সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীদের পাঠানো হয় বাইরের বেসরকারি ক্লিনিকে। জরুরি অবস্থায় রোগীদের এখনও সেই খুলনা বা ঢাকাতেই ছুটতে হচ্ছে, যার ফলে পথেই প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, যশোরের মানুষের কথা ভেবে সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী প্রয়াত তরিকুল ইসলামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জেনারেল হাসপাতালের পূর্ব পাশে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে করোনারি কেয়ার ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। পরে ২০০৫ সালে ২৯ ডিসেম্বর এইচ.এন.পি এস.পি প্রকল্পের আওতায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০০৬ সালে ১২ অক্টোবর সাবেক বন ও পরিবেশ মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিক সিসিইউ ইউনিটের উদ্বোধন করেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পে টাকায় চিকিৎসা কার্যক্রম চালু করার জন্য পর্যায়ক্রমে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা মূল্যে অত্যাধুনিক মেশিন ক্রয় করা হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না থাকায় সে সময় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হাসান আল মামুন ব্যবহার করতে পারেনি। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিকভাবে ইউনিটটির কার্যক্রম চালুর জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প পরিচালক জেনারেল হাসাপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হাসান আল মামুনকে চাপ দেওয়া হয়। কিন্তু জনবল না থাকায় তিনি ইউনিটটি চালু করতে পারেননি।

পরে ২০০৯ সালের মার্চ মাসে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী আ ফ ম রহুল হক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডাক্তার শাহ্ মনির হাসান যশোর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। এসময় স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপের) চিকিৎসকরা করোনারি কেয়ার ইউনিট চালু করার জন্য আবেদন জানান। তখন মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী ডাক্তার হাসান আল মামুন সামান্য জনবল পেয়ে ২০০৯ সালের ১৯ জুলাই যশোর জেনারেল হাসপাতালে ১৮ শয্যার কার্ডিয়াক ওয়ার্ডটি করোনাররি কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করে ইউনিটের সাময়িক কার্যক্রম চালু করেন। কিন্তু রোগীরা এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সেবিকাদের সেবা পেলেও অত্যাধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা মেশিন থাকার পরেও টেকনিশিয়ানের অভাবে এর সুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত।

সিসিইউ মেশিনের অবস্থায়

২০০৭ সালে ২৬টি ইনফিউশন পাম্প মেশিন, ৪টি ইকো-কার্ডিওগ্রাম, সিরিঞ্জ পাম্প ৪টি এবং ২০০৭ সালে ১৮টি এসি এবং একটি লিফট সরবরাহ করেন। ২০০৭ সালে সরবরাহকৃত ৬টি ব্লাড ওয়ামিং ডিভাইস মেশিনের সব কয়টি নষ্ট। ২০০৮ সালে ফার্মেসির জন্য ১টি রেফ্রিজারেটর, দুটি ভেন্টিলেটর, তিনটি ইসিজি ট্রলি, থ্রি চ্যানেলের ছয়টি ইসিজি মেশিন স্থাপন করা হয়। ২০০৮ সালে নয়টি ডিফিব্রিলেটরসহ কার্ডিয়াক মনিটর পাওয়া যায়, কিন্তু সব নষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে অত্যাধুনিক ৯টি কার্ডিয়াক মনিটর স্থাপন করা হয়। বর্তমানে চারটি সচল আছে। একই সময় ৩টি ডিজিটাল ইসিজি মেশিন আসলেও সব কয়টি নষ্ট হয়ে গেছে। ২০০৯ সালে দুটি পাল্স অক্সিমিটারসহ ক্যাপনোগ্রাফি মেশিন আসে। ২০০৯ সালের ৬টি পাল্স অক্সিমিটারসহ মনিটার ও ৩টি সাকার মেশিন ওয়ার্ডে স্থাপন করা হয়, কিন্তু ব্যবহার না করায় তা নষ্ট হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ২০টি নেবুলাইজার মেশিনসহ স্ট্যান্ড, নয়টি কার্ডিয়াক মনিটর, চারটি হেলটার মনিটরসহ কম্পিউটার করোনারি কেয়ার ইউনিটের জন্য আসে। এর মধ্যে চারটি কার্ডিয়াক মনিটর ছাড়া সব কয়টি নষ্ট হয়ে গেছে।

২০০৯ সালে একটি ইটিটি মেশিন ও একটি এমপিএল ফ্লামেক্স মেশিন স্থাপন করা হয়। একইভাবে ২০১০ সালে দুটি ভেন্টিলেটর পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো নষ্ট হয়ে যায়। আটটি কালার ডপলার মেশিন এলেও তার কোনো ডকুমেন্ট নেই হাসপাতালে। ২০১৫ সালে একটি সাকশন মেশিনের রেগুলেটর স্বতন্ত্র এই প্রতিষ্ঠানের জন্য ইউডিসিএল থেকে বিভিন্ন সময় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু যথাযথ ব্যবহার না করায় এরমধ্যে একটি ইকো-কার্ডিওগ্রাম, সিরিঞ্জ পাম্প তিনটি বাদে সব কয়টি নষ্ট দেখিয়ে ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তা কনডেমেশন করে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে জেলা পরিষদের আটটি এসি ও গণপূর্ত বিভাগ নতুন লিফট সংযোজন করা হয়েছে। ইউডিসিএল থেকে পাওয়া ইসিজি, ইটিটি, ইকো কার্যগ্রাম এবং বিভিন্ন দাতা থেকে পাওয়া চারটি কার্ডিয়াক মনিটর সচল রয়েছে।

এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসকরা মেশিন অপারেটরদের ব্যবস্থা না করেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মূল্যবান মেশিন ওয়ার্ডে বের করেন। কিন্তু মেশিনগুলো পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়ায় সেগুলো হাসপাতালের স্টোরে রাখা হয়। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার ফলে সেগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

আইসিইউ

পাঁচ বছর আগে যশোরে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা হয়েছিল ইনটেন্সিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ। আধুনিক বেড এবং উন্নত সব মেশিনারিজ সেখানে ঠাসা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা চালু করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, শুধুমাত্র লিফট জটিলতা আর প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান ও জনবল না থাকায় এই ইউনিটটি তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না করায় প্যাকেটজাত অবস্থাতেই নষ্ট হতে শুরু করেছে মূল্যবান সব যন্ত্রপাতি।
ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

যশোর ঘোপ সেন্ট্রাল রোড এলাকার বাসিন্দা মাহাফুজুর রহমানসহ একাধিক সাধারণ মানুষের দাবি, এই দুটি ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু থাকলে স্থানীয় রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাইরে গিয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ খরচ করতে হতো না। সরকারি এই সম্পদগুলো সচল না হওয়ায় এক প্রকার বাধ্য হয়েই প্রাইভেট ক্লিনিক ও দূরবর্তী শহরের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে রোগীদের।

প্রশ্ন উঠেছে, কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ এভাবে নষ্ট করার দায় নেবে কে? স্থানীয়দের দাবি, অতি দ্রুত জনবল নিয়োগ ও মেশিনারিজ সংযোজন করে এই সিসিইউ ও আইসিইউ ইউনিটগুলো সাধারণ মানুষের সেবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন আইসিইউ ও আইসোলেশন ইউনিটের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কবে ইউনিট চালু হবে, তা নিশ্চিত নয়। ফলে কার্যক্রম শুরুর আগেই যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত বলেন, করোনারি কেয়ার ইউনিটের তৃতীয় তলা পর্যন্ত লিফট সুবিধা রয়েছে। তবে নতুন ইউনিটটি চালু করতে প্রয়োজনীয় লিফট ব্যবস্থা না থাকায় এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। গত ১০ জানুয়ারি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব সনজীদা শারমিন হাসপাতাল পরিদর্শনে এসে বিষয়টি অবহিত হয়েছেন। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আইসিইউ’র কার্যক্রম জোড়াতালি দিয়ে চলছে। অথচ এখান থেকে অনেক মানুষ সেবা পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন। যশোরবাসীর স্বার্থে আইসিইউ চালু রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। স্থায়ীভাবে চিকিৎসক পাওয়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)