যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোর শহরে কুকুর-বিড়ালের উপদ্রবে অতিষ্ঠ জনজীবন

ইমরান হোসেন রাজ

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ৫ জুলাই,২০২৬, ১০:০০ এ এম
যশোর শহরে কুকুর-বিড়ালের উপদ্রবে অতিষ্ঠ জনজীবন

যশোর শহরে বেওয়ারিশ কুকুর ও বিড়ালের উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। রাস্তাঘাট, বাজার এমনকী সরকারি হাসপাতাল চত্বরেও দলবদ্ধ কুকুর আতঙ্কে পথচারী, শিশু ও বৃদ্ধদের যাতায়াত দুষ্কর হয়ে পড়েছে।

প্রতিনিয়ত বাড়ছে কামড় ও আঁচড়ের শিকার রোগীর সংখ্যা। অথচ, এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে জেনারেল হাসপাতালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

একইসাথে, শহরের উন্মুক্ত ডাস্টবিন ও বর্জ্য ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনাকে এই উপদ্রব বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন স্থানীয়রা।

মোড়ে মোড়ে কুকুরের রাজত্ব

যশোর শহরের বেজপাড়া মেইন রোডের ফার্মেসি ব্যবসায়ী জানান, শুধু তার দোকানের মোড়েই ২০-৩০টি কুকুর সারাদিন অবস্থান করে। দোকানের সামনে সবসময়ই তিন-চারটি কুকুর শুয়ে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা হুশতলার আব্দুস সাত্তার ক্ষোভ প্রকাশ করেন, কুকুরের উৎপাতে লোকজন স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারছে না। ডাস্টবিনের নোংরা, প্যাম্পাস এসব মুখে করে নিয়ে এসে অফিসের সামনে ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছে। ভয়ে আমরা বাচ্চাদের একা ছাড়তে পারি না। যেকোনো সময় ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কুকুরের কামড়ে অনেকেই আহত হচ্ছেন বলে জানা গেছে।

ভ্যাকসিনের চাহিদা ২৪ হাজার ভায়াল

যশোর জেনারেল হাসপাতালের ইপিআই-এর টিকা ইনচার্জ মোহাম্মদ নুরুল হক জানান, বর্তমানে হাসপাতালে প্রতিদিন দেড়শ’ থেকে আড়াইশ’ রোগী অ্যানিমেল বাইটের (কুকুর-বিড়ালের কামড়/আঁচড়) শিকার হয়ে আসেন। আক্রান্তদের মধ্যে ১২ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের সংখ্যাই বেশি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, গত মাসের ১৯ থেকে ৩১ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ১২ দিনে আমরা এক হাজার ১৮৪ জনকে অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিন দিয়েছি। সরকারি সরবরাহ (ঈগঝউ) না থাকলে রোগীদের বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। আমাদের হিসাবে মাসে প্রায় সাড়ে ছয় থেকে আট হাজার ভ্যাকসিনের ক্যান্ডিডেট থাকে। চাহিদা মেটাতে প্রতি মাসে দুই হাজার ভায়াল হিসেবে বছরে প্রায় ২৪ হাজার ভায়াল ভ্যাকসিনের প্রয়োজন।

আক্রান্তদের প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে তিনি ক্ষতস্থানটি দ্রুত কলের পানি (চলমান) ও সাবান দিয়ে ধোয়ার পরামর্শ দেন এবং ক্ষতস্থানে সেলাই না দিয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার আহ্বান জানান।

পোষা প্রাণীর কামড় ও সচেতনতার অভাব

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এক আনঅফিসিয়াল তথ্যে জানা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি রোগী গৃহপালিত বা পোষা কুকুর-বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ের শিকার।

বেজপাড়ার বাসিন্দা আরাফাত রহমান জানান, তার পোষা বিড়ালকে চিকিৎসা দেওয়ার সময় সেটি তাকে কামড় দেয়। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় দূর-দূরান্ত থেকে এসেও হাসপাতালে ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না এবং দুপুর দুইটার পর এই সেবা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি সরকারি উদ্যোগে পোষা প্রাণীদের বিনামূল্যে ভ্যাকসিনেশনের করার দাবি জানান।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ইদানীং বিড়ালের আঁচড়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। যারা শখের বশে বিড়াল পালেন, তারা যদি বিড়ালের নখে বিশেষ ‘ক্লিপ’ পরিয়ে রাখেন, তবে আঁচড়ের ঝুঁকি কমে যায়।

এছাড়া, প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে পোষা প্রাণীদের পাঁচ-ছয়টি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

বন্ধ্যাকরণ ও ডাস্টবিন ব্যবস্থাপনায় স্থবিরতা

আইনি নিষেধাজ্ঞার কারণে পৌরসভা কুকুর নিধন করতে পারছে না বলে জানিয়েছেন যশোর পৌরসভার পৌর নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, গত ডিসেম্বরে পৌরসভা দুই হাজার কুকুরকে ভ্যাকসিন দিয়েছিল, তবে এর মেয়াদ তিন থেকে ছয় মাস হওয়ায় আবারও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বন্ধ্যাকরণের বিষয়টি কারিগরি হওয়ায় জেলা বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সহযোগিতা ও ভ্যাকসিন সরবরাহ করলে পৌরসভা তা বাস্তবায়ন করতে পারবে।

উন্মুক্ত ডাস্টবিনের বিষয়ে তিনি জানান, ইতিমধ্যে তিন নম্বর ওয়ার্ডের সেন্ট্রাল রোড ও বিএড কলেজের সামনে পরিবেশবান্ধব ডাস্টবিন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নয়টি ওয়ার্ডেই এমন ডাস্টবিন করা হলে কুকুরের আনাগোনা কমবে।

যশোর পৌর নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব জিল্লুর রহমান ভিটু বলেন, কুকুর হত্যা না করে পৌরসভা ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে ভাসমান কুকুরগুলোকে বন্ধ্যাকরণ ও ভ্যাকসিনের আওতায় আনা জরুরি। খোলা ডাস্টবিনের কারণে এদের উপদ্রব বাড়ছে, যা দ্রুত বন্ধ করা উচিত।

বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে বলেন, এই সমস্ত কুকুরকে ধরে বনের নির্দিষ্ট কোনো স্থানে ছেড়ে দেওয়া অথবা বিদেশে রপ্তানি করার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে।

পৌরবাসী ও নাগরিক সমাজের দাবি, হাসপাতালগুলোতে ২৪/৭ ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডাস্টবিন অপসারণ ও কুকুর বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচির দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে যশোরে জলাতঙ্ক পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)