যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোর রেলস্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি আজ

পদ্মাসেতু রেল প্রকল্পের পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত লাখো মানুষ

রাব্বি আল-আমিন

, যশোর

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুলাই,২০২৬, ১০:০০ এ এম
পদ্মাসেতু রেল প্রকল্পের পূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত লাখো মানুষ

পদ্মা সেতু রেল সংযোগের কল্যাণে যশোর থেকে ঢাকার যাত্রা এখন মাত্র আড়াই ঘণ্টার। তবে দ্রুতগতির এই আধুনিক রেলপথের পূর্ণ সুফল থেকে এখনও বঞ্চিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ। সে কারণে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন এ অঞ্চলের মানুষ।

সময়োপযোগী ও পর্যাপ্ত আন্তঃনগর ট্রেন চালুসহ ছয় দফা দাবিতে আজ (সোমবার) বেলা ১টায় যশোর রেলস্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ডাক দিয়েছে ‘বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি’।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে রেল মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-যশোর পদ্মা সেতু রেল প্রকল্পের শুরু থেকেই যশোরবাসী বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন। প্রকল্পের নাম ‘ঢাকা-যশোর’ হলেও বিগত সরকারের আমলে চক্রান্তের মাধ্যমে যশোর শহরকে রেল সুবিধার বাইরে রাখার নীলনকশা করা হয়েছিল।

যশোরবাসীকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে ‘পদ্মবিলা’ নামক প্রত্যন্ত স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরার এক আত্মঘাতী পরিকল্পনা করা হয়। দীর্ঘ আন্দোলনের পর সেই চক্রান্ত রুখে দেওয়া হলেও ট্রেনের সময়সূচি নিয়ে দুর্ভোগ কাটেনি।

২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ‘রূপসী বাংলা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস’। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালু হওয়া এই ট্রেনটি বেনাপোল থেকে ছেড়ে যশোর জংশন, নড়াইল ও ভাঙ্গা জংশন হয়ে ঢাকায় চলাচল করছে। তবে এই ট্রেনের সময়সূচি সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রতিদিন কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ এবং যশোর অঞ্চলের হাজারো মানুষকে চাকরি, চিকিৎসা, ব্যবসা ও সরকারি কাজে ঢাকা যেতে হয়। একসময় যশোর থেকে যমুনা সেতু হয়ে এই যাত্রায় সময় লাগত প্রায় আট ঘণ্টা। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ চালুর পর সেই সময় নেমে এসেছে আড়াই ঘণ্টায়।

এই প্রকল্পের উদ্বোধনী দিনে এ অঞ্চলের মানুষ একটি ট্রেন পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা এ অঞ্চলের কাঙিক্ষত সময়ে নয়। যশোর জংশন থেকে বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ঢাকায় পৌঁছায় রাতে। ফলে দিনের কাজ শেষ করে একই দিনে ফিরে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ভোরে ঢাকামুখী এবং সন্ধ্যায় যশোরমুখী একটি আন্তঃনগর ট্রেনের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের। প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার এই মেগা রেল প্রকল্পের পূর্ণ সুফল থেকে এখনো বঞ্চিত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষ।

দিনে মাত্র একটি ট্রেন দুইবার যাতায়াত করার কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের চরম অপচয় হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই রুটে ট্রিপ বাড়ালে বাংলাদেশ রেলওয়ে তথা সরকার আর্থিকভাবে বিপুল লাভবান হবে। কারণ রেল যোগাযোগ শুধু নিরাপদ ও সাশ্রয়ীই নয়, এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও সড়কপথের চেয়ে অনেক কম।

যশোরবাসী ও যাত্রীরা বলছেন, পদ্মা সেতু রেলপথ নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দ্রুত ও সহজ যোগাযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু সময়োপযোগী ট্রেনের অভাবে সেই লক্ষ্য এখনও পূরণ হচ্ছে না।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ যাত্রার সময় কমিয়েছে ঠিকই, তবে যাত্রীদের প্রত্যাশা এবার সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বাড়ানো হোক ট্রেনের সংখ্যাও। কোটচাঁদপুর, মোবারকগঞ্জ, দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর হয়ে ঢাকা উদ্দেশ্যে সকালে ও সন্ধ্যায় অতিরিক্ত আরেকটি ট্রেনের দাবি জানান এ অঞ্চলের মানুষরা

তন্ময় ইসলাম জয় নামে এক যাত্রী বলেন, পদ্মা সেতু ট্রেন যাত্রায় যে সুফল এ অঞ্চলের মানুষ তেমন পাচ্ছে না। যেমন খুলনার মানুষ প্রভাতি ট্রেন থাকার কারণে সকালে গিয়ে ঢাকায় অফিস-আদালতের কাজ শেষ করে রাতের মধ্যে ফিরতে পারছেন। কিন্তু আমাদের ট্রেন বিকেলে হওয়ায় রাতে ঢাকা পৌঁছে হোটেল ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই অপচয় হচ্ছে। তাই আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য আর একটি অতিরিক্ত প্রভাতি ট্রেনের দাবি করেন তিনি।

রাজনৈতিক কর্মী অনুপ কুমার পিন্টু জানান, দুই বছর আগে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পরে আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের জন্য একটিমাত্র ট্রেন দেওয়া হয়েছে। তাও সেটা বিকালে দেওয়ার কারণে সময় উপযোগী না। কিন্তু পদ্মা সেতুর রেল প্রকল্প চালু হওয়ার সময় বৃহত্তর যশোরের মানুষ খুবই আশায় ছিলো সকালে ঢাকায় গিয়ে অফিস করে আবার রাতে ফিরে আসবো বাসায়। বর্তমানে এই সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি।

তিনি যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশে প্রতিদিন সকালে একটি ট্রেন দাবি করেন।

গত ৩০ জুনের মধ্যে ৬ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়ায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছে বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। ২০২৩ সাল থেকে স্মারকলিপি, মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও রেল অবরোধের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছে সংগঠনটি।

রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মার্চ-অপ্রিল ২০২৬ সালের মধ্যে নতুন ট্রেন চালুর আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এই দাবি আদায়ে আগামীতে রেলপথ অবরোধসহ আরও কঠোর কর্মসূচি হুশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

বৃহত্তর যশোর রেল যোগাযোগ উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি সদস্য সচিব ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন বলেন, ‘খুলনা থেকে সকালে আসা ট্রেনে সিঙ্গিয়া স্টেশন থেকে উঠতে হবে জানানোর দিন থেকে আমরা যশোরবাসীকে সাথে নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছি। এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হলো এ অঞ্চলের মানুষ ট্রেন যাত্রায় পদ্মা সেতুর সুবিধাটা ভোগ করতে পারে। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর আমরা মাত্র রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস নামে একটি আন্তঃনগর ট্রেন পেয়েছি। সেই ট্রেনটি বিকালে যাওয়ার কারণে যশোরবাসীর তেমন কোন উপকারে আসে না। সরকারের কাছে আমরা সর্বশেষ গত জুন মাসের ভিতরে আরেকটি অতিরিক্ত ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছিলাম।কিন্তু রেলমন্ত্রণালয় এখনো পর্যন্ত আমাদের এই দাবি বাস্তবায়ন করেনি। সেজন্য আমরা আজ যশোর রেল স্টেশনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবো।Õ

সরকার অবিলম্বে এই দাবি না মানলে কঠোর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দেন সংগঠনের নেতারা।

আন্দোলনকারীদের ৬ দফা দাবিগুলো হলো, প্রভাতি আন্তঃনগর ট্রেনসহ তিনটি নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালু, সব আন্তঃনগর ট্রেনে সাধারণ বগি বৃদ্ধি, দর্শনা-খুলনা ও বেনাপোল-যশোর রুটে ডাবল রেললাইন নির্মাণ, কমিউটার ট্রেন চালু, সিঙ্গিয়া স্টেশনে ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) চালু এবং গণপরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে রেলকে গড়ে তুলতে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।

যশোরবাসীর এই দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে গত ২২ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য) রেল মন্ত্রণালয়ে একটি ডিও লেটার (আধা-সরকারি পত্র) দেন। চিঠিতে তিনি ভোরবেলা বেনাপোল-যশোর-নড়াইল-ঢাকা রুটে আরও একজোড়া আন্তঃনগর ট্রেন এবং ঢাকা-নড়াইল-যশোর রুটে একজোড়া লোকাল ট্রেন সংযোজনসহ চারটি দাবি উত্থাপন করেন।

এদিকে, যশোর রুটে আন্তঃনগর ট্রেন চালুর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের দাবি, যশোরবাসী ও আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবিগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে এবং ইতিবাচক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা চলছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘যশোর একটি বৃহৎ জংশন। রেলের এটাকে হাব বলা হয়। এখান থেকে বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল করে। রেলওয়ে এখানে খুব জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। আমি প্রায় ছয় মাস আগে সরকারের কাছে গদখালী ফুলের বাজার যশোর স্টেশনের মাধ্যমে সংযুক্ত করে ঢাকায় যোগাযোগ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠিয়েছি। ইতিমধ্যে আমরা রেল মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করেছি। শিগগির রেলমন্ত্রী এখানে আসবেন। আমরা সবগুলো দাবি জানিয়েছি।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)