যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আদায়ে ধস

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, যশোর

প্রকাশ : শুক্রবার, ৩ জুলাই,২০২৬, ১০:১০ এ এম
বেনাপোল বন্দরে রাজস্ব আদায়ে ধস

ডিজিটাল ওজন স্কেলে কারচুপি, উচ্চ শুল্কের পণ্য কম শুল্কে খালাস এবং পণ্য আত্মসাতের একের পর এক ঘটনায় বেনাপোল স্থলবন্দরে সরকারের রাজস্ব আদায় অনেক কমেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ছয় হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে, অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। একই সময়ে বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ দুই হাজার ১৪৪ মেট্রিক টন পণ্য।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল সাত হাজার ২৯ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা এবং আমদানি হয়েছিল ১৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০৯ মেট্রিক টন।

অর্থাৎ, এক বছরে রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৪৭০ কোটি টাকা এবং আমদানি কমেছে প্রায় এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, আমদানিকারক ও একাধিক সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পণ্যের ওজন পরিবর্তন, মিথ্যা ঘোষণা এবং সাফটা সুবিধার অপব্যবহারের মাধ্যমে সরকারের বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ তৈরি করছে। যদিও রাজস্ব ঘাটতির পেছনে আমদানি কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি এবং শুল্কহারের পরিবর্তনের মতো কারণও রয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, শুল্ক ফাঁকি ও ওজন কারচুপি রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, সাফটা সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কহার গত তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যেখানে শুল্কহার ছিল সাত শতাংশ, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১১ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুল্কহার বৃদ্ধির পর থেকেই কিছু অসাধু চক্র কম শুল্কে পণ্য খালাসের জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাফটা সুবিধা নিয়ে ভারত থেকে পণ্য আমদানি করা হলেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ভারতে রপ্তানিকৃত পণ্যে একই ধরনের সুবিধা পান না।

সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের একটি দাপ্তরিক চিঠি প্রকাশ্যে এলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সহকারী কমিশনার অব কাস্টমস অটল গোস্বামী স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ১৪ জুন বন্দরের পাঁচ নম্বর ডিজিটাল ওজনযন্ত্রে একই ভারতীয় খালি ট্রাক (ঐজ-৩৮-অক-৪০১৮) একই সময়ে দুটি পৃথক পণ্যতালিকার বিপরীতে দুই ধরনের ওজন দেখানো হয়েছে। একটি পণ্যতালিকায় ট্রাকটির খালি ওজন চার হাজার ৮৮০ কেজি এবং অন্যটিতে চার হাজার ৯২০ কেজি উল্লেখ করা হয়। একই ট্রাকের ক্ষেত্রে একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ওজন দেখানোর ঘটনায় কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক পরিচালকের কাছে তিন কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

কাস্টমসের এক কর্মকর্তা জানান, ওজনের অসঙ্গতি ধরা পড়া চালানটি ছিল সাইকেলের যন্ত্রাংশের। পরে ২৫ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ চালানটি আটক করে এবং বিষয়টি তদন্ত শুরু করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দরের ৩১ নম্বর পচনশীল পণ্যের শেডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকি দেওয়া পণ্য একই শেডের বিভিন্ন স্থানে ভাগ করে রাখা হয়। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ধাপে ধাপে সেগুলো খালাস করা হয়।

গত ১২ মার্চ বেনাপোল স্থলবন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে ‘সাফা ইমপেক্স’-এর বেকিং পাউডার ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় ছয় কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় উচ্চ শুল্কের শাড়ি ও থ্রি-পিস আত্মসাতের ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। এ ঘটনায় দীর্ঘ তদন্ত শেষে ১০ জুন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ১৮ জনের বিরুদ্ধে বেনাপোল পোর্ট থানায় মামলা করে। এর মাত্র পাঁচ দিন পর ২৬ নম্বর শেডে ‘টি এস ইন্টারন্যাশনাল’-এর ইরেজার ও পেনসিল ঘোষণার আড়ালে আনা প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের তিন হাজার ৩৮৫ পিস উচ্চ শুল্কের পণ্য জব্দ করে কাস্টমস।

এর আগে ২৫ এপ্রিল রোকেয়া ট্রেডার্সের আমদানি করা আঙুরবোঝাই একটি ভারতীয় ট্রাকের ক্ষেত্রেও ওজনের গরমিল ধরা পড়ে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ট্রাকটির প্রকৃত খালি ওজন ছিল ১৩ হাজার ৩১০ কেজি, কিন্তু ওজন স্লিপে তা ১৩ হাজার ৮৮০ কেজি দেখানো হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের ওজন পরিবর্তনের মাধ্যমে শুল্ক নির্ধারণে প্রভাব ফেলার সুযোগ তৈরি হয়। সে সময় দায়িত্বে ছিলেন ওয়্যারহাউস সুপারিনটেনডেন্ট আশিকুর রহমান রনি। তিনি বলেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছিলাম এবং যন্ত্রের কারিগরি ত্রুটির কারণেও এমন পার্থক্য হতে পারে।

জুন মাসে শুল্ক ফাঁকি ও পণ্য পাচারের অভিযোগে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে চারটি পৃথক মামলায় অজ্ঞাতনামাসহ মোট ৫৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, আরিফুল ইসলাম চৌধুরী, কাস্টমস সিপাই মোহাম্মদ সাগরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

২৭ জুন কেমিক্যাল জোন থেকে ভারতীয় ট্রাকের পণ্য অবৈধভাবে বাংলাদেশি ট্রাকে স্থানান্তরের ঘটনায় বন্দর কর্তৃপক্ষ পৃথক আরেকটি মামলা দায়ের করে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, যে ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেখানে শেড ইনচার্জকে বাদ দেওয়ার কারণ কী? শেডের ভেতরে কীভাবে পণ্য বের হলো, সেটির দায় ও জবাবদিহিতা তদন্ত করা উচিত। প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক।

ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, ওজন নির্ধারণে সামান্য অসঙ্গতিও সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্বে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুরো ওজন ব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকির আওতায় আনতে হবে।

বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, অভিযোগের বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, ওজনযন্ত্রে কারচুপিসহ অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কাস্টমসের চিঠি পাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার মো. ফাইজুর রহমান বলেন, সরকারের এক টাকার রাজস্বও যাতে ফাঁকি না যায়, সে ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছি। ওজন স্কেলে কারচুপি, মিথ্যা ঘোষণা, শুল্ক ফাঁকির সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)